পীর ও ওলী-আউলিয়া: পরিচয়, মর্যাদা ও দায়িত্ব

বশির আহমদ :
ভূমিকা: ইসলাম মানুষের বাহ্যিক আমলের পাশাপাশি অন্তরের পরিশুদ্ধি, চরিত্র গঠন এবং আল্লাহমুখী জীবন প্রতিষ্ঠার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। এ উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহ যুগে যুগে নবী-রাসূলগণকে প্রেরণ করেছেন। তাঁদের ইন্তিকালের পর উলামায়ে রব্বানী, মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফকীহ এবং আল্লাহভীরু নেককার ব্যক্তিগণ দ্বীনের দাওয়াত, শিক্ষা, আত্মশুদ্ধি (তাযকিয়াহ) ও মানবকল্যাণের মহান দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
মুসলিম সমাজে এ ধরনের আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শকদের অনেক সময় ‘পীর’, ‘শাইখ’, ‘মুরশিদ’ এবং আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের ‘ওলী’ বা ‘আউলিয়া’ বলা হয়।
কিন্তু দুঃখের বিষয়, একদিকে কিছু মানুষের অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি ও কুসংস্কারের কারণে ওলী-আউলিয়াদের মর্যাদা সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে, অন্যদিকে কিছু ভণ্ড পীরের অপকর্ম দেখে কেউ কেউ আবার প্রকৃত ওলী-আউলিয়ার অস্তিত্ব ও মর্যাদাকেই অস্বীকার করতে শুরু করেছেন। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো,হককে হক এবং বাতিলকে বাতিল হিসেবে গ্রহণ করা।
‘পীর’ শব্দের অর্থ ও ইসলামী অবস্থানঃ
‘পীর’ একটি ফারসি শব্দ। এর অর্থ,প্রবীণ, অভিজ্ঞ, মুরব্বি বা আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক। কুরআন বা সহীহ হাদীসে এ শব্দটি নেই। ইসলামী পরিভাষায় এর নিকটবর্তী শব্দ হলো, শাইখ, রব্বানী আলেম, মুরব্বী বা মুযাক্কী।
সুতরাং ‘পীর’ কোনো শরয়ী পদবি নয়; বরং একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উপাধি। ইসলামে মর্যাদার ভিত্তি হলো ঈমান, তাকওয়া, ইলম ও নেক আমল।
আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বাধিক সম্মানিত, যে সর্বাধিক তাকওয়াবান।” (সূরা আল-হুজুরাত: ১৩)
ওলী-আউলিয়া কারা?
আল্লাহ তাআলা বলেন, “জেনে রাখ! নিশ্চয়ই আল্লাহর ওলীগণের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না। তারা হলো সেই সব লোক, যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করেছে।” (সূরা ইউনুস: ৬২-৬৩)
এই আয়াত থেকেই স্পষ্ট হয় যে ওলীর পরিচয় দুটি গুণে নির্ধারিত, বিশুদ্ধ ঈমান, তাকওয়া। অতএব, অলৌকিক ঘটনা, বিশেষ পোশাক, অসংখ্য অনুসারী কিংবা লোকমুখে প্রচলিত কিংবদন্তি কোনো ব্যক্তিকে ওলী প্রমাণ করে না। কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণই প্রকৃত মানদণ্ড।
ওলী-আউলিয়াগণ সিরাতে মুস্তাকীমের পথপ্রদর্শকঃ
প্রকৃত ওলী-আউলিয়াগণ মানুষকে নিজেদের প্রতি নয় বরং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম এর আনুগত্যের দিকে আহ্বান করেন।
