কুলাউড়ায় বাল্যবিয়ের হোতা কাজী মঈন উদ্দিনের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ

January 21, 2026,

মাহফুজ শাকিল : কুলাউড়া উপজেলার ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত নিকাহ রেজিস্ট্রার মো: মঈন উদ্দিনের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি বিধি বহির্ভূতভাবে নিকাহ রেজিস্ট্রার কার্যক্রম পরিচালনা করার অসংখ্য অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে গত বছরের ৮ ডিসেম্বর আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব মো: আবদুল ওয়াহাব স্বাক্ষরিত এক পত্রে কাজী মঈন উদ্দিনকে ১৫ দিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর চিঠি দেয়া হয়।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা, ২০০৯ এর বিধি ১৩ (ঙ) এর বিধান লঙ্ঘন করায় এবং তা বিধি ১১ অনুযায়ী গুরুতর অসদাচরণের শামিল হওয়ায় কাজী মঈন উদ্দিনকে কেন তার নামীয় নিকাহ রেজিস্ট্রার লাইসেন্স বাতিল করা হবে না মর্মে কারণ দর্শানো নোটিশের জবাব ১৫ দিনের মধ্যে আইন ও বিচার বিভাগে দেয়ার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হয়।

স্বাক্ষরিত ওই চিঠি ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কুলাউড়ার ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের নিকাহ রেজিস্ট্রার মো: মঈন উদ্দিন নিজ অধিক্ষেত্রের বাহিরে গিয়ে পাশ্ববর্তী কাদিপুর ইউনিয়নের কাকিচার এলাকায় অবস্থিত এম এন এইচ কমিউনিটি সেন্টারে বিধি বহির্ভূতভাবে প্রতিনিয়ত নিকাহ রেজিস্ট্রি কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। ইতিমধ্যে এ বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে কাদিপুর ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত নিকাহ রেজিস্ট্রার ভুক্তভোগী আব্দুল মনাফ জেলা রেজিস্ট্রার বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দেন। এরপর জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয় থেকে ওই অভিযোগের তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করা হয় জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয় থেকে।

এদিকে গত বছরের ১১ নভেম্বর মৌলভীবাজার জেলা রেজিস্ট্রার মফিজুল ইসলাম ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের নিকাহ রেজিস্ট্রার মঈন উদ্দিনের অফিস পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনে তিনি দেখতে পান, ব্যবহৃত নিকাহনামার ৬৬টি বহির মধ্যে ৩টি বহি চলমান। মোট সূচি বহি ১১টি, তালাক নামা বহি ১২টি, ফরমায়েশ নামা সর্বশেষ ২০২২ সালে অনুমোদন করা হয়। যা নিকাহ আইনে বলা হয়েছে, একই সাথে তিনটি বহি চলমান রাখা আইনগত ভাবে কোনভাবেই সঠিক নয়। তালিকা বহি আছে কিন্তু প্রত্যয়ন নেই ও সঠিক নিয়মে রাখা হয়নি। বালাম নং-৬৪, পৃষ্টা ৭২-৮৭ পর্যন্ত অলিখিত, পৃষ্টা ৮৮-৯৯ পর্যন্ত বিবাহ রেজিস্ট্রারের তারিখ লেখা নেই এবং পৃষ্টা ১০০ খালি রয়েছে।

বালাম নং ৪২ পর্যালোচনা করে কয়েকটি বাল্যবিবাহের নমুনা পরিলক্ষিত হয়। ৫৩ নং পৃষ্টায় কনের বয়স ১৫ বছর ৬ মাস ১৯ দিন, ৯১ নং পৃষ্টায় কনের বয়স ১৬ বছর ১০ মাস ২৩ দিন, ৯৬ নং পৃষ্টায় কনের বয়স ১৬ বছর ৩ মাস ২ দিন উল্লেখ করা হয়। বালাম নং-৬৫ তে দেখা যায়, ৪৮ নং পৃষ্টায়  কনের বয়স ১৭ বছর ৬ মাস ২২ দিন, ৯৫ নং পৃষ্টায় কনের বিয়ের তারিখ লেখা নেই শুধু বিয়ের কথা বার্তার তারিখ লেখা রয়েছে। বালাম নং ৫১ তে দেখা যায়, ১ নং পৃষ্টায় ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ১৮ তারিখ বিয়ের কথাবার্তা ঠিক হলেও বিয়ের রেজিস্ট্রি খাতায় স্বাক্ষর হয়েছে ২০২০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর। কিন্তু তারিখটি কলমজাদা। বালাম নং ১৫ এর ২৭ নং পৃষ্টায় বর এবং কন্যার বয়স লেখা নেই। এভাবে  বিভিন্ন বালাম নম্বরে বাল্যবিয়ের অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে।

নানা অনিয়ম ও অভিযোগের পর জেলা রেজিস্ট্রার মফিজুল ইসলাম সরেজমিনে পরিদর্শনে দৈবচয়ন প্রক্রিয়ায় বালাম যাচাই কালে কাজী মঈন উদ্দিনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম বের হয়ে আসে। এতে প্রমাণিত হয় যে, নিকাহ রেজিস্ট্রার কাজী মঈন উদ্দিন অবাধে বাল্যবিয়ে রেজিস্ট্রি করে থাকেন। যার কারণে বাল্য বিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ এবং মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা ২০০৯ এর লঙ্ঘন হওয়ায় নিকাহ রেজিস্ট্রার মঈন উদ্দিনের বিরুদ্ধে তাঁর লাইসেন্স বাতিলসহ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য গত বছরের ১৭ নভেম্বর কারণ দর্শানো নোটিশ প্রেরণ করেন জেলা রেজিস্ট্রার মফিজুল ইসলাম।

অভিযোগের বিষয়ে ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের নিকাহ রেজিস্ট্রার মো: মঈন  উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, কারণ দর্শানো কোন চিঠি পাইনি। পেলে পরবর্তীতে বিস্তারিত জানাবো বলে তিনি ফোন কেটে দেন।

মৌলভীবাজার জেলা রেজিস্ট্রার মফিজুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, নিকাহ রেজিস্ট্রার মঈন উদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। আরেকটি প্রতিবেদন পাঠানো প্রক্রিয়াধীন। প্রতিনিয়ত বাল্যবিয়ের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি আরো বলেন, এ বিষয়ে তদন্ত চলমান। বাল্যবিয়ে নিরোধ আইনে কাজী মঈনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com