এনডিএফ নেতা আফজাল চৌধুরীর ২য় মৃত্যুবার্ষিকীতে বক্তারা মধ্যপ্রাচ্যে আন্ত:সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহবান

স্টাফ রিপোর্টার : জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট-এনডিএফ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সাবেক নেতা, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী নেতা প্রবীণ রাজনীতিবিদ এন. এম. নজমুল হক চৌধুরী (আফজাল চৌধুরী)-এর ২য় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে মৌলভীবাজার এনডিএফ’র উদ্যোগে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
২৩ মার্চ সন্ধ্যায় শহরের চৌমুহনাস্থ কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট-এনডিএফ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সহ-সভাপতি মোঃ নুরুল মোহাইমীন। জেলা এনডিএফ’র সাধারণ সম্পাদক রজত বিশ্বাসের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সহ-সভাপতি মোঃ সোহেল মিয়া, হোটেল শ্রমিক ইউনিয়ন জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোঃ শাহিন মিয়া, রিকশা শ্রমিক ইউনিয়ন জেলা কমিটির প্রচার সম্পাদক আশরাফ উদ্দিন, এনডিএফ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সদস্য কিশমত মিয়া, রিকশা শ্রমিকনেতা স্বাধীন মিয়া, রাফিক মিয়া ও শ্রমিকনেতা জামাল মিয়া প্রমূখ।
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়মনীতি উপেক্ষা করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার মদদপুষ্ট ইসরাইলী বাহিনী ইরানের উপর গত তিন সপ্তাহে নির্বিচারে বোমা বর্ষণ করে শত শত নিরিহ নারী-শিশু, স্কুল ছাত্রীসহ হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা করেছে। এই যুদ্ধে ৫ জন নিরিহী বাংলাদেশীও মৃত্যুবরণ করার পাশাপাশি অনেকে আহত হয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো মূলত মার্কিন আগ্রাসনের স্বপক্ষে এবং মার্কিনের দালাল মধ্যপ্রাচ্যের অংধিকাংশ দেশগুলো এবং ভারত ও বাংলাদেশ সরকারও মার্কিন-ইসরাইলের আগ্রাসন ও হত্যাযজ্ঞের বিরোধিতা না করে মূলত সমর্থন করছে। পক্ষান্তরে মার্কিনের প্রতিপক্ষ সাম্রাজ্যবাদী চীন-রাশিয়া সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করলেও মধ্যপ্রাচ্যে তাদের অবস্থান ও প্রভাব বলয় বিস্তারের লক্ষ্যে ইরানকে নানাভাবে সাহায্য করে চলছে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউক্রেন, পাক-ভারত, পাক-আফগানসহ পৃথিবীর নানা প্রান্তে যুদ্ধের মূল কারণ হচ্ছে বিশ্ব বাজার ও প্রভাব বলয় পুনর্বণ্টন নিয়ে মার্কিনের নেতৃত্বে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ ও তার প্রতিপক্ষ চীন-রাশিয়ার মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা-প্রতিদ্বন্দ্বিতার সাথে সম্পর্কিত। ইউক্রেন যুদ্ধ, ইসরাইল কর্তৃক প্যালেস্টাইনে আগ্রাসন ও গণহত্যা, ভারতের কাশ্মিরের পাহেলগাম ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাক-ভারত যুদ্ধ, পাকিস্তান-আফগানিস্তান যুদ্ধ, সর্বশেষ মার্কিন ও ইসরাইলের ইরানে হামলা ইত্যাদি ঘটনা বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। বরং তা পুঁজি ও শক্তি অনুপাতে বাজার ও প্রভাব বলয় পুনর্বণ্টন নিয়ে আন্তসাম্রাজ্যবাদী প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বাণিজ্যযুদ্ধ, মুদ্রাযুদ্ধ, প্রযুক্তি যুদ্ধ, আঞ্চলিক ও স্থানিক যুদ্ধের ধারাবাহিকতায় পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহারসহ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতির অংশ। ভূরাজনৈতিক ও রণনীতিগত গুরুত্বপূর্ণ নয়াউপনিবেশিক আধাসামন্ততান্ত্রিক বঙ্গোপোসাগরীয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে নিয়েও আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব সুতীব্র। সাম্রাজ্যবাদী উভয়পক্ষই স্বপক্ষে বাংলাদেশকে যুদ্ধে সম্পৃক্ত করতে চায়। আজ তাই বাংলাদেশের শ্রমিক-কৃষক-জনগণকে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। নেতৃবৃন্দ বলেন বস্তুত আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বের প্রত্যক্ষ স্বীকার ইরান, লেবানন, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, কুর্দি, কাশ্মির, রোহিঙ্গাসহ বিশ্বের বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠি। বিশ্বের সকল নিপীড়িত জাতিগোষ্ঠিকে সকল সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে ব্যাপক জনগণের মুক্তির লক্ষ্যে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব ছাড়া মুক্তির বিকল্প কোন পথ নেই।