ফাতেহা-ই ইয়াজদাহাম: সত্য ও ন্যায়ের আলোয় বড়পীর (রহ.)-এর জীবনাদর্শ

মাওলানা বশির আহমদ : ফাতেহা-ই ইয়াজদাহাম মুসলিম সমাজে একটি সুপরিচিত স্মরণীয় দিন। হিজরি রবিউস সানি মাসের ১১ তারিখে হযরত গাউসুল আজম, বড়পীর, শায়খ আব্দুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর ওফাত দিবস স্মরণে বিভিন্ন স্থানে কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া-মোনাজাত, ইসালে সওয়াব ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। ‘ইয়াজদাহাম’ ফারসি শব্দ, যার অর্থ এগারো। আর ‘ফাতেহা’ বলতে সাধারণভাবে কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া-মোনাজাত ও ইসালে সওয়াবের আমলকে বোঝানো হয়।
হযরত শায়খ আব্দুল কাদির জিলানী (রহ.) ইসলামের ইতিহাসে একজন প্রসিদ্ধ আলেম, মহান আধ্যাত্মিক সাধক ও ওলী হিসেবে স্মরণীয়। তাঁর জীবন ছিল ইলম, আমল, তাকওয়া, সত্যবাদিতা, আত্মশুদ্ধি, মানবপ্রেম ও ন্যায়নীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি মানুষকে কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে জীবন পরিচালনা, আল্লাহর আনুগত্য, নফসের পরিশুদ্ধি এবং অন্যায়-অসত্য থেকে দূরে থাকার শিক্ষা দিয়েছেন।
বড়পীর (রহ.)-এর জীবনাদর্শের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল,শরিয়তের বিধান মেনে আত্মশুদ্ধির পথে চলা। তিনি শুধু জ্ঞান অর্জনের কথা বলেননি; বরং অর্জিত জ্ঞানকে জীবনে বাস্তবায়ন করার শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর কাছে ইলমের সৌন্দর্য ছিল আমলে, আমলের সৌন্দর্য ছিল ইখলাসে এবং ইখলাসের সৌন্দর্য ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে।
তাঁর শৈশবের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বহুল প্রচলিত ঘটনা সত্যবাদিতার অসাধারণ শিক্ষা বহন করে। বাগদাদে জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে যাত্রাকালে তাঁর মা তাঁকে সর্বাবস্থায় সত্য কথা বলার উপদেশ দিয়েছিলেন। পথে ডাকাতদল কাফেলা আক্রমণ করলে তাঁর কাছে থাকা স্বর্ণমুদ্রার কথা জিজ্ঞাসা করা হয়। তিনি মায়ের উপদেশ স্মরণ করে সত্য কথাই প্রকাশ করেন। তাঁর সত্যবাদিতা ডাকাতদের মনে গভীর প্রভাব ফেলে এবং তারা নিজেদের অন্যায় জীবন পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়,এ ঘটনাটি সত্য ও নৈতিকতার শক্তির একটি বহুল প্রচলিত দৃষ্টান্ত হিসেবে বর্ণিত হয়।
এই ঘটনা আমাদের শেখায়, সত্য কখনো ছোট নয় এবং মিথ্যা কখনো কল্যাণ বয়ে আনে না। একজন মানুষের সত্যবাদিতা কখনো কখনো শুধু তার নিজের জীবন নয়, অন্য মানুষের জীবনও পরিবর্তন করে দিতে পারে।
বড়পীর (রহ.)-এর জীবন থেকে আমাদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো আত্মশুদ্ধি। মানুষের সবচেয়ে বড় সংগ্রাম নিজের নফসের বিরুদ্ধে। অহংকার, হিংসা, লোভ, ক্রোধ, প্রতারণা ও অন্যের অধিকার নষ্ট করার প্রবণতা থেকে নিজেকে মুক্ত করে আল্লাহভীরু ও পরিশুদ্ধ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠাই আত্মশুদ্ধির মূল উদ্দেশ্য। তাই শুধু বাহ্যিক আমল নয়, অন্তরের পরিশুদ্ধির প্রতিও আমাদের যত্নবান হতে হবে।
