ইতিহাসের কাঠগড়ায় ১/১১ এর কুশীলবরা, বিরাজনীতিকরণ থেকেই ফ্যাসিবাদের জন্ম হয়েছিলো

মোস্তফা সালেহ লিটন : বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি বা ১/১১ কেবল একটি তারিখ নয় বরং এটি ছিল একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে ধ্বংস করার সূচনালগ্ন। দীর্ঘ ১৭ বছরের দুঃশাসন, অগণিত মানুষের আত্মত্যাগ এবং একটি সফল গণ-অভ্যুত্থানের পর যখন আমরা পেছন ফিরে তাকাই, তখন পরিষ্কার দেখা যায় আজকের এই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশের মূল কারিগর ছিল সেই ১/১১ এর কুশীলবরা। বিরাজনীতিকরণের নামে তারা যে বিষবৃক্ষ রোপণ করেছিল, তারই ফলশ্রুতিতে দেশ গত দেড় দশক ধরে এক চরম ফ্যাসিবাদী শাসনের কবলে পিষ্ট হয়েছে। ১/১১-এর মূল লক্ষ্য ছিল ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার আড়ালে দেশের জনপ্রিয় রাজনৈতিক শক্তি, বিশেষ করে বিএনপিকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া। তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন উদ্দিন আহমেদ এবং জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীসহ একটি বিশেষ চক্র সুশীল সমাজের একাংশ ও কতিপয় গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বকে সাথে নিয়ে যে খেলায় মেতেছিলেন, তাদের উদ্দেশ্য ছিল এ দেশের মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে একটি ‘নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করা।
সেই সময় কিছু নির্দিষ্ট সংবাদপত্রের সম্পাদক ও টকশো ব্যক্তিত্বরা ‘দেশ গেল- দেশ গেল’ রব তুলে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছিলেন। তারা মূলত একটি পার্শ্ববর্তী দেশের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী বাংলাদেশকে একটি ‘অঙ্গরাজ্য’ বা আজ্ঞাবহ রাষ্ট্রে পরিণত করার পথ প্রশস্ত করছিলেন। বিরাজনীতি করণের সেই ষড়যন্ত্রই আসলে ছিল দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেওয়ার প্রথম পদক্ষেপ। ২০০৮ সালের নির্বাচন ছিল ১/১১ এর ষড়যন্ত্রের চূড়ান্ত ফসল। একটি বিশেষ দলকে ক্ষমতায় বসিয়ে নিজেদের কৃতকর্মের ‘সেফ এক্সিট’ নিশ্চিত করেছিলেন মইন উদ্দিন, মাসুদগংরা। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে সেই ষড়যন্ত্রকারীদের পুরস্কৃত করেছিলেন, কারণ তিনি জানতেন এই কুশীলবদের ওপর ভর করেই তাকে আজীবন ক্ষমতায় থাকতে হবে। পরবর্তীতে আমরা দেখেছি কীভাবে দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে নির্লজ্জভাবে দলীয়করণ করা হয়েছে। ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে সুরক্ষা দিতে গিয়ে জন্ম দেওয়া হয়েছে জেনারেল তারেক সিদ্দীকি, জেনারেল আজিজ, বেনজীর, হারুন, জিয়া কিংবা ডিবি মনিরের মতো একেকটি দানবকে। আয়না ঘর নামের বিভীষিকা তৈরি করে ভিন্ন মতাবলম্বীদের গুম ও খুন করা ছিল তাদের নিত্যদিনের কাজ। গত ১৭ বছরে দেশের অর্থনীতিকে যেভাবে লুটপাট করা হয়েছে এবং গণতন্ত্রকে যেভাবে দাফন করা হয়েছে, তার দায়ভার কোনো ভাবেই ১/১১ এর কুশীলবরা এড়াতে পারেন না।
আজ সময় এসেছে সেই ষড়যন্ত্রের শেঁকড় উপড়ে ফেলার। জেনারেল মাসুদ, মামুন খালেদকে ইতিমধ্য গ্রেফতার করা হয়েছে। জনমনে প্রশ্ন উঠেছে বাকীদেরকে ও বিশেষ করে ১/১১এর সাথে প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িত সাংবাদিক মতিউর রহমান ও মাহফুজ আনামদের মতো ব্যক্তিদের এখনো আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না কেনো? সুশীল সমাজের যারা ১/১১এর পেছনের কারিগর ছিলেন, যারা টিভির পর্দায় এসে গণতন্ত্রের ছবক দিয়ে বিরাজনীতি করনকে বৈধতা দিয়েছিলেন তাদেরকে কি বিচারের আওতায় আনা হবে না? ২৪এর গনঅভ্ত্থূানে হাজারো ছাত্র-জনতার রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই নতুন বাংলাদেশে তাদের বিচার হওয়া বাধ্যতামূলক। ২০০৮ সালের নির্বাচন কমিশনারদের জেরা করা প্রয়োজন। কীভাবে একটি বিশেষ ব্লপ্রিন্টের মাধ্যমে তারা নির্বাচন করে ১/১১এর কুশীলবদের মনমতো করে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিলো। এই ষড়যন্ত্রের মূল হোতাদের বিচার নিশ্চিত না করলে ভবিষ্যতে আবারো কোনো উচ্চাভিলাষী গোষ্ঠী গণতন্ত্রকে ভূলুণ্ঠিত করার সাহস দেখাতে পারে। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি মজবুত করার জন্য এই বিচার এখন সময়ের দাবি।



মন্তব্য করুন