শ্রীমঙ্গল ডে কেয়ার সেন্টারটি মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা নিজেই কন্ট্রাক্টর

সাইফুল ইসলাম॥ মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উদ্যোগে ডে কেয়ার সেন্টারটি নিম্নবিত্ত কর্মজীবী মায়েদের সন্তান রাখার জন্য। শ্রীমঙ্গলে উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন শ্যামলী আবাসিক এলাকায় ডে-কেয়ারের অবস্থান।
আন্তর্জাতিক মানসম্মত ডে-কেয়ার সেন্টারগুলোতে থাকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিশু প্রতিপালক। কোমলমতি শিশুদের নাওয়া-খাওয়া, শিশুদের সাথে খেলা করা, ঘুম পাড়ানো থেকে শুরু করে শিশু পরিচর্যার জন্য চাই কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য্য এবং দক্ষতা।
তবে আমাদের সরকারি ডে-কেয়ার সেন্টারের জন্য নিত্য নতুন পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ও সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজন নিয়মিত তদারকি। কিন্তু বাস্তবে ভিন্ন।
এককভাবে দুর্নীতি কার্যক্রম: সরেজমিনে রোববার ১৭ সেপ্টেম্বর বিকাল ৩ টা ৫০মিনিটে ডে-কেয়ার সেন্টারে পরিদর্শনে গেলে দেখা যায় ভেতরে কেউ নেই। একজন পাচককে পাওয়া গেল।
জানতে চাই শিশুরা কোথায় তিনি জানালেন ১৫-২০ জন ছিলো। তারা চলে গেছে। তাদের উপস্থিতি তালিকা আছে ?। উপজেলা মহিলা বিষয়ক অফিসের কম্পিউটার অপারেটর বাবুল নামে একজন কাছে।
বাবুলের মুঠোফোনে ফোন দিলে তিনি জানালেন আমি অফিসে আছি,একটু আসেন। তার কথা মতো সেখানে উপস্থিত হই। জানতে চাই ডে কেয়ার সেন্টারটি কে পরিচালনা করে? তিনি জবাবে ম্যাডাম সবকিছু দেখেন।
তিনি কোথায় ? মৌলভীবাজার জেলা অফিসে বসেন। ডে কেয়ার সেন্টারটি দেখে কে? জবাবে আমি দেখি।
রোববার ১৭ সেপ্টেম্বর ডে কেয়ার সেন্টারটি কতজন ছিলো শিশু বাচ্চা, তিনি জানালেন রেজিস্টার্ড খাতা দেখে বলতে পারবো।
তালিকা কোথায় জানতে চাইলে তিনি বলেন ম্যাডামের কাছে। ম্যাডাম আসলো না অফিসে, না এসে খাতা কেমনে গেলে উনার কাছে।
এক পর্যায়ে ডে সেন্টারের ব্যাপারে তিনি কোনো তথ্য দিতে পারবেন না। তার অফিস টাইম শেষ । এখন বেরিয়ে যাবো, আগামীকাল আসবেন।
পরদিন সোমবার ১৮ সেপ্টেম্বর দুপুর ২টার দিকে ডে কেয়ার সেন্টারে পরিদর্শনে গেলে ৭ জন শিশু পাওয়া যায়।
তবে তাদের রেজিষ্টার্ড খাতায় ২৩জন নামে একটি তালিকা রয়েছে। একই ভাবে প্রতিদিনও ২৩জন শিশুর তালিকা প্রস্তুত করা হয়।
কিন্তু ডে কেয়ার সেন্টারে প্রতিদিন ৭-৯জন শিশু উপস্থিতি থাকে। কোনো কোনো দিন ৫০জন শিশুর উপস্থিতি দেখানো হয়েছে কাগজে কলমে।
সোমবার সকালে শিশুদের সকালের নাস্তা হিসাবে সুজি এবং দুধ বরাদ্ধ থাকলে সেখানে শুধু সুজি পরিবেশন করা হয়।
দুপুরে ডিম-ডাল সবজি ও আলু বরাদ্ধ ছিলো সেখানে শুধু ডিম সবজি দেওয়া হয়। বিকালে ফল বরাদ্ধ থাকলেও সেটা দেওয়া হয় না।
এদিকে খবর পেয়ে ২টা ১৫মিনিটে ফোন পেয়ে তাড়াহুড়া করে ছুটে আসলেন মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের কম্পিউটার অপারেটর বাবুল মিয়া।
উত্তেজিত ভাব,ক্ষেপে উঠে বললো, আমাদের সরকারী নীতিমালায় আছে অফিসের কতৃপর্ক্ষ ছাড়া কেউ রেজিষ্টার্ড দেখতে পারবে না।
এমনকি ইউএনও, ডিসি বললেও আপনাকে রেজিষ্টার খাতা দেখাতে পারবো না। সর্বশেষ গতকাল সোমবার সকালে গিয়ে একই চিত্র পাওয়া গেছে।
