মৌলভীবাজারের কোভিড ১৯ সন্দেহভাজন রোগীদের নিয়ে আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সাময়িকী তে মৌলিক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত

সিলেট বিভাগের চা বাগান পাহাড় আর হাওড় অধ্যুষিত জেলা মৌলভীবাজারের ২৫০ শয্যা হাসপাতালের রেডিওলজী এন্ড ইমেজিং বিভাগের চিকিৎসক ডা. মোঃ উবায়দুল ইসলাম, ডা. লায়লা রুবাইয়াত এবং দেশের আরও ৫ মেডিকেল কলেজ ও ইন্সটিটিউট এর ৫ জন সহ মোট ৭ জন রেডিওলজিস্ট এর সমন্বয়ে মৌলভীবাজার জেলার ৫১ জন কোভিড ১৯ সন্দেহভাজন রোগীদের ওপর করা একটি গবেষণা প্রবন্ধ আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সাময়িকী স্কলার্স জার্নাল অব এপ্লাইড মেডিকেল সায়েন্স এর জুলাই ইস্যুতে প্রকাশিত হয়েছে। প্রায় ৩ মাস ধরে চলা এই গবেষণা চালানো হয়েছে মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা হাসপাতাল ও লাইফ লাইন হাসপাতাল ও কার্ডিয়াক সেন্টার, মৌলভীবাজার এ।
৫১ জন কোভিড সন্দেহভাজন রোগী, যাদের লক্ষন আছে এবং যারা একইসাথে আরটি পিসিআর ( RT PCR) এবং বুকের সিটি স্ক্যান পরীক্ষা করিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের অনুমতিতে তাদের নিয়ে এই গবেষণা কাজটি পরিচালিত হয়েছে।
রোগীদের করোনার আরটি পিসিআর (RT PCR) ) পরীক্ষা হয়েছে জেলার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল থেকে স্যাম্পল সংগ্রহ করে, আর সিটি স্ক্যান পরীক্ষা হয়েছে শহরের লাইফ লাইন হাসপাতালে। এই গবেষণা নারী পুরুষ উভয়ের ওপরেই চালানো হয়, যাদের গড় বয়স ছিলো ৪৪ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে। তাদের উপসর্গের সময়সীমা ছিলো সাড়ে তিন থেকে ৫ দিন। যাদের লক্ষন ছিলো জ্বর, কাশি, বুকে ব্যাথা, তাদের প্রায় সবারই সিটি স্ক্যান পরীক্ষায় রোগের উপস্থিতি ছিলো। অন্যদিকে, কারো কারো আরটি পিসিআর এর প্রথম স্যাম্পল নেগেটিভ আসলেও ৩/৪ দিন পরের স্যাম্পল পজিটিভ আসে।
এতে দেখা যায়, এই গবেষণায় সিটি স্ক্যান এর সংবেদনশীলতা ৯৫.৪৫% আর আরটি পিসিআর এর ৮৬.৩৬%।
বিশ্বের অন্যান্য দেশেও গবেষণা প্রবন্ধে আরটি পিসিআর (জঞ চঈজ) এর সংবেদনশীলতা কম ছিলো সিটি স্ক্যান এর তুলনায়।
এ প্রসংগে গবেষণা দলের সদস্য রেডিওলজী বিশেষজ্ঞ ডা. লায়লা রুবাইয়াত বলেন, আগামীতে বিভাগীয় শহর, জেলা এবং উপজেলা পর্যায় থেকেও এ’ধরনের আরও বেশি গবেষণা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে প্রকাশিত হবে, আমরা এই স্বপ্ন দেখি!
