ভিউয়ের নেশায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কোথায় যাচ্ছে?

September 12, 2026,

বশির আহমদ : বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে গেছে। শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ, সংবাদ, বিনোদন,সব ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার রয়েছে। মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছাড়া এখন অনেক কাজই কঠিন। কিন্তু প্রয়োজনীয় এই প্রযুক্তি যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন তা ব্যক্তি, পরিবার,সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় ধরনের সমস্যার কারণ হতে পারে।

বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি শ্রেণির যুবক-যুবতীর মধ্যে বেশি ভিউ, লাইক ও ফলোয়ার পাওয়ার এক ধরনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। দ্রুত ভাইরাল হওয়ার জন্য অনেকে এমন ছবি,ভিডিও ও কর্মকাণ্ড প্রকাশ করছেন, যা আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ,পারিবারিক শিক্ষা ও শালীনতার সঙ্গে মানানসই নয়। কী প্রকাশ করছি, এর প্রভাব সমাজের ওপর কী হবে, শিশুরা এগুলো দেখে কী শিখবে,এসব বিষয় অনেক সময় তারা ভাবছেন না।

একজন একটি ভিডিও প্রকাশ করছে,সেটি ভাইরাল হলে অন্যজন তার চেয়েও বেশি আকর্ষণীয় বা অস্বাভাবিক কিছু করার চেষ্টা করছে। এভাবে একের পর এক নেতিবাচক বিষয় ছড়িয়ে পড়ছে। অশালীনতা,মিথ্যা তথ্য, অপমানজনক আচরণ, অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ড ও নানা ধরনের নেতিবাচক বিষয় খুব দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুধু খারাপ বিষয়ই আছে,এ কথা বলা ঠিক হবে না। এখানে অসংখ্য ভালো ও শিক্ষামূলক বিষয়ও রয়েছে। রয়েছে কুরআন-হাদিসের আলোচনা, অসংখ্য ওয়াজ-মাহফিল,নাশিদ, ইসলামি জ্ঞানবিষয়ক লেখা,দ্বীনি শিক্ষা এবং অসংখ্য মূল্যবান ইসলামী কিতাবের আলোচনা ও উপস্থাপনা। একজন মানুষ চাইলে ঘরে বসেই অনেক ভালো বিষয় শিখতে পারেন। ভালো কাজে মানুষকে উৎসাহিত করার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একটি শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে।

কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, আমাদের অনেক যুবক-যুবতী এসব ভালো ও জ্ঞানমূলক বিষয়ের প্রতি যতটা আগ্রহ দেখানোর কথা ততটা দেখাচ্ছে না। বরং এমন অনেক বিষয় তাদের বেশি আকৃষ্ট করছে,যা ধীরে ধীরে তাদের নৈতিকতা, চরিত্র ও জীবনের সঠিক পথ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। যে প্রযুক্তি দিয়ে একজন যুবক কুরআন-হাদিস শিখতে পারে, ইসলামী কিতাব পড়তে পারে,একজন আলেমের আলোচনা শুনতে পারে,সেই প্রযুক্তিই আবার তাকে অশালীনতা, সময়ের অপচয় ও বিভিন্ন খারাপ অভ্যাসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

সবচেয়ে বেশি চিন্তার বিষয় হলো আমাদের শিশু-কিশোরদের ভবিষ্যৎ। একটি শিশু প্রতিদিন মোবাইলের পর্দায় যা দেখে, তা তার চিন্তা, ভাষা, আচরণ ও রুচির ওপর প্রভাব ফেলে। বড়রা অনেক সময় ভালো-মন্দ বিচার করতে পারে, কিন্তু শিশুরা সবসময় তা পারে না। তারা যা দেখে, তা অনুকরণ করতে চায়। ফলে আজকের খারাপ বিষয়গুলো যদি তাদের কাছে স্বাভাবিক হয়ে যায়, তাহলে ভবিষ্যৎ সমাজ কেমন হবে,এটা আমাদের এখনই ভাবতে হবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে,একটি ভিডিওর ভিউ হয়তো কয়েক লাখ হতে পারে, কিন্তু সেই ভিডিও একজন শিশুর মনে কী প্রভাব ফেলছে, তার হিসাব আমরা রাখছি না। একটি খারাপ দৃশ্য বা অশালীন কথা হয়তো কয়েক সেকেন্ডের, কিন্তু তা কোনো কোমলমতি শিশুর মনে দীর্ঘদিনের জন্য ছাপ ফেলতে পারে।

এটি শুধু পরিবারের সমস্যা নয় এটি পুরো সমাজের সমস্যা। সরকার, পরিবার,শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, আলেম-উলামা এবং সচেতন নাগরিক, সবারই এ বিষয়ে দায়িত্ব রয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আইন ও নীতিমালা প্রয়োজন। তবে উদ্দেশ্য মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বন্ধ করা নয়। বরং শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা,সামাজিক শালীনতা,ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং সমাজের নৈতিক পরিবেশ রক্ষা করা জরুরি।

অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে। সন্তানকে শুধু মোবাইল কিনে দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। সন্তান কী দেখছে, কত সময় মোবাইল ব্যবহার করছে এবং কী ধরনের কনটেন্টে বেশি আগ্রহী হচ্ছে, সেদিকে অভিভাবকদের নজর রাখতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তির ভালো ব্যবহার ও খারাপ ব্যবহারের বিষয়ে সচেতন করতে হবে।

বিশেষ করে আমাদের যুবসমাজকে বুঝতে হবে,জীবনের আসল সফলতা বেশি ভিউ, লাইক বা ফলোয়ারের মধ্যে নেই। একজন মানুষের আসল পরিচয় তার চরিত্র, জ্ঞান, নৈতিকতা ও ভালো কাজে।

আমরা যদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করতেই হয়, তাহলে কেন আমরা ভালো কাজের জন্য এটি ব্যবহার করব না? কেন একটি ভালো কথা ছড়িয়ে দেব না? কেন একটি কুরআনের আয়াত, হাদিস, ইসলামী জ্ঞান, শিক্ষামূলক বক্তব্য, নাশিদ কিংবা মানুষের উপকারে আসে এমন তথ্য ছড়িয়ে দেব না?

যে যুবকের হাতে মোবাইল, তার হাতেই রয়েছে ভালো কিছু ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ। তার একটি ভালো পোস্ট, একটি ভালো বক্তব্য কিংবা একটি সুন্দর লেখা হয়তো অন্য একজনের জীবন পরিবর্তনের কারণ হতে পারে।

তাই প্রয়োজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করা নয়; প্রয়োজন এর সঠিক ব্যবহার শেখানো। ভিউয়ের জন্য নিজের বিবেক ও মূল্যবোধকে বিসর্জন দেওয়া নয়, বরং জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবকল্যাণের জন্য প্রযুক্তিকে কাজে লাগানো।

আজকের শিশু-কিশোররাই আগামী দিনের শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আলেম, প্রশাসক, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক ও দেশের নেতৃত্ব দেবে। তাই তাদের সামনে আমরা কী তুলে ধরছি, সেটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

আজ আমরা যে ডিজিটাল পরিবেশ তৈরি করছি, আগামী প্রজন্ম সেই পরিবেশেই বেড়ে উঠবে। তাই এখনই আমাদের সচেতন হতে হবে।

লেখক : বশির আহমদ, মৌলভীবাজার।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com