গত কয়েকদিনের এক অনুসন্ধানে ডে কেয়ার সেন্টারের জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা সাহিদা আকতার’র নানা অনিয়মের চিত্র ফুটে উঠে।
সেখানে তালিকায় শিশুর ছবি ও পিতা-মাতার নাম ঠিকানা থাকে, সেখানে কিছু পাওয়া যায়নি। নিজের মতো করে ইচ্ছামাফিক ডে কেয়ার সেন্টারটি পরিচালনা করছে যেন দেখার কেউ নেই। মাসে লাখ লাখ টাকা লুটে পুটে খাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
খাবারের মেন্যুতে যা আছে- রোববার সকালে দুধ ও পাউরুটি,দুপুরে খাবার মুরগির মাংস,ভাত,আলু,শাক এবং লেবু, বিকালে ওয়েফার/কলা/অন্য যেকোন ফল কর্তৃপক্ষের পছন্দ অনুযায়ী।
সোমবার সকালে দুধ ও সুজি, দুপুরে খাবার ভাত,ডাল,আলু,ডিম ও লেবু, বিকালে বিস্কুট ও আপেল। মঙ্গলবার সকালে দুধ সেমাই,দুপুরে খাবার ভাত,ডাল,সবজি ও মাছ, বিকালে কমলা/কেক।
বুধবার সকালে দুধ পাউরুটি,দুপুরে ভাত, ডাল, আলু, শাক ও মুরগির মাংস, লেবু, বিকালে ওয়েফার। বৃহস্পতিবার সকালে দুধ ও সুজি, দুপুরে সবজি খিচুড়ি ও ডিম,লেবু, বিকালে জুস ও কলা।
ডে-কেয়ার সেন্টারে বর্তমানে ৭-৯টি শিশুর জন্য ডে-কেয়ার দু’জন নারী ও একজন পুরুষ দায়িত্ব পালন করছেন। এভাবে চলছে বছরের পর বছর।
খাবার মেন্যুতে ডে-কেয়ার সেন্টারের শিশুপ্রতি বরাদ্দ খাবার আদৌ এসব খাবার শিশুদের দেওয়া হচ্ছে কিনা এ ব্যাপারে কাউকে তদারকি করতে দেখা যাচ্ছেনা।
এছাড়াও এই ডে-কেয়ার সেন্টারটি প্রতি সরকারি কার্যদিবসে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত খোলা থাকে।
তবে নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা গেছে, নির্ধারিত সময়ের আগেই এই ডে-কেয়ার সেন্টারটি বন্ধ হয়ে যায়।
ফলে অভিভাবকদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। যেখানে একটি শিশুকে সারাদিন দেখভাল করতে একজন গৃহিনী মাকে হিমশিম খেতে হয়।
এদিকে অনুসন্ধানে জানা গেলো, রোববার ৫ জন শিশু ছিল আর রেজিষ্টার খাতায় ২৩ জনের তালিকা রয়েছে।
সোমবার ৭ জন শিশুর উপস্থিতি রয়েছে, সেখানে ২৩ জন। বাস্তবে যদি শিশু উপস্থিতি থাকে ৫ জন, কাগজে কলমে রেজিষ্ট্রার্ড খাতায় ২৩ জন শিশুরের তালিকা রয়েছে।
এভাবে চলছে হরিলুট। সারা বাংলাদেশে ৪৪টি জেলা শহরে ডে-কেয়ার সেন্টার চালু রয়েছে। তার মধ্যে মৌলভীবাজার জেলার চায়ের অধ্যুষিত শ্রীমঙ্গলে একটি।
মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর উদ্যোগে শ্রমজীবী মায়ের সন্তানদের দিবাকালীন সেবা প্রদানের জন্য ৬মাস থেকে ৬ বছর শিশুদের এই সেন্টারে রাখা হয়।
ব্যক্তিমালিকানাধীন তিনতলা বিশিষ্ট একটি ভবনের নিচতলায় শ্রীমঙ্গল ডে কেয়ার সেন্টার দীর্ঘ ২১বছর ধরে পরিচালিত হয়ে আসছে। এই ভবনে ৬টি রুম রয়েছে। তার মধ্যে ১টি রুমে প্রধান কর্মকর্তার অফিস।
একটি রান্না ঘর, ২টি বিছনাসহ আসবাবপত্র, বাকি ২টি রুমে খেলাধূলার রুম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। মূলত একটি রুমে ৭/৯জন শিশু থাকতে হচ্ছে।
কতৃপর্ক্ষ বলছে ৮০ জন শিশু রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। একজন শিশুর ভর্তি ফ্রি নেওয়া হয় ১০০টাকা। মাসিক হারে আরো ১০০ টাকা দিতে হয়। বাচ্চাদের সকালের নাস্তা সেমাই রুটি, দুধ, ডিম দেওয়ার রুটিন থাকলেও বাস্তবে তা দেয়া হয় না।