তাঁরা খানেকায় তা, লিম, জিকির, তিলাওয়াত, ইলম, তাযকিয়াহ এবং উত্তম চরিত্র গঠনের মাধ্যমে মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা করেন। সহীহ আকীদা, সুন্নাহর অনুসরণ, পিতা-মাতার সম্মান, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা, হালাল জীবিকা, মানবসেবা, এতিম প্রতিপালন এবং তাকওয়াপূর্ণ জীবনযাপনের শিক্ষা দেন।
প্রকৃত পীর ও ওলীদের দায়িত্ব :
প্রকৃত আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শকদের প্রধান দায়িত্ব হলো,
মানুষকে তাওহীদ ও সুন্নাহর দিকে আহ্বান করা।
শিরক, বিদআত ও কুসংস্কার থেকে সতর্ক করা।
কুরআন ও সুন্নাহ শিক্ষা দেওয়া।
আত্মশুদ্ধির শিক্ষা প্রদান করা।
সমাজে ন্যায়, ইনসাফ ও মানবকল্যাণ প্রতিষ্ঠা করা।
এতিম, অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
মানুষকে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করতে উদ্বুদ্ধ করা,এবং নবীজির মহব্বত অন্তরে ধারণ করার শিক্ষা দেয়া।
কেরামত সম্পর্কে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আকীদাঃ
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সর্বসম্মত আকীদা হলো,আল্লাহর নেক বান্দাদের মাধ্যমে কেরামত প্রকাশ পাওয়া সত্য।
আকাঈদে নাসাফীতে বলা হয়েছে, “وَكَرَامَاتُ الْأَوْلِيَاءِ حَقٌّ”, “ওলী-আউলিয়াগণের কেরামত সত্য।”
ইমাম তাহাবী (রহ.)-ও তাঁর আকীদাগ্রন্থে ওলী-আউলিয়াদের কেরামতকে সত্য বলে উল্লেখ করেছেন।
তবে মনে রাখতে হবে, কেরামত কোনো ব্যক্তির শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র প্রমাণ নয়। প্রকৃত ওলী কখনো কেরামত প্রদর্শনের মাধ্যমে মানুষের প্রশংসা অর্জন করতে চান না; বরং তাঁরা তা গোপন রাখাকে পছন্দ করেন। কারণ তাঁদের উদ্দেশ্য নিজের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।
একজন ওলীর সর্বশ্রেষ্ঠ কেরামত হলো,
সুন্নাহর ওপর অবিচল থাকা।
ইখলাসের সঙ্গে ইবাদত করা।
গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা।
মানুষের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করা।
চরিত্র ও আমলের মাধ্যমে মানুষকে হেদায়েতের পথে আনা।
যে বিশ্বাসগুলো ইসলামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়ঃ
ইসলামে পীর ও ওলী-আউলিয়ার মর্যাদা অত্যন্ত সম্মানজনক। তবে তাঁদের সম্পর্কে এমন কিছু বিশ্বাস সমাজে প্রচলিত রয়েছে, যা কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয়। যেমন,পীর গায়েব জানেন, সর্বত্র উপস্থিত থাকেন, স্বাধীনভাবে মানুষের উপকার বা ক্ষতি করতে পারেন, কবরবাসী ওলীরা স্বাধীনভাবে মানুষের ডাকে সাড়া দেন, পীরের কথা শরীয়তের বিধানের ঊর্ধ্বে, অথবা শুধু কোনো পীরের হাতে বায়আত গ্রহণ করলেই জান্নাত নিশ্চিত হয়ে যায়। এসব ধারণা ইসলামের বিশুদ্ধ আকীদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ইসলাম শিক্ষা দেয়, উপকার-অপকার করার প্রকৃত ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ তাআলার। সকল নবী, রাসূল ও ওলী-আউলিয়া আল্লাহর বান্দা; তাঁরা আল্লাহর ইচ্ছা ও ক্ষমতার অধীন।
