আল্লামা আব্দুল কাইয়ুম সিদ্দিকী (রহঃ)-একজনই ছিলেন, এমন মানুষ খুব কমই আসেন

August 8, 2026,

বশির আহমদ : কিছু মানুষ পৃথিবীতে আসেন, মানুষের ভিড়ে মিশে যান; আবার কিছু মানুষ চলে যাওয়ার পরও মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকেন। আল্লামা আব্দুল কাইয়ুম সিদ্দিকী (রহঃ) ছিলেন সেই বিরল মানুষদের একজন।

তিনি একজনই ছিলেন। তাঁর মতো মহান, বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী, প্রজ্ঞাবান, স্নেহশীল ও বিশাল হৃদয়ের মানুষ খুব কমই আসেন।

তিনি ছিলেন একজন দক্ষ প্রশাসক, মাদরাসা গড়ার কারিগর, আদর্শ প্রিন্সিপাল, যোগ্য অভিভাবক, অসাধারণ শিক্ষক, দক্ষ সংগঠক এবং আদর্শ দায়ী ইলাল্লাহ। তিনি ছিলেন ছাত্রদের ভরসার ঠিকানা, অসংখ্য মানুষের আশ্রয়ের বটবৃক্ষ। তাঁর স্নেহের ছায়ায় কত মানুষ যে উপকৃত হয়েছেন, তার কোনো হিসাব নেই।

মাদরাসার প্রতি তাঁর দায়িত্বশীলতা ছিল অনন্য

আল্লামা আব্দুল কাইয়ুম সিদ্দিকী (রহঃ) মৌলভীবাজার টাউন কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ থাকাকালীন তাঁর দায়িত্ববোধ ও কর্মনিষ্ঠার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা আমাদের জন্য আজও অনুকরণীয়।

তিনি মাদরাসার নির্ধারিত সময়ের আগেই অফিসে এসে উপস্থিত হতেন এবং সর্বশেষে মাদরাসা ত্যাগ করতেন। মাদরাসার সময়কে তিনি এতটাই গুরুত্ব দিতেন যে, মাদরাসার সময়ের মধ্যে কখনো দাওয়াত, জিয়াফত কিংবা ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারণে বাইরে যেতেন না।

সকালে তাঁর বাসায় যতই মেহমান থাকুক, যতই ব্যস্ততা থাকুক,মাদরাসায় যাওয়ার সময় হয়ে গেলে সবকিছু ফেলে তিনি মাদরাসায় চলে যেতেন। নিজের ব্যক্তিগত সময়, আরাম কিংবা সামাজিক ব্যস্ততার চেয়ে তিনি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বকে বেশি গুরুত্ব দিতেন।

এটি শুধু সময়ানুবর্তিতা ছিল না; এটি ছিল প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ, আমানতদারি ও কর্তব্যনিষ্ঠার এক মহৎ দৃষ্টান্ত।

আজকের দিনে একজন প্রতিষ্ঠানপ্রধানের জন্য হুজুরের এই কর্মনিষ্ঠা সত্যিই অনুসরণীয়। তাঁর জীবন আমাদের শিক্ষা দেয়,একটি প্রতিষ্ঠানকে ভালোবাসতে হলে শুধু পদে থাকলেই হয় না, দায়িত্বকে হৃদয়ে ধারণ করতে হয়।

বৃহত্তর সিলেটের অন্যতম জনপ্রিয় ওয়াইজ ও আলেম হিসেবে তিনি ছিলেন লক্ষ মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর বয়ান ছিল হৃদয়গ্রাহী, জ্ঞানসমৃদ্ধ ও প্রভাব বিস্তারকারী। দেশ-বিদেশের হাজারো মানুষের জন্য তিনি ছিলেন রূহের খোরাক, চিন্তার আলো এবং তৃষ্ণার্ত হৃদয়ের প্রশান্তির ঠিকানা।

তিনি ছিলেন খলিফায়ে ফুলতলী ও ছাহেব বাড়ির একজন বিশ্বস্ত নাম। হযরত বিশকুটী ছাহেব কিবলাহ (রহঃ)-এর অত্যন্ত আদরের ও স্নেহভাজন ছিলেন। হাজারো আলেমের উস্তাদ, অসংখ্য ছাত্রের হৃদয়ের স্পন্দন এবং দ্বীনি অঙ্গনের মানুষের জন্য এক অনন্য প্রেরণার বাতিঘর ছিলেন তিনি।