গবেষণা দলের আরেক সদস্য সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজের রেডিওলজী বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. সুদীপ্তা গোপ বলেন জেলা শহরের এমন একাডেমিক কাজে যুক্ত হয়ে বুঝতে পারলাম কতো ভালো কাজ হচ্ছে সেখানে। সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ।
গবেষণা দলের প্রধান সমন্বয়ক ও ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের রেডিওলজী বিশেষজ্ঞ ডা. মোঃ উবায়দুল ইসলাম বলেন, মফস্বলে নানা সীমাবদ্ধতার মাঝেও আমাদের এই গবেষণা কাজ আলোর মুখ দেখেছে, এটাই বড় ব্যাপার। রোগীদের তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ আর সিটি স্ক্যান, এসবই ছিলো অত্যন্ত দুরহ কাজ এই মহামারীর সময়ে। আমরা কৃতজ্ঞতা জানাই ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা. পার্থ সারথী দত্ত জেলার সিভিল সার্জন ডা. তউহীদ আহমেদ মৌলভীবাজার বিএমএ সভাপতি ডা. শাব্বির হোসেন খান ও সাধারণ সম্পাদক ডা. শাহজাহান কবীর চৌধুরী সহ জেলার স্বাস্থ্য বিভাগের সকল চিকিৎসক নার্স এবং ২৫০ শয্যা হাসপাতাল ও লাইফ লাইন হাসপাতালের অন্যান্য কর্মকর্তা কর্মচারী ও স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের প্রতি।
একটি জেলা শহরে পরিচালিত এরকম গবেষণা নিয়ে ২৫০ শয্যা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. পার্থ সারথি দত্ত বলেন কোভিড ১৯ নিয়ে বাংলাদেশে জেলা শহরের এটাই প্রথম কাজ যা আন্তর্জাতিক সাময়িকী তে প্রকাশ পেলো। এজন্য তরুন চিকিৎসক ডা. মোঃ উবায়দুল ইসলাম ও ডা. লায়লা রুবাইয়াত সহ গবেষণা দলের সবাইকে অভিনন্দন। এ ধরনের গবেষণা কার্যক্রম কে সকলের উৎসাহ প্রদান করা উচিত।
আমি তরুন চিকিৎসক দলের এই গবেষণা কাজের সাফল্য কামনা করি।
জেলার সিভিল সার্জন ডা. তউহীদ আহমেদ বলেন গবেষণা চিকিৎসা শাস্ত্রের অতিগুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও বাংলাদেশে সম্পদ , অবকাঠামো এবং পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে গবেষণাকর্ম কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছতে পারছে না সেই প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে মৌলভীবাজারের মত একটি ছোট শহরে করোনার মত একটি নতুন রোগের উপরে এই গবেষণাকর্ম অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। এই গবেষণালব্ধ জ্ঞান পরবর্তীতে কারণে রোগীর চিকিৎসার উন্নতি সাধনে বড় ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি। ভবিষ্যতেও তাদের সর্ব রকম গবেষণার কাজে আমার পক্ষে যতটুকু সম্ভব সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
এরকম গবেষণার ব্যাপারে জেলা বিএমএ সাধারণ সম্পাদক ডা. শাহজাহান কবীর চৌধুরী ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন এমন কাজে উৎসাহিত হবে তরুন চিকিৎসকেরা।
এমন কাজে কি উৎসাহিত হবে তরুন চিকিৎসকেরা, এমন প্রশ্নে জেলা বিএমএ সভাপতি ডাঃ শাব্বির হোসেন খান বলেন, অবশ্যই উৎসাহিত হবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। মৌলভীবাজার জেলা থেকে এ’ধরনের গুরুত্ত্বপূর্ণ একটি গবেষনা পরিচালিত করার জন্য গবেষনা দলের প্রধান সমন্বয়ক ডা. মো. উবায়দুল ইসলাম এবং তার সহযোগী সবাইকে অভিনন্দন জানাই আমি। আগামীতে তারা মানবকল্যাণে এ’ধরনের আরো গবেষনায় সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা যাতে পায়, আমি সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের কাছে সেই অনুরোধ করব।
এই গবেষণা প্রবন্ধ নানা ব্যস্ততার মধ্যেও বিশ্লেষণ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিনের অধ্যাপক ও কোভিড ১৯ এর জাতীয় কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ডা. রোবেদ আমিন বলেন, এটা একটা চমৎকার প্রবন্ধ এবং খুব ভালো ভাবে লিখা হয়েছে। তবে তারা সেনসিটিভিটি, স্পেসিফিসিটি নিয়ে আরও দুটি আলাদা টেবিল রাখতে পারতো। দুজন রোগীর প্রাথমিক অবস্থায় আরটি পিসিআর নেগেটিভ হলেও তারা কিভাবে পরে কোভিড গ্রুপে অন্তর্ভুক্ত হলো, তার আরও ব্যাখ্যা হলে ভালো হতো। আমি আশা রাখি, তারা ভবিষ্যতে আরও বড় কলেবরে কাজ করবে।
লাইফ লাইন হাসপাতাল ও কার্ডিয়াক সেন্টার এর পরিচালক, ( প্রশাসন) , মৃন্ময় রায় রতন বলেন, জাতির এই ক্রান্তিকালে এরকম একটা গবেষণার অংশ হতে পেরে আমরা গর্বিত।
ডা. মোঃ উবায়দুল ইসলাম
রেডিওলজী বিশেষজ্ঞ
মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল



মন্তব্য করুন