তাঁর শিক্ষা আমাদের আমানতদারিতার কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। আমানত শুধু অর্থ-সম্পদের ক্ষেত্রে নয়; দায়িত্ব, পদ, কথা, সময়, জ্ঞান ও মানুষের অধিকার,সবই আমানতের অন্তর্ভুক্ত। যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, সে মানুষের হক নষ্ট করতে পারে না। তাই পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে, ব্যবসা-বাণিজ্যে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এবং সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে ন্যায় ও আমানতদারি প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
বড়পীর (রহ.)-এর জীবন আমাদের মানবপ্রেম ও সহমর্মিতারও শিক্ষা দেয়। ক্ষুধার্তকে খাদ্য দেওয়া, অসহায়কে সাহায্য করা, দুর্বলকে সহযোগিতা করা, মানুষের কষ্ট অনুভব করা এবং কারও অধিকার নষ্ট না করা,এসবই একজন মুমিনের চরিত্রের অংশ। ইবাদতের পাশাপাশি মানুষের প্রতি উত্তম আচরণ ইসলামের সৌন্দর্যকে প্রকাশ করে।
আজকের সমাজে যখন মিথ্যা, প্রতারণা, দুর্নীতি, হিংসা, অন্যায়, স্বার্থপরতা ও মানুষের অধিকার হরণের মতো নানা সমস্যা দেখা যায়, তখন বড়পীর (রহ.)-এর জীবনাদর্শ আমাদের জন্য অত্যন্ত অনুসরনযোগ্য। তাঁর স্মরণ তখনই সার্থক হবে, যখন আমরা তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের চরিত্র ও কর্মজীবনে সত্য, ন্যায়, তাকওয়া ও আমানতদারির বাস্তব অনুশীলন করব।
ব্যক্তি সৎ হলে পরিবারে শান্তি আসে। পরিবার সৎ হলে সমাজে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়। সমাজের মানুষ যখন ন্যায় ও সততার পথে চলে, তখন একটি শান্তিপূর্ণ ও কল্যাণময় রাষ্ট্র গড়ে ওঠার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সুতরাং সমাজ ও রাষ্ট্রের শান্তি প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি হয় মানুষের চরিত্র ও নৈতিকতার পরিবর্তনের মাধ্যমে।
ফাতেহা-ই ইয়াজদাহাম তাই শুধু একটি স্মরণীয় দিন নয়; এটি আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি ও জীবন সংশোধনেরও একটি উপলক্ষ। এই দিনে আমাদের নিজেদের কাছে প্রশ্ন করা উচিত,আমি কি সত্য কথা বলি? আমি কি মানুষের হক আদায় করি? আমি কি আমানত রক্ষা করি? আমি কি অন্যায় থেকে নিজেকে বিরত রাখি? আমার ইলম ও ইবাদত কি আমার চরিত্রকে সুন্দর করছে?
হযরত গাউসুল আজম শায়খ আব্দুল কাদির জিলানী (রহ.) আউলিয়ায়ে কেরামের একজন মহান রাহবার। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়,ইলমকে আমলে পরিণত করতে হবে, আমলকে ইখলাসে পূর্ণ করতে হবে এবং চরিত্রকে সত্য ও ন্যায়ের সৌন্দর্যে সাজাতে হবে।
আজ তাঁর পবিত্র ওফাত দিবসের স্মরণে আমরা তাঁর দরজা বুলন্দি কামনা করি এবং মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া করি,আল্লাহ তাআলা হযরত বড়পীর আব্দুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর প্রতি অশেষ রহমত ও মাগফিরাত নাজিল করুন। তাঁর জীবনাদর্শ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার তাওফিক দান করুন। আমাদের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করুন, ঈমান ও আমলকে সুন্দর করুন, মিথ্যা ও অন্যায় থেকে হেফাজত করুন, মানুষের হক আদায় করার তাওফিক দিন এবং সত্য, ন্যায়, তাকওয়া, মানবতা ও শান্তির পথে অবিচল রাখুন। মহান আল্লাহ আমাদের ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার তাওফিক দান করুন।
লেখক : বশির আহমদ, উলুয়াইল ইসলামিয়া আলিম মাদরাসা।



মন্তব্য করুন