তালেবুল ইলমদের মর্যাদা ও তাদের প্রতি সমাজের দায়িত্ব

মাওলানা বশির আহমদ : আলহামদুলিল্লাহ। সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহ তায়ালার জন্য। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর প্রতি, তাঁর পরিবার-পরিজন, সাহাবায়ে কেরাম এবং কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর অনুসারীদের প্রতি।
তালেবুল ইলম কারা? :
‘তালেবুল ইলম’ অর্থ হলো জ্ঞান অন্বেষণকারী। বিশেষ করে যারা দ্বীনি জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে মাদরাসা, মক্তব কিংবা কোনো আলেমের কাছে অধ্যয়ন করে, তাদের তালেবুল ইলম বলা হয়।
একজন তালেবুল ইলম শুধু নিজের জন্য জ্ঞান অর্জন করে না; তার মাধ্যমে একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আলোকিত হতে পারে। আজ যে শিশু বা কিশোরটি কুরআন, হাদিস, ফিকহ, আকাইদ ও ইসলামী আদর্শ শিখছে, ভবিষ্যতে সে হয়তো একজন আলেম, ইমাম, শিক্ষক, মুফতি কিংবা সমাজের একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে মানুষের সেবা করবে।
ইসলামে জ্ঞান অর্জনের মর্যাদা :
ইসলাম জ্ঞান অর্জনকে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ কাজ হিসেবে ঘোষণা করেছে। পবিত্র কুরআনের প্রথম নাজিল হওয়া শব্দগুলোর অন্যতম হলো,‘ইকরা’, অর্থাৎ ‘পড়ো’।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে আমার রব! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দিন।’-(সূরা ত্বহা: ১১৪)
অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান?’-(সূরা আয-যুমার: ৯)
রাসুলুল্লাহ (সাঃ)বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে কোনো পথে চলে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন। (সহিহ মুসলিম)
অতএব, একজন মানুষ যখন দ্বীনি জ্ঞান অর্জনের জন্য সময়, শ্রম ও জীবন ব্যয় করে, তখন তাকে সম্মান করা এবং তার জ্ঞান অর্জনের সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি করা সমাজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
তালেবুল ইলমদের সম্মান করা কেন জরুরি? :
তালেবুল ইলমরা আমাদের দেশ,জাতী ও সমাজের ভবিষ্যৎ আমানত। তারা আজ শিক্ষার্থী, কিন্তু আগামী দিনে তারাই সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্বীনের আলো ছড়িয়ে দিতে পারে।
একজন তালেবুল ইলমের ভুল হতে পারে। সে হয়তো কোনো বিষয়ে অজ্ঞ হতে পারে কিংবা কোনো আচরণে অপরিপক্বতা দেখাতে পারে। কারণ সে এখনও শেখার পর্যায়ে আছে। তার ভুলকে কেন্দ্র করে তাকে অপমান, হেয় বা নিরুৎসাহিত করা উচিত নয়। বরং ভুল হলে তাকে সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে। কঠোর অপমান নয়, প্রয়োজন সংশোধন ও ভালোবাসা। কারণ যে ব্যক্তি শিখছে, তার ভুল থাকা স্বাভাবিক; কিন্তু ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ না দেওয়া তার প্রতি অবিচার।
অন্যের সন্তানকে নিয়ে এত চিন্তা, নিজের সন্তানের খবর কোথায়? :
আমাদের সমাজে একটি বিষয় অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে লক্ষ্য করা যায়, কিছু মানুষ তালেবুল ইলমদের ভালো করার চেয়ে তাদের ভুল খুঁজে বের করতেই যেন বেশি আগ্রহী।
অমুক তালেবুল ইলম এমন করেছে, তমুক ছাত্র এমন বলেছে, অমুকের আচরণ ভালো নয়, এভাবে অন্যের সন্তানের দোষ খুঁজতে অনেকের সময়ের অভাব হয় না। সামান্য ভুল দেখলেই সমালোচনা, দোষারোপ ও নানা মন্তব্য শুরু হয়ে যায়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, নিজের সন্তান কেমন চলছে, সে কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, কী দেখছে, কী শিখছে, নামাজ পড়ছে কি না, পড়াশোনা করছে কি না, তার চরিত্র কেমন হচ্ছে, এসবের খবর আমরা কতটা রাখছি?
