কমলগঞ্জে ৪০ কোটি টাকার পানি প্রকল্পে জনভোগান্তি, বিল বৃদ্ধি ও নিম্নমানের সেবায় ক্ষুব্ধ  পৌরবাসী

May 9, 2026,

কমলগঞ্জ প্রতিনিধি : কমলগঞ্জ পৌরসভায় প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্প এখন নানা অভিযোগ ও জনঅসন্তোষের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হলেও গ্রাহকদের অভিযোগ— বাড়তি খরচ, হঠাৎ বিল বৃদ্ধি এবং নিম্নমানের সেবায় ভোগান্তি বেড়েই চলেছে।

বাংলাদেশের ৩০টি পৌরসভায় বাস্তবায়িত পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্পের আওতায় কমলগঞ্জ পৌরসভায় ৬ লাখ লিটার পানি ধারণক্ষমতা সম্পন্ন উচ্চ জলাধার, একটি পানি শোধনাগার, অফিস ভবন এবং প্রায় ৩৭ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে পৌর এলাকার প্রায় ১ হাজার ৫০০ পরিবারকে পানির সংযোগ দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া প্রকল্পের আওতায় অসহায় ও হতোদরিদ্র পরিবারের জন্য ৭০০টি টয়লেট নির্মাণ, ৩টি উৎপাদনকারী নলকূপ স্থাপন, ৩ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণ এবং ২টি পাবলিক টয়লেট স্থাপন করা হয়েছে। পাবলিক টয়লেটের একটি উপজেলা চৌমুহনায় এবং অপরটি ভানুগাছ রেলওয়ে স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় নির্মাণ করা হয়েছে। প্রকল্প পরিচালনায় ব্যবহার করা হচ্ছে ২টি ভ্যাকুয়াম ট্রাক ও একটি মোটরসাইকেল।

তবে এত বড় প্রকল্প পরিচালনায় আর্থিক সংকটের কথাও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রতি মাসে বিদ্যুৎ বিল বাবদ প্রায় ১ লাখ টাকা, ৯ জন স্টাফের বেতন বাবদ প্রায় দেড় লাখ টাকা এবং লাইন মেরামতে আরও ১ লাখ টাকা ব্যয় হয়। সম্প্রতি একটি সাবমার্সিবল পাম্প পুড়ে যাওয়ায় তা মেরামতে অতিরিক্ত ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।

অন্যদিকে পৌরবাসীর অভিযোগ, আগে পানির সংযোগ সম্পূর্ণ ফ্রি থাকলেও বর্তমানে মিটার বাধ্যতামূলক করে ৫ হাজার টাকা মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি সংযোগ ফি ১২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৮০০ টাকা করা হয়েছে। মালামাল, শ্রমিক ও আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে নতুন সংযোগ নিতে একজন গ্রাহককে প্রায় ১০ হাজার টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। অনেকের অভিযোগ, সংযোগের কাজে আসা কিছু কর্মীকেও অতিরিক্ত পকেট খরচ দিতে হচ্ছে।

এত টাকা ব্যয় করেও অনেক এলাকায় কাক্ষিত সেবা মিলছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। গ্রাহকদের দাবি, সময়মতো পানি সরবরাহ করা হয় না, পানির চাপ কম থাকায় উপরের তলায় পানি ওঠে না এবং অনেক সময় পানিতে অতিরিক্ত আয়রনের উপস্থিতি দেখা যায়। এছাড়া পাইপলাইন স্থাপনে অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। কোথাও কোথাও মাটির গভীরে পাইপ না বসানোয় তা ফেটে গিয়ে রাস্তায় পানি অপচয় হচ্ছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ তৈরি হয়েছে হঠাৎ করে পানির বিল প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি করাকে কেন্দ্র করে। পূর্ব ঘোষণা বা কোনো ধরনের লিখিত নোটিশ ছাড়াই মে মাস থেকে ২০০ টাকার পরিবর্তে ৩০০ টাকা বিল নির্ধারণ করায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো বাড়তি আর্থিক চাপে পড়েছে।

পৌর এলাকার সচেতন মহল বলছে, বিশুদ্ধ পানি মানুষের মৌলিক অধিকার। তাই সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে এই সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তারা সেবার মান উন্নয়ন, অতিরিক্ত সংযোগ ব্যয় কমানো এবং গ্রাহকবান্ধব সিদ্ধান্ত গ্রহণে পৌর কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করেছেন।

এ বিষয়ে প্রকল্পের আবাসিক প্রকৌশলী এম ডি গোলাম কবির খান বলেন, এই প্রকল্প পরিচালনায় প্রতি মাসে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টাকা ব্যয় হয়। অথচ গ্রাহকদের কাছ থেকে আসে মাত্র দেড় লাখ টাকার মতো। ৭০ শতাংশ গ্রাহক নিয়মিত বিল পরিশোধ করলেও ৩০ শতাংশ বিল দেন না। ৩ ঘণ্টা পানি সরবরাহ করা হয়, কিন্তু অনেক গ্রাহক মিটার পর কল বন্ধ না করে কৃষি জমিতে পানি ব্যবহার করেন। কেউ অযথা কল ছেড়ে পানি অপচয় করেন। ফলে পানির চাপ কমে যাওয়ায় উপরের তলায় পানি উঠছে না। পানির অপচয় রোধ করা গেলে উপরের তলাতেও পানি উঠবে। তাই বাধ্য হয়ে পানির বিল বৃদ্ধি করতে হয়েছে।

তিনি আরও জানান, শ্রীমঙ্গল পৌরসভায় পানির ন্যূনতম বিল ৪০০ টাকা এবং মৌলভীবাজারে ৪৫০ টাকা হলেও কমলগঞ্জে বর্তমানে ৩০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: আসাদুজ্জামান বলেন- প্রতি মাসে প্রায় ২ লাখ টাকা ভর্তুকি দিতে হিমশিম খাচ্ছে পৌরসভা। তাই পৌর কর্তৃপক্ষ আলোচনা করে ২০০ টাকার পরিবর্তে ৩০০ টাকা বিল নির্ধারণ করেছে। ১৫ শ’র বেশি পানির সংযোগ থাকলেও প্রায় ৯ শ গ্রাহক নিয়মিত বিল পরিশোধ করেন, বাকিরা বিল দিতে চান না। একটি হাফ লিটার বোতলজাত পানির দাম ২০ টাকা। সেই হিসাবে গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রতিদিন মাত্র ১০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। যেভাবে গ্রাহকরা পানি ব্যবহার করেন, সে তুলনায় বিল আরও বেশি হওয়ার কথা। তবে গ্রাহকদের বিল কমানোর আবেদনের বিষয়টি আলোচনা করে পূর্ণ বিবেচনা করার চেষ্টা করা হবে।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com