হুজুরের মিষ্টভাষিতা ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম সৌন্দর্য। কেউ যত রাগ, অভিমান কিংবা ক্ষোভ নিয়েই তাঁর কাছে আসুক না কেন, তাঁর সামনে এসে সেই রাগ আর ধরে রাখা সম্ভব হতো না। তিনি এমন হেকমতপূর্ণ ও মায়াময় ভাষায় কথা বলতেন যে, রাগ করার সুযোগই থাকত না।

আমাদের উস্তাদ হিসেবে হুজুর

হুজুর শুধু একজন প্রিন্সিপাল ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষক। তাঁর প্রতিটি কথা, প্রতিটি উপদেশ এবং প্রতিটি পাঠ ছিল শিক্ষণীয়।

জোহরের নামাজের পর আমাদের ফাজিল শ্রেণিতে তিনি তাফসিরে জালালাইন ও কামিলে তাফসিরে কাশশাফ পড়াতেন। কর্মব্যস্ততার কারণে প্রতিদিন হয়তো ক্লাস নেওয়া সম্ভব হতো না। কিন্তু যেদিন তিনি বসতেন, একাধারে আসরের শেষ সময় পর্যন্ত পড়াতেন।

হুজুরের ক্লাস ছিল অসাধারণ আকর্ষণীয়। মনে হতো, তিনি যেন শ্রেণিকক্ষে নয় ময়দানে দাঁড়িয়ে ওয়াজ করছেন। দীর্ঘ সময় ধরে ক্লাস চললেও আমাদের একটুও বিরক্তি আসত না। বরং মনে হতো, হুজুর যদি আরও কিছুক্ষণ পড়াতেন!

ছাত্রদের তিনি শুধু ছাত্র হিসেবে দেখতেন না; হৃদয় থেকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসতেন। তাঁর স্নেহ, মমতা ও অভিভাবকসুলভ আচরণ আজও আমাদের হৃদয়ে অমলিন।

তাঁর বাসায় মেহমানদারির যেন এক হিড়িক লেগেই থাকত। জেলার সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সামাজিক নেতৃবৃন্দ, আলেম-উলামা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং সর্বসাধারণ,সবাই ছিলেন তাঁর আপনজন। তাঁর বিশাল হৃদয়, উদারতা ও মিষ্টভাষিতা মানুষকে বারবার তাঁর কাছে টেনে নিত।

আজ তিনি নেই। এই ‘নেই’ শব্দটি মেনে নেওয়া সত্যিই কঠিন। তাঁর অনুপস্থিতি আমরা হৃদয় দিয়ে অনুভব করছি। তাঁর কথা, তাঁর কণ্ঠ, তাঁর মিষ্টভাষী আচরণ, তাঁর স্নেহ, তাঁর হাসি এবং তাঁর শিক্ষণীয় কথাগুলো আজও আমাদের স্মৃতির পাতায় জীবন্ত। মানুষ চলে যায়, কিন্তু আদর্শ কখনো চলে যায় না।

আল্লামা আব্দুল কাইয়ুম সিদ্দিকী (রহঃ) আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর আদর্শ আছে, তাঁর শিক্ষা আছে, তাঁর কর্ম আছে, তাঁর ভালোবাসা আছে,আর আছে অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে তাঁর অমলিন স্মৃতি।

হুজুর ছিলেন আমাদের জন্য একটি বটবৃক্ষ,যার ছায়ায় আমরা শান্তি পেয়েছি, সাহস পেয়েছি, শিক্ষা পেয়েছি। আজ সেই বটবৃক্ষের ছায়া হারিয়ে আমরা সত্যিই শূন্যতা অনুভব করছি।

আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রিয় হুজুরের সকল দ্বীনি খেদমত কবুল করুন। তাঁর কবরকে নূরে ভরে দিন, তাঁর দরজা বুলন্দ করুন, জান্নাতুল ফিরদাউসে সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন এবং তাঁর রূহানি দোয়া, ফয়েজ ও বরকত আমাদের নসিব করুন।

লেখক: হুজুরের ছাত্র, বশির আহমদ, অধ্যক্ষ, উলুয়াইল ইসলাময়ি আলিম মাদরাসা।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com