কুলাউড়ার ভাটেরায় প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে শিশু ইভা হত্যা-৫ বছর পর ঘটনার ক্লু উদঘাটন

এইচ ডি রুবেল॥ দখল ঠেকাতে এবং প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে কৌশলের আশ্রয় নেয় নিজাম মিয়ার পরিবার। নিজামের মা বীরু বেগম তার দুই ছেলে আবুল মিয়া ও রাশিদ আলীকে নির্দেশ দেন নিজামের মেয়ে ইভাকে হত্যা করার জন্য। শিশু ইভার চাচা আবুল মিয়া মায়ের নির্দেশ মেনে ইভাকে জবাই করেন। তারপর সেই রক্তাক্ত দেহ নিয়ে ইভার মা রুবিনা বেগম যান ঘটনাস্থলে।
কুলাউড়া উপজেলার ভাটেরা ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামের দুই প্রতিবেশী নিজাম মিয়া এবং মধু মিয়ার মধ্যে জমিজমা নিয়ে তুমুল বিরোধ চলছিলো। একদিন মধু মিয়া দলবল নিয়ে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে নিজামের জমি দখল করতে যান। দু’পক্ষের লড়াই শুরুর পর হঠাৎ সেখানে দেখা যায় নিজামের পাঁচ মাস বয়সী মেয়ে ইভা বেগমের রক্তাক্ত নিথর দেহ নিয়ে সেই জমিতে তার পরিবারের সদস্যরা আহাজারি শুরু করেন।
প্রতিপক্ষ মধু মিয়ার দলের হাতে খুন হয়েছে শিশু ইভা। কিন্তু পাঁচ বছর আগের চাঞ্চল্যকর এই খুনের নেপথ্যে ভিন্ন কাহিনী জানায় মামলার সর্বশেষ তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পিবিআই তদন্তেই বেরিয়ে এসেছে আসল রহস্য।
ঘটনার ২০১২ সালের ১৪ আগস্ট সকালে শিশু ইভা হত্যাকান্ডের পর তার বাবা নিজাম মিয়া বাদী হয়ে কুলাউড়া থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় মধু মিয়া ও তার ভাই মাসুদ মিয়াসহ অজ্ঞাতনামা লোকজনকে আসামি করা হয়।
ওই মামলা তদন্তে কুলাউড়া থানা পুলিশ খুনের অভিযোগ প্রমাণ করতে না পেরে চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করে। বাদী নারাজি দিলে আদালত সরাসরি ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে মামলা তদন্তের দায়িত্ব দেন। সাক্ষ্যপ্রমাণ না পেয়ে আসামিদের অব্যাহতি দিয়ে আবারও চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়া হয়। বাদী আবারও নারাজি দেন। আদালত মৌলভীবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দেন। কিন্তু তাতেও কোন ফায়সালা না হলে। আদালতের নির্দেশে ২০১৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি মামলাটি’র তদন্তভার নেয় পিবিআই। তদন্তের দায়িত্ব পান জেলা পিবিআই’র পরিদর্শক মোঃ তরিকুল ইসলাম। ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার মামলার এজাহার এবং আগের চূড়ান্ত প্রতিবেদনগুলো নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করেন এবং তদন্তকারী কর্মকর্তাকে সেই মোতাবেক তদন্তের নির্দেশ দেন। পরিদর্শক মোঃ তরিকুল ইসলাম জানান, দখলদাররা শক্তিশালী হয়েও কেন পাঁচ মাসের শিশুটিকে হত্যা করল? এজাহারে বলা হয়েছে, মা রুবিনা বেগমের কোলে থাকা অবস্থায় ইভার গলায় কোপ দিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে। তাহলে মায়ের ঘাড়ে আঘাত লাগেনি কেন? মায়ের সালোয়ার কামিজে রক্ত লেগে থাকার কথা ছিল। কিন্তু আলামতে সেটি নেই কেন? ‘তিনটি বিষয়ে তদন্তে নেমেই সূত্র পেয়ে যাই। এরপর চলতি বছরের অর্থাৎ ১১ জুলাই নিজামের ভাই আবুল মিয়া এবং ১৮ অক্টোবর রাশিদ আলীকে গ্রেফতার করা হয়। আটক দু’জনই আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। মোঃ তরিকুল ইসলাম আরও জানান, জবানবন্দিতে দু’জনই জানিয়েছেন, মায়ের নির্দেশে আবুল মিয়া বটি দিয়ে শিশু ইভার ঘাড়ে আঘাত করে তাকে হত্যা করেন। এরপর পরিকল্পনামত ইভার মা রুবিনা রক্তাক্ত সেই দেহ নিয়ে জমিতে গিয়ে আহাজারির নাটক সাজান। এদিকে আবুল মিয়াকে গ্রেফতারের পরই নিজাম ও তার স্ত্রী রুবিনা গা ঢাকা দিয়েছেন এবং নিজামের বৃদ্ধা মা বীরু বেগম সম্প্রতি মারা গেছেন বলে জানিয়েছেন পিবিআই পরিদর্শক জানান। পাঁচ মাসের মেয়েটিকে ঠান্ডা মাথায় নিজের মা-বাবা, দাদী, চাচা মিলে খুন করাকে ‘মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্যতম অপরাধ হিসেবে’ বর্ণনা করে অভিযোগপত্র তৈরি করছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা।



মন্তব্য করুন