অন্যের সন্তানের ভুল খুঁজে বের করার আগে নিজের সন্তানের দিকে একবার তাকানো প্রয়োজন।
অন্যের দোষ খুঁজতে অনেকের বড়ই ভালো লাগে; কিন্তু নিজের দিকে তাকানোর সময় যেন অনেকেরই নেই।
অন্যের সন্তানকে উপদেশ দেওয়া সহজ, কিন্তু নিজের সন্তানকে সঠিক পথে পরিচালিত করা কঠিন। তাই অন্যের সন্তানকে নিয়ে মন্তব্য করার আগে আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজের সন্তান ও নিজের পরিবারের দিকে নজর দেওয়া।
মনে রাখতে হবে, একটি শিশুর ভুল শুধরে দেওয়া দায়িত্ব; কিন্তু তাকে অপমান করে বেড়ানো কোনো দায়িত্ব নয়।
তালেবুল ইলমদের সঙ্গে কেমন আচরণ করা উচিত? :
তালেবুল ইলমদের সঙ্গে আমাদের আচরণ হতে হবে ভালোবাসাপূর্ণ, সম্মানজনক ও উৎসাহব্যঞ্জক।
কোনো দুর্বল ছাত্র ভুল করলে তার দিকে চোখ রাঙিয়ে দেওয়া, সবার সামনে অপমান করা, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা কিংবা এমন কথা বলা, যাতে সে নিজেকে মূল্যহীন মনে করে,এসব একজন শিক্ষার্থীর মনোবল ভেঙে দিতে পারে।
তাকে বলতে হবে, ‘তুমি ভুল করেছ, কিন্তু তুমি পারবে। আবার চেষ্টা করো। আমরা তোমাকে সাহায্য করব।’ এই একটি বাক্য হয়তো একজন দুর্বল ছাত্রের জীবন বদলে দিতে পারে।
মনে রাখতে হবে, দুর্বলের ভুল ধরা খুব সহজ; কিন্তু একজন দুর্বলকে শক্তিশালী করে তোলা অনেক বড় কাজ।
তালেবুল ইলমদের জ্বালানো নয়, গড়ে তোলা প্রয়োজন :
আমরা অনেক সময় শিক্ষার্থীর সামান্য ভুল দেখে কঠোর হয়ে যাই। অথচ একজন তালেবুল ইলমের হৃদয় অত্যন্ত কোমল। তার আত্মসম্মানবোধও রয়েছে। অতিরিক্ত বকাঝকা, অপমান, তুচ্ছতাচ্ছিল্য কিংবা অন্যের সামনে লজ্জা দেওয়া তাকে শিক্ষা থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে।
তাই শিক্ষক, অভিভাবক ও সমাজের দায়িত্ব হলো, তালেবুল ইলমদের জ্বালানো নয়, গড়ে তোলা; ভয় দেখানো নয়, উৎসাহ দেওয়া; অপমান করা নয়, সম্মান করা। কারণ আমরা যদি আজ তাদের ভেঙে দিই, আগামীকাল সমাজ একজন যোগ্য আলেম, শিক্ষক ও নীতিবান মানুষ হারাতে পারে।
শিক্ষকদের দায়িত্ব :
তালেবুল ইলমদের সবচেয়ে বড় অভিভাবক হলেন তাদের শিক্ষক। একজন শিক্ষক শুধু বই পড়াবেন না; তিনি শিক্ষার্থীর চরিত্রও গঠন করবেন।
শিক্ষকের উচিত শিক্ষার্থীর প্রতি স্নেহশীল হওয়া, দুর্বল ছাত্রকে অতিরিক্ত সহযোগিতা করা, ভুল হলে সুন্দরভাবে সংশোধন করা, ভালো কাজের প্রশংসা করা, তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানো এবং আদব-আখলাক শেখানো। একজন আদর্শ শিক্ষক শিক্ষার্থীর মধ্যে এই বিশ্বাস সৃষ্টি করবেন, ‘আমি পারব, ইনশাআল্লাহ।’
শিক্ষক যদি ভালোবাসা দিয়ে একজন ছাত্রকে গড়ে তুলতে পারেন, তাহলে সেই ছাত্র সারা জীবন তার শিক্ষকের জন্য দোয়া করবে।
অভিভাবকদের করণীয় :
তালেবুল ইলমদের উন্নতির পেছনে পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিভাবকদের উচিত সন্তানের পড়াশোনার খোঁজ নেওয়া, নিয়মিত মাদরাসায় পাঠানো, শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, প্রয়োজনীয় বই-খাতা ও শিক্ষা উপকরণের ব্যবস্থা করা এবং সন্তানকে দ্বীনি পরিবেশে বড় করা।
শুধু পরীক্ষার ফলাফল বা নম্বর দিয়ে সন্তানের মূল্যায়ন করা উচিত নয়। তার নামাজ, আদব, চরিত্র, সত্যবাদিতা, দায়িত্ববোধ এবং মানুষের সঙ্গে আচরণের দিকেও নজর দিতে হবে। বিশেষ করে অভিভাবকদের মনে রাখতে হবে,সন্তানের শিক্ষা শুধু মাদরাসা বা শিক্ষকের দায়িত্ব নয়; সন্তানকে মানুষ করার দায়িত্ব পরিবার ও সমাজেরও।
সমাজের দায়িত্ব :
