দুঃসময়ের স্মৃতি ও প্রত্যাশা

September 20, 2026,

মো. রেদওয়ানুল ইসলাম : ২০২৩ সালের নভেম্বরে প্রিয় মাতৃভূমিতে গিয়েছিলাম। উদ্দেশ্য আম্মা-আব্বা ও আত্মীয় স্বজনদের সাথে একটু ভালো সময় কাটানো। একটু রিলাক্সেশন। লন্ডন টু বাংলাদেশ সফরে আমার বোন, বোন জামাই এবং নবাগত ছোট্ট আদরের ভাগ্নি। কিন্তু দেশে যাওয়ার পর মনের ভেতর জমানো আনন্দ ২৪ ঘণ্টাও স্থায়ী হয়নি।

মৌলভীবাজারের বাসায় পৌঁছার ঠিক একদিন পরই বাড়ি থেকে খবর এলো— আব্বাকে ডিবি পুলিশ বাড়ির চারপাশ ঘেরাও করে তাঁকে আটক করে নিয়ে গেছে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি বিএনপির রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত।

অথচ, আমার আব্বা জনাব মো. ফখরুল ইসলাম বিএনপি করলেও তিনি কেমন মানুষ- মৌলভীবাজার শহর-সদরের মানুষ ভালো জানেন।

যাইহোক, আব্বাকে আটকের অনেক পর জানতে পারলাম তাঁকে মৌলভীবাজার সদর থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এক মুহূর্ত দেরি না করে থানায় ছুটে গেলাম। আব্বাকে চোখের সামনে দেখতে পেয়ে বুকের ভেতরের উৎকণ্ঠা কিছুটা কমে এলো। সেই কঠিন মুহূর্তেও আব্বা ছিলেন অটল ও শান্ত। তিনি শুধু বললেন— ‘আমি জেল কাটবো-  যা হওয়ার হবে কিন্তু কারও সহযোগিতা নিতে যেও না।’ সেই আপোসহীন ও দৃঢ়চেতা কন্ঠের ধ্বনি

আজও আমার কানে বাজে। আমরা তখন একমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা করেছিলাম। তবে সেই দুঃসময়ে অনেকেই নানাভাবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। মানসিক শান্ত্বনা দিয়েছেন। আমাদের এলাকার মানুষ বাড়িতে এসে সাহস যুগিয়েছেন। তাঁদের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ।

আব্বা জেলে যাওয়ার পর শুরু হলো কোর্ট আর জেলগেটের বারান্দায় আমাদের দিনের পর দিন ছুটে চলা। অসংখ্যবার কোর্টে গিয়েছি, জেলগেটের সামনে অপেক্ষা করেছি। যে সফরটি প্রিয়জনদের সাথে আনন্দে কাটানোর কথা সেটি পরিণত হলো উৎকণ্ঠা, অপেক্ষা আর অনিশ্চয়তায় ভরা কঠিন সফর।

সেই সময় আমার আরো কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছে- সেটা তিক্ত। সবটা হয়তো এখানে নাইবা বলি। তবে এতটুকু বলি- অন্যদের মতো আমরা আড়ালে আবড়ালে সম্পর্ক রেখে নীতির ও আদর্শ বিসর্জন দেইনি। দ্বিচারিতা ও রাজনৈতিক বহুমুখি চরিত্র প্রদর্শন করিনি। এ ব্যাপারে এতটুকুই বললাম। তবে- আলহামদুলিল্লাহ! আমাদের পরিবার কখনো অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেনি। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আত্মীয়তার সম্পর্ককে আব্বার মুক্তির জন্য ব্যবহার করিনি। দীর্ঘদিন কারাবাসের পর স্বাভাবিক নিয়মে তিনি জামিন লাভ করেছেন। এইক্ষেত্রে আব্বার রাজনৈতিক আদর্শের খাস দুয়েকজন সহকর্মী সহযোগিতা করেছেন। এটা আমাদের প্রতি তাদের এহসান।

আমি আমার দাদাকে দেখেছি এক দৃঢ় মনোবলের মানুষ হিসাবে। তাঁর মুখে শুনেছি আমাদের পূর্ব পুরুষদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। অন্যায় ও অসত্যের কাছে মাথা নত না করার গোষ্ঠীগত সিলসিলার ইতিহাস। আমার বাবা-চাচারাও সে রকমই। পরোপকার, মানুষের সাথে সুন্দর ব্যবহার ও সহযোগিতার মনোভাবে প্রতিপালিত। মূল্যবোধ ধারণ করেই জীবনযাপন করেছেন।

আমার বাবা রাজনীতি করেন। তবে রাজনীতি কখনোই আমাদের পরিবারের রুটি-রুজি কিংবা ব্যবসার মাধ্যম নয় ও কখনো ছিল না। আমার তিন চাচা, দুই ফুফু এবং আমরা তিন ভাই-বোন— সবাই লন্ডন প্রবাসী। নিজেদের আয় ও পরিশ্রমের ওপর নির্ভর করেই আমাদের পরিবার পরিচালিত হয়।

মৌলভীবাজারের কৃতিসন্তান জনাব এম. সাইফুর রহমানের আদর্শ ও রাজনৈতিক চিন্তাধারার প্রতি আকৃষ্ট হয়েই আমার আব্বার রাজনৈতিক পথচলার সূচনা। পরবর্তীতে তিনি জনাব এম. নাসের রহমানের একজন বিশ্বস্ত ও দায়িত্বশীল কর্মী হিসেবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত আছেন। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও প্রতিকূলতা কিংবা সময়ের পরিবর্তন তাঁর সেই রাজনৈতিক অবস্থান ও বিশ্বাসকে পরিবর্তন করতে পারেনি।

প্রতিকূল সময়েও তিনি যে অবস্থানকে নিজের কাছে সঠিক ও ন্যায়সঙ্গত মনে করেছেন, সেটির ওপরই অটল থেকেছেন ও আছেন।

সম্প্রতি তিনি জনাব এম. নাসের রহমান এমপি মহোদয়ের রাজনৈতিক সচিব হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। এটি আমাদের পরিবারের জন্য একটি দায়িত্বের বিষয় তেমনি জনগনের কাছে তা প্রত্যাশারও। আমরা আশা করি, এই দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তিনি মৌলভীবাজারের মানুষের কল্যাণ, এলাকার উন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার বিষয়গুলো যথাযথভাবে তুলে ধরতে পারবেন এবং এমপি মহোদয়কে বাস্তবসম্মত, জনবান্ধব ও সময়োপযোগী পরামর্শ দিতে পারবেন।

পরিশেষে আমাদের প্রত্যাশা একটাই— ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের কল্যাণ, এলাকার উন্নয়ন এবং জনগণের প্রত্যাশাকে সামনে রেখে তাঁর এই পথচলা অনেক দূর এগিয়ে যাক। মানুষের জন্য নুন্যতম কিছু যদি তিনি করতে পারেন তা আমাদের জন্য ইজ্জত, সম্মানের।

লেখক : মো. রেদওয়ানুল ইসলাম, লন্ডন প্রবাসী।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com