আল্লাহ তাআলা বলেন, “বলুন, আমি নিজের উপকার বা অপকার করারও মালিক নই; আল্লাহ যা চান তাই হয়। আর যদি আমি গায়েবের জ্ঞান জানতাম, তবে অবশ্যই অনেক কল্যাণ লাভ করতাম এবং কোনো অকল্যাণ আমাকে স্পর্শ করত না।” (সূরা আল-আ’রাফ: ১৮৮)
অতএব, প্রকৃত পীর ও ওলী-আউলিয়াকে ভালোবাসা, সম্মান করা এবং তাঁদের নেক আদর্শ অনুসরণ করা ইসলামের শিক্ষা। কিন্তু তাঁদের সম্পর্কে এমন কোনো বিশ্বাস পোষণ করা, যা একমাত্র আল্লাহ তাআলার বিশেষ গুণাবলিকে তাঁদের জন্য সাব্যস্ত করে বা শরীয়তের সীমা অতিক্রম করে, তা পরিহার করা প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য।
প্রকৃত পীরের বৈশিষ্ট্যঃ
কুরআন ও সুন্নাহকে সর্বোচ্চ মানদণ্ড মনে করেন।
মানুষকে নিজের নয়; আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহুআলাইহিওয়াসাল্লাম এর অনুসরণে আহ্বান করেন।
সহীহ আকীদার শিক্ষা দেন।
বিদআত, শিরক ও কুসংস্কারের বিরোধিতা করেন।
বিনয়ী, আমানতদার ও চরিত্রবান হন।
হালাল উপার্জন ও তাকওয়ার শিক্ষা দেন।
ব্যক্তিপূজা নয়; আল্লাহর ইবাদতের দিকে মানুষকে পরিচালিত করেন।
ভণ্ড পীরদের কারণে প্রকৃত ওলী-আউলিয়াদের অস্বীকার নয়ঃ
বর্তমান সময়ে কিছু ভণ্ড পীর ও কথিত ওলী শরীয়তবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত। তাঁদের প্রতারণা ও অপকর্ম অবশ্যই বর্জনীয়।
কিন্তু কিছু ভণ্ডের কারণে সকল ওলী-আউলিয়াকে অস্বীকার করা ন্যায়সঙ্গত নয়। যেমন ভণ্ড চিকিৎসকের কারণে চিকিৎসাবিদ্যা বাতিল হয় না, ভণ্ড আলেমের কারণে আলেমদের মর্যাদা নষ্ট হয় না; তেমনি ভণ্ড পীরের কারণে প্রকৃত ওলী-আউলিয়ার মর্যাদাও অস্বীকার করা যায় না।
আমাদের কর্তব্য হলো, কুরআন ও সুন্নাহকে মানদণ্ড বানিয়ে ব্যক্তি ও মতকে মূল্যায়ন করা।
উপসংহার
পীর ও ওলী-আউলিয়া ইসলামী ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ভারত উপমহাদেশে তাঁদের মাধ্যমেই ইসলাম প্রচারিত হয়েছে।তাঁরা উম্মাহর আত্মশুদ্ধি, চরিত্র গঠন, দ্বীনের শিক্ষা এবং মানবকল্যাণে অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন।
প্রকৃত ওলী সেই ব্যক্তি, যিনি ঈমান ও তাকওয়ায় পরিপূর্ণ, শরীয়তের অনুসারী এবং মানুষকে আল্লাহর পথে পরিচালিত করেন। অন্যদিকে, যে ব্যক্তি শরীয়তবিরোধী বিশ্বাস প্রচার করে, মানুষকে নিজের প্রতি নির্ভরশীল করে তোলে অথবা অলৌকিক ক্ষমতার দাবি করে, সে প্রকৃত ওলী হতে পারে না।
আজ আমাদের প্রয়োজন ব্যক্তিপূজা নয়; বরং কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক বিশুদ্ধ আকীদা, তাকওয়া, ইলম, নৈতিকতা ও মানবকল্যাণের চর্চা। এ পথেই গড়ে উঠবে আল্লাহভীরু ব্যক্তি, আদর্শ সমাজ এবং ওলী-আউলিয়াগণের প্রকৃত উত্তরসূরি নেতৃত্ব।
লেখক: বশির আহমদ, অধ্যক্ষ, উলুয়াইল ইসলামিয়া আলিম মাদরাসা



মন্তব্য করুন