একটি আদর্শ সমাজ তালেবুল ইলমদের পাশে দাঁড়ায়। দরিদ্র ও অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য বই, খাতা, পোশাক, খাবার ও আবাসনের ব্যবস্থা করা সমাজের সওয়াবের কাজ। যে ছাত্র অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় বই কিনতে পারে না, তাকে সহযোগিতা করা উচিত। যে ছাত্রের থাকার ব্যবস্থা নেই, তার জন্য আবাসিক সুবিধা তৈরি করা উচিত। এতিম ও অসহায় শিক্ষার্থীদের বিশেষভাবে সহযোগিতা করা প্রয়োজন। সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিরা চাইলে মাদরাসার জন্য ওয়াকফ, বৃত্তি, শিক্ষা উপকরণ ও আবাসিক সহায়তার ব্যবস্থা করতে পারেন।
তালেবুল ইলমদেরও কিছু দায়িত্ব আছে :
তালেবুল ইলমদের মর্যাদা যেমন আছে, তেমনি তাদের দায়িত্বও আছে। তাদের নিয়ত হতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও উপকারী জ্ঞান লাভ করা। তাদের সময়ের মূল্য বুঝতে হবে। নিয়মিত নামাজ আদায়, কুরআন তিলাওয়াত, পড়াশোনা, শিক্ষকের আদব, পিতা-মাতার সম্মান এবং উত্তম চরিত্র অর্জনের প্রতি যত্নবান হতে হবে।
বর্তমান সময়ে মোবাইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার শিক্ষার্থীদের জন্য বড় বাধা হতে পারে। তাই তালেবুল ইলমদের প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে প্রয়োজন ও কল্যাণের জন্য; সময় নষ্ট করার জন্য নয়।
তালেবুল ইলমদের অপমানের পরিণতি :
একজন শিক্ষার্থীকে অপমান করা মানে শুধু একজন মানুষকে কষ্ট দেওয়া নয়; কখনো কখনো তার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করা।
আজ যে ছাত্রটি দুর্বল, কাল সে হয়তো অসাধারণ কিছু করতে পারে। আজ যে ছাত্রটি একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছে না, ভবিষ্যতে সে হয়তো শত শত মানুষকে শিক্ষা দেবে। তাই কাউকে তার বর্তমান দুর্বলতা দিয়ে বিচার না করে তার সম্ভাবনাকে দেখতে হবে। আজকের তালেবুল ইলমই আগামী দিনের শিক্ষক, আলেম ও সমাজের পথপ্রদর্শক।
আমাদের প্রত্যেকের করণীয় :
আমাদের উচিত তালেবুল ইলমদের সম্মান করা, তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা, তাদের প্রয়োজনের সময় সহযোগিতা করা এবং তাদের জ্ঞান অর্জনে উৎসাহ দেওয়া।
তাদের ভুল হলে সুন্দরভাবে সংশোধন করতে হবে। কোনোভাবেই তাদের হেয় করা যাবে না। বিশেষ করে দুর্বল শিক্ষার্থীদের প্রতি আমাদের আরও বেশি সহানুভূতিশীল হতে হবে।
কারও ভুল দেখলে সমালোচনা করার আগে তাকে সংশোধনের চেষ্টা করি। অন্যের সন্তানের দোষ খোঁজার আগে নিজের সন্তানের খবর নিই। অন্যকে উপদেশ দেওয়ার পাশাপাশি নিজের পরিবারকেও সেই উপদেশের আলোকে গড়ে তুলি।
মনে রাখতে হবে, দুর্বলের প্রতি চোখ রাঙাবেন না; ভুল হলে তাকে শুধরে দিন। তালেবুল ইলমদের সম্মান করতে শিখুন। তাদের জ্বালাবেন না, গড়ে তুলুন। কারণ একটি তালেবুল ইলমকে গড়ে তোলা মানে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎকে গড়ে তোলা।
উপসংহার :
তালেবুল ইলমরা সমাজের বোঝা নয়; তারা সমাজের সম্পদ। তারা আজ জ্ঞান অর্জনের জন্য সংগ্রাম করছে, আগামী দিনে তারাই সেই জ্ঞান মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেবে। দেশ,জাতী ও সমাজ গঠনে আত্মনিয়োগ করবে।
তাই আসুন, আমরা তালেবুল ইলমদের ভালোবাসি, সম্মান করি, তাদের ভুলত্রুটি সুন্দরভাবে সংশোধন করি এবং তাদের পাশে দাঁড়াই।
অন্যের সন্তানকে ছোট না করে তাকে গড়ে তুলতে সহযোগিতা করি। অন্যের দোষ খোঁজার আগে নিজের সন্তান ও নিজের পরিবারের দিকে নজর দিই। কারণ সমাজের প্রতিটি শিশুই আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব ও ভবিষ্যতের আমানত।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সন্তান ও তালেবুল ইলমদের উপকারী জ্ঞান দান করুন, উত্তম চরিত্র দান করুন, তাদের জ্ঞান ও আমলে বরকত দিন এবং তাদের মাধ্যমে পরিবার, সমাজ ও দেশকে আলোকিত করুন। আমিন, ইয়া রব্বাল আলামিন।
লেখক : বশির আহমদ, মৌলভীবাজার সদর।



মন্তব্য করুন