বিশ্ব শিক্ষক দিবস হোক পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারির অঙ্গীকার ও প্রত্যয়ের দিন

October 4, 2026,

বশির আহমদ : প্রতিবছর ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়। এ দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো শিক্ষকদের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া, তাঁদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা এবং শিক্ষার উন্নয়নে তাঁদের ভূমিকা তুলে ধরা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে শিক্ষক দিবস এখনো অনেক ক্ষেত্রে গতানুগতিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

৬ লক্ষাধিক এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীর প্রাণের দাবি হলো পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রজ্ঞাপন জারি। তাই এবারের বিশ্ব শিক্ষক দিবস হোক শিক্ষকদের এই ন্যায্য দাবি পূরণের প্রত্যয়ে।

দিবসটি শুধু আলোচনা, বক্তব্য ও পুরস্কার বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারির কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষকদের মুখে হাসি ফোটানো হোক।

শিক্ষক জাতির মেরুদণ্ড। একটি শিক্ষিত, সচেতন ও উন্নত জাতি গঠনে শিক্ষকদের ভূমিকা অপরিসীম। অথচ শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদার প্রশ্নে আমরা এখনো প্রত্যাশিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারিনি। ২০১৫ সালের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে ২০২৬ সালে নতুন পে-স্কেল ঘোষণার কথা শোনা গেলেও সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপন বা পরিপত্র জারি না হওয়ায় শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। তাঁদের দাবি, দ্রুত পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি করে প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলন ঘটানো হোক।

প্রতিবছর বিশ্ব শিক্ষক দিবসে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আলোচনা সভা, সম্মাননা প্রদানসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়। এসব অনুষ্ঠানে কিছু শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে তাঁদের অবদানের জন্য পুরস্কৃত করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শুধু কয়েকজন শিক্ষককে সম্মাননা দিলেই কি দেশের সব শিক্ষকের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত হয়? দিবসটি পালনের জন্য পর্যাপ্ত সরকারি বরাদ্দ ও কার্যকর কর্মপরিকল্পনার অভাবও অনেক ক্ষেত্রে এর গুরুত্বকে সীমিত করে রাখে। শিক্ষক দিবসের মর্যাদা বাড়াতে হলে আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি শিক্ষকদের বাস্তব সমস্যা সমাধানে গুরুত্ব দিতে হবে।

বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক যুগে মেধাবী তরুণদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করতে হলে আর্থিক নিরাপত্তা, পেশাগত সুযোগ-সুবিধা এবং সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু শিক্ষকতা একটি মহান পেশা,এ কথা বললেই দায়িত্ব শেষ হয় না। শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। একজন শিক্ষক যেন সম্মানজনকভাবে জীবনযাপন করতে পারেন এবং নিশ্চিন্তে পাঠদানে মনোনিবেশ করতে পারেন, সেই পরিবেশ তৈরি করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব।

বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রে একজন শিক্ষক তাঁর পরিচয় দিয়ে প্রশাসনিক কার্যালয়ে গেলে প্রত্যাশিত গুরুত্ব পান না। অথচ রাজনৈতিক নেতা কিংবা সাংবাদিক পরিচয়ে কেউ গেলে তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব পাওয়ার অভিজ্ঞতা অনেকের রয়েছে। অবশ্যই রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিকসহ সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মান প্রাপ্য। কিন্তু একজন শিক্ষক কেন তাঁর ন্যায্য সম্মান ও সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হবেন?

যাঁরা মানুষ গড়ার কারিগর, তাঁদের প্রতি আচরণেও সেই সম্মানের প্রতিফলন থাকা উচিত।

শিক্ষকদের মর্যাদা শুধু বক্তৃতার মঞ্চে নয়, বাস্তব জীবনেও প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। প্রশাসনিক কার্যালয়, সামাজিক অনুষ্ঠান, রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ এবং সর্বস্তরে শিক্ষকদের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাঁদের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করে শুধু ফুল, ক্রেস্ট ও বক্তব্যের মাধ্যমে প্রকৃত সম্মান প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।

আমরা চাই, বিশ্ব শিক্ষক দিবস হোক শিক্ষকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারের দিন। ৬ লক্ষাধিক এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীর ন্যায্য দাবি বিবেচনা করে পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন দ্রুত জারি করা হোক। একই সঙ্গে শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা ও পেশাগত অধিকার নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক। শুধু মুখে নয়, বাস্তবে শিক্ষকদের মূল্যায়ন চাই। শিক্ষকের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হোক সর্বস্তরে।

লেখক : বশির আহমদ, অধ্যক্ষ, উলুয়াইল ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, মৌলভীবাজার সদর।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com