চা শ্রমিকদের জীবনে মে দিবসের প্রভাব সীমিত

নূরুল মোহাইমীন মিল্টন : মহান মে দিবস ১লা মে। ১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। ওইদিন তাদের আত্মদানের মধ্যদিয়ে শ্রমিক শ্রেণির অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তাদের এই আত্মত্যাগের স্মরণে বিশ্বজুড়ে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রতি বছর পহেলা মে দিবসটি পালন করা হয়।
মে দিবস বিশ্বব্যাপী শ্রমজীবি মানুষের অধিকার, আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের প্রতীক হলেও বাংলাদেশের চা শ্রমিকদের জীবনে এর প্রভাব খুবই সীমিত। সাধারণ চা শ্রমিকরা জানেন না মে দিবসের ইতিহাস ও তাৎপর্য। চা বাগানে কর্মরত শ্রমিকরা দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেও মে দিবসের ইতিহাস বা ছুটি সম্পর্কে মোটেও সচেতন নন। কিংবা মে দিবসকে কেন্দ্র করে তাদের সংগঠন চা শ্রমিক ইউনিয়নের পক্ষে অধিকার আদায়ে সচেতন করে তোলার বিষয়ে তেমন তৎপরতা পরিলক্ষিত হয়নি। তাদের কাছে সব দিনই সমান। যাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকানো তাদের আবার দিবস কী? এমন প্রশ্নটা চা শ্রমিক নেতৃস্থানীয় অনেকেরই।
চা শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস থাকলেও, মে দিবসের মতো আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসে তাদের ন্যায্য অধিকার ও সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারেনি। শ্রম আইনের সকল সুযোগ সুবিধা এখনও তাদের ভাগ্যে জুটেনি। তারা যুগ যুগ ধরে নামমাত্র মজুরিতে কাজ করছেন। বাসস্থানের অভাব এবং স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন না থাকার মতো অমানবিক অবস্থায় কাজ করে যাচ্ছেন।
প্রাকৃতিক টিলাভূমি, পাহাড়ি ছড়া আর সবুজের সমারোহ চা বাগানের এক অপূর্ব সমম্বয়। চায়ের বাগান গুলোর কোন কোনোটি শতবর্ষী। সেখানে যখন রোদের প্রখরতা তখনও চা শ্রমিকরা এই কাঠফাটা রোদের মধ্যে কাজ করেন। আবার প্রবল বর্ষনেও তারা পলিথিন মাথায় দিয়ে কিংবা বৃষ্টিতে ভিজে পাতি তোলেন। সকাল পেরিয়ে দুপুরের খরতাপে মাথা থেকে কপাল চুইয়ে মুখ গড়িয়ে ঘাম পড়ে। একইভাবে বৃষ্টিতে ভিজে পুরো শরীর জবজবে ভেজা থাকে। জীর্ণ-শীর্ণ শরীরটা দেখলেই বোঝা যায় কেমন খাটুনি খাটতে হয় এই মানুষগুলোকে। তারপরও তারা অবহেলিত। মে দিবসের চেতনায় এখানে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।
তারা জানেন না মে দিবস কী? মে দিবসের ছুটির কথা শুনে তাদের কেউ কেউ অবাক হন। কঁচি চা পাতা থেকে খাওয়ার চা পাতা তৈরিতে দিনভর শ্রম দেন তারা। তাদের পাঁচ, সাত সদস্যের সংসার। সংসারে একজনের আয় দিয়ে সন্তানদের পড়ালেখাসহ যাবতীয় খরচাদি চালাতে হয়। বর্তমানে চা শ্রমিকরা দৈনিক মজুরি পান ১৮৭ টাকা। তবে মজুরির এই টাকা থেকে বিদ্যুৎ বিল, ইউনিয়ন চাঁদা, পূজার চাঁদা সবই কেটে নেওয়া হয়। আর সপ্তাহে কেউ কেউ রেশন হিসাবে সাড়ে ৩ কেজি আটা পান। এগুলোই তাদের সম্বল।