নেতৃবৃন্দ আরও বলেন আজ এমন এক সময়ে প্রয়াত আফজাল চৌধুরীর মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা হচ্ছে যখন সারা দেশের শ্রমিক-কৃষক মেহনতি মানুষ দ্রব্যমূল্যের কষাঘাতে জীবন-জীবিকা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। অর্থনৈতিক সংকট থেকে রাজনৈতিক সামাজিক তথা সামগ্রিক সংকট বৃদ্ধি পেয়ে সমাজ জীবনকে অস্থির করে তুলেছে। চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই-রাহাজানি, খুনোখুনি, নারী নির্যাতন, নারী ও শিশু ধর্ষণ ও পাচার সাধারণ ঘটনায় পরিণত হচ্ছে। দেশে অরাজক, বিশৃঙ্খল ও নৈরাজ্যিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ না করে অন্তবর্তী সরকার প্রভু সাম্রাজ্যবাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মার্কিন নিয়ন্ত্রিত সরকারকে ক্ষমতায় পাকাপোক্তভাবে আনার জন্য তথাকথিত নির্বাচন, নতুন রাজনৈতিক দল গঠন ইত্যাদি প্রক্রিয়ায় অগ্রসর করছে। জনগণকে বিভ্রান্ত ও বিভক্ত করাসহ মার্কিনপন্থী ‘বাম দলগুলো’ ক্ষমতার ভাগ পাওয়ার আশায় ৫ আগস্ট ও অন্তবর্তী সরকারকে সমর্থন করে চলেছে। সাম্রাজ্যবাদের দালাল শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ও তার মহাজোট নয়াঔপনিবেশিক ভারতে অবস্থান করে প্রভুর পরিকল্পনায় পুনরায় ক্ষমতার আসার জন্য সকল রূপে সক্রিয় ও তৎপর। প্রভু সাম্রাজ্যবাদকে আড়াল করে দালাল ভারতকে লক্ষ্য করে এবং খুনি হাসিনার বিরোধিতা নামে তথাকথিত জাতীয় ঐক্যের স্লোগান প্রকৃত আন্দোলনকে বিপথগামী করা ছাড়া আর কিছু নয়। আজ প্রয়োজন সকল প্রকার শোষণ-শাসন থেকে মুক্তি ও আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধে বাংলাদেশকে সম্পৃক্ত করার সকল সাম্রাজ্যবাদীদের এবং তাদের দালালদের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক ও দেশপ্রেমিক শক্তি ঐক্যবদ্ধ হয়ে বৃহত্তর আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে তোলা।
নেতৃবৃন্দ প্রয়াত আফজাল চৌধুরীর কর্মময় জীবনের স্মতিচারণ করে বলেন প্রবাসে থাকলেও তিনি সব সময় সংগঠনের নেতাকর্মীদের সাথে গভীর যোগাযোগ রাখতেন। সাংগঠনিক যেকোন প্রয়োজনে এবং নেতাকর্মীদের দুঃসময়ে তিনি সাধ্যমত সহযোগিতা করতেন। ২০২২ সালে সিলেট বিভাগে ভহাবহ বন্যা কবলিত জনসাধারণের জন্য, সুনছড়া আন্দোলনরত চা-শ্রমিকদের উপর মালিকের দালালদের আক্রমণে আহত শ্রমিকদের জন্য, কালাগুলের চা-শ্রমিক আন্দোলনের সময়, টিপাইমূখ আন্দোলনের সময়, জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট মৌলভীবাজার জেলা শাখার ২য় ও ৩য় জেলা সম্মেলনে তাঁর সহযোগিতা নেতাকর্মীরা কৃতজ্ঞচিত্তে সম্মণ করেন। ছাত্র জীবন থেকেই তিনি সমাজ পরিবর্তণের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হন। এদেশ থেকে সাম্রাজ্যবাদ-সামন্তবাদকে উচ্ছেদের বিপ্লবী রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হয়ে তিনি উপমহাদেশের প্রখ্যাত কমিউনিষ্ট বিপ্লবী কমরেড আবদুল হক, কমরেড অজয় ভট্টাচার্য, কমরেড দ্বিজেন সোম প্রমূখ বিপ্লবী নেতৃবৃন্দের সান্নিধ্য লাভের সুযোগ পান। রাজনৈতিক কারণে তাকে এক বছরের বেশি সময় কারারুদ্ধ করে রাখা হয়। তিন মেয়ে ও এক ছেলের জনক আফজাল চৌধুরীর পরবর্তী জীবনে পারিবারিক প্রয়োজনে প্রবাসী হলেও মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত একটি শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতেন এবং সেই লক্ষ্যে প্রবাসে থেকে সাধ্য অনুযায়ী সাংগঠনিক ভূমিকা রাখতেন। ২০২২ সালে তিনি সর্বশেষ দেশে এসেও সাংগঠনিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন। এছাড়া ২০০৯ সালে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের টিপাই মুখ বাঁধ বিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি দেশে অবস্থান করে আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে সিলেট কোর্ট পয়েন্টের সমাবেশ ও জকিগঞ্জের সমাবেশ সফল করতে ভূমিকা রাখেন।
উল্লেখ্য ২৩ মার্চ ২০২৪ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইর্য়কে কিডনি রোগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। কুলাউড়ার বাদেমনসুর গ্রামের অধিবাসী প্রয়াত আফজাল চৌধুরীর মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল প্রায় ৭৫ বছর।



মন্তব্য করুন