প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা, প্রাক স্কুল শিক্ষাসহ কোনটাই হচ্ছে না। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে শিশুরা খেলাধুলা করছে। বিছনাসহ আসবাবপত্র ময়লার ভর্তি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মজীবী মা জানিয়েছেন, ‘তিনি মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের ডে-কেয়ার সেন্টারে দীর্ঘদিন ধরে তার সন্তানকে রাখছেন। সরকারি সেন্টার তাই এখানে সন্তান রেখে তিনি নিরাপদ বোধ করেন।
সারাদিন তাকে কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। তার সন্তানকে সুষম ও পর্যাপ্ত খাবার দেওয়া হচ্ছে কিনা এ ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত নন।
দেখা গেছে, ডে-কেয়ার সেন্টারে শিশুদের লেখাপড়া করানোর জন্য কোনো শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ফলে চার থেকে ছয় বছর বয়সী শিশুরা প্রাথমিক অক্ষর জ্ঞানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
অভিভাবকরা ডে-কেয়ার সেন্টারগুলোতে মাসে অন্তত একদিন শিশু বিশেষজ্ঞ দিয়ে শিশুদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার দাবি জানিয়েছে।
তবে এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যাচ্ছেনা। এছাড়াও ডে-কেয়ার সেন্টারগুলোতে শিশুদের খাবারের গুণগত মান শিশু খাদ্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষিত কাউকে যাচাই করতে দেখা যাচ্ছেনা।
ডে-কেয়ার সেন্টারটি ফ্ল্যাট বাড়ীতে ঘিঞ্জি পরিবেশে গড়ে ওঠায় শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত খোলা মেলা জায়গা ও চিত্ত বিনোদনেরও কোনো ব্যবস্থা নেই।
এ বিষয়ে জানতে মৌলভীবাজার জেলা মহিলা ও শিশু বিষয়ক উপ-পরিচালক ও অতিরিক্ত দায়িত্বে নিয়োজিত সাহিদা আকতার বলেন, নিজেই সাপ্লাই দেই খাবার।
লোকবল সংকট। একাই পুরো জেলা দেখতে হয়। ২০১৫ সালে এই জেলায় যোগদান করেছিলাম। এখনো দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, ডে কেয়ার অফিসার না থাকায় ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ সাল থেকে নিজেই সবকিছু দেখতে হচ্ছে। গত ২৬ জুলাই ২৩ইং তারিখে একটি দৈনিক পত্রিকায় টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি পত্রিকায় দিয়েছিলাম। কিন্তু কেউ টেন্ডারে অংশগ্রহন করেননি।
পরে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে নিজেই বাজার থেকে খাদ্যদ্রব্য কিনে সাপ্লাই দিয়ে থাকি।
নিজেই মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা আবার নিজেই কন্ট্রাক্টর এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি বাজার করিনা বাবুল নামে ছেলেটি বাজার থেকে কিনে দ্রব্যমূল্য প্রতিদিন দিয়ে থাকে ডে কেয়ার সেন্টারে।
মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক (ডিসি) ড. উর্মি বিনতে সালাম বলেন, ডে কেয়ার সেন্টার চলমান আছে এতটুকু জানি।
যে সব অনিয়মের অভিযোগ শুনলাম সে বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে আজই খোঁজ নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।



মন্তব্য করুন