সমাজ ও সভ্যতার ক্রমাগত উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠছে একের পর এক উন্নয়নের সিঁড়ি। কিন্তু চা শিল্পের নেপথ্যে থাকা এই শ্রমজীবিদের উন্নয়ন থমকে আছে। তাদের আইনী অধিকারটুকুও বাস্তবায়ন হয়নি। কতো দিবস আসে আর যায়, কিন্তু তারা যেখানে ছিলেন সেখানেই আছেন। এখনো তাদের নিয়োগপত্র, পরিচয়পত্র নেই। প্রচলিত শ্রম আইনের ২(১০) ধারায় গ্রাচুইটি, ৫ ধারায় নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র, ২৩৪ ধারায় কোম্পানির মুনাফার ৫ শতাংশ শ্রমিকদের কল্যাণে অংশগ্রহণ তহবিল ও কল্যাণ তহবিলে বরাদ্দ করার আইন থাকলেও কোন চা-বাগানেই তা বাস্তবায়ন করা হয় না। এসব নিয়ে চা শ্রমিকদেরও জোরালো আন্দোলন নেই। মে দিবসেও তেমন দাবি দাওয়া নেই।
রোদে পুড়ে এই চায়ের বাজারকে চাঙ্গা রাখতে যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই ভুমিতে দিনানিপাত করেন তারা এক জীবন খাটুনি করেও স্বপ্ন দেখতে পারেন না ভুমির মালিকানার। এ স্বপ্নটা তাদের অধরাই থেকে গেল। তাদের জীবনটা যেনো দুর্বিষহ।
জাতীয় অর্থনীতিতে চা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও এ শিল্পের নেপথ্য মানুষগুলো নানা বঞ্চনা আর অবহেলার শিকার। চা শিল্পের উন্নয়ন হলেও ভাগ্যের পরির্বতন হয় না চা শ্রমিকদের। মধ্যযুগের ভূমিদাসের মতোই চা মালিকের বাগানের সঙ্গে বাঁধা তাদের নিয়তি। তারপরও পেটের জ্বালায় বারবার ফিরে আসেন বাগানে।
শ্রমআইনের ১১৭ ধারায় সকল শ্রমিকদের জন্য প্রতি ১৮ দিন কাজের জন্য ১ দিন অর্জিত ছুটি সেখানে শুধুমাত্র চা-শ্রমিকদের প্রতি ২২ দিন কাজের জন্য ১ দিন অর্জিত ছুটি প্রদানের বিধান করা হয়েছে। চা শ্রমিকরা আইনেও বৈষম্যের শিকার। যার ফলে তারা অন্যান্য শিল্প শ্রমিকদের তুলনায় কম ছুটি, নামমাত্র মজুরি এবং নামমাত্র সুবিধা পান। চা-বাগানে স্থায়ী ও অস্থায়ীএই দুই ধরনের শ্রমিক থাকেন। শ্রম আইন অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে শ্রমিকদের চাকরি স্থায়ী করার কথা। অথচ চা বাগানে ১ থেকে ১০ বছর ধরে কাজ করা ৩০ হাজার অস্থায়ী শ্রমিক রয়েছেন। তাঁদের চাকুরী স্থায়ীকরন হচ্ছে না। তাছাড়া নিয়োগপত্র না থাকা, ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে জটিলতা এবং গ্র্যাচুইটি প্রাপ্তিতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার বাধ্যবাধকতা তাদের মৌলিক অধিকার খর্ব করছে।
ফিবছর চা গাছ ছেঁটে ছেঁটে ২৬ ইঞ্চির বেশি বাড়তে দেওয়া হয় না। ঠিক তেমনি চা শ্রমিকদের জীবনটাও যেনো তেমন ছেঁটে দেওয়া চা গাছের মতো। লেবার লাইনের ২২২ বর্গফুটের কুঁড়েঘরে বন্দি তাদের জীবন। দেখতে পাওয়া যায় না কীভাবে মাত্র ১৮৭ টাকা দৈনিক মজুরি দিয়ে জীবন পার করে চা শ্রমিকরা। নিত্যপণ্যের আকাশচুম্বি দামের সাথে তাল মিলিয়ে বাড়ে না তাদের মজুরি। তারা স্বাস্থ্যসেবা ও উন্নত বাসস্থান থেকে বঞ্চিত। নারী চা শ্রমিকরা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করলেও তাদের ন্যায্য অধিকার ও সামাজিক মর্যাদাটুকুও নিশ্চিত হয়নি। মে দিবসের চেতনায় অবহেলিত চা শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হোক মূল লক্ষ্য।



মন্তব্য করুন