ঈদুল ফিতরে উৎসব বোনাস ও সরকার ঘোষিত নিম্নতম মজুরি বাস্তবায়নের দাবিতে হোটেল শ্রমিক ইউনিয়নের স্মারকলিপি

স্টাফ রিপোর্টার : আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সকল হোটেল-রেস্টুরেন্ট শ্রমিকদের মাসিক বেতনের সমপরিমান উৎসব বোনাস প্রদান, সরকার ঘোষিত নিম্নতম মজুরি এবং ৮ ঘন্টা কর্মদিবস, নিয়োগপত্র-পরিচয়ত্র প্রদানসহ শ্রমআইনের সুযোগ-সুবিধা বাস্তবায়নের দাবিতে মৌলভীবাজার জেলা হোটেল শ্রমিক ইউনিয়নের পক্ষ থেকে মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।
৮ মার্চ দুপুরে হোটেল শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো: শাহিন মিয়া স্বাক্ষরিত স্মারকলিপিটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে প্রদান করা হয়। স্মারকলিপির অনুলিপি শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব, সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার, শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, কলকারখানা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক, শ্রীমঙ্গলস্থ শ্রমদপ্তরের উপপরিচালক ও উপমহাপরিদর্শক, মৌলভীবাজার চেম্বারের সভাপতি, হোটেল রেস্তোরাঁ মালিক সমিতিসহ বিভিন্ন দপ্তরে প্রেরণ করা হয়।
স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয় মুসলমান সম্প্রদায়ের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতর আসন্ন। এই ধর্মীয় উৎসব মুসলিম সম্প্রদায়ের জনগণের কাছে আনন্দের বার্তা নিয়ে আসলেও হোটেল-রেস্টুরেন্ট-সুইটমিট শ্রমিকদের সব সময় এই আনন্দ থেকে বঞ্চিত করা হয়। কারণ ঈদুল ফিতর উপলক্ষে হোটেল-রেস্টুরেন্ট-সুইটমিট শ্রমিকরা ন্যায্য উৎসব বোনাস পান না। এমন কি অধিকাংশ হোটেল-রেস্টুরেন্ট-সুইটমিট শ্রমিকদের ঈদ উপলক্ষে ছুটি দেওয়া হলেও ছুটিকালীন সময়ের মজুরিও দেওয়া হয় না। অথচ শ্রমিকদের হাড়ভাঙ্গা খাটুনিতে সৃষ্ঠ মুনাফায় মালিকপক্ষ মহাধুমধামে ঈদ উৎসব উদযাপন করেন। বাংলাদেশ শ্রমআইন অনুযায়ী সকল শ্রমিককে উৎসব বোনান প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ ও মানবাধিকারের দিক থেকেও শ্রমিকদের উৎসব বোনাস থেকে বঞ্চিত করা অমানবিক। হোটেল-রেস্টুরেন্ট-সুইটমিট শ্রমিকরা যে মজুরি পান তা দিয়ে বর্তমান ঊর্দ্ধগতির বাজারদরে পরিবার-পরিজন নিয়ে একজন শ্রমিক ১০ দিনও চলা যায় না। চাল, ডাল, তেল, চিনি, শাক-সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন উর্দ্ধগতির পাশাপাশি বাড়িভাড়া, গাড়িভাড়া বৃদ্ধির কারণে জনজীবন দিশেহারা।
এমতবস্থায় ৫ মে ২০২৫ হোটেল-রেস্টুরেন্ট শিল্প সেক্টরে সরকারের নিম্নতম মজুরি হার ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করেন। এই নিম্নতম মজুরি বর্তমান বাজারদর এবং ৬ সদস্যদের একটি পরিবারের ভরণপোষণের প্রেক্ষিতে শ্রমিকদের দাবি থেকে অনেক কম। কিন্তু তারপরও সরকার ঘোষিত নিম্নতম মজুরি সর্বস্তরে কার্যকর করা হয়নি। তদোপুরি হোটেল-রেস্টুরেন্ট-সুইটমিট শ্রমিকদের শ্রমআইনের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত করা হয়। হোটেল-রেস্টুরেন্ট-সুইটমিট শ্রমিকদের চাকুরির নিশ্চয়তা ও জীবনের নিরাপত্তা নেই।
বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬ এর ৫ ধারায় নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র, ৬ ধারায় সার্ভিস বই, ২(১০) ধারায় চাকুরীচ্যূতি জনিত ৪ মাসের নোটিশ পে, প্রতিবছর চাকুরীর জন্য ১ মাসের গ্রাচ্যুয়েটি, ১০৩ ধারায় সপ্তাহে দেড়দিন সাপ্তাহিক ছুটি, ১০৮ ধারায় দৈনিক ৮ ঘন্টা সপ্তাহে ৪৮ ঘন্টা কাজ, অতিরিক্ত কাজের জন্য দ্বিগুণ মজুরি প্রদান, ১১৫ ধারায় বছরে ১০ দিন নৈমিত্তিক ছুটি, ১১৬ ধারায় ১৪ দিন অসুস্থাতার ছুটি, ১১৭ ধারায় প্রতি ১৮ দিন কাজের জন্য ১ দিন অর্জিত ছুটি, ১১৮ ধারায় ১৩ দিন উৎসব ছুটি প্রদানের আইন থাকলেও শ্রমিকদেরকে এই সকল আইনগত অধিকার হতে বঞ্চিত করা হচ্ছে। অথচ হোটেল মালিকপক্ষ সরকারী আইনের তোয়াক্কা না করলেও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এব্যাপারে নির্বিকার।
এমনাবস্থায় গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধরী ও শ্রমপ্রতিমন্ত্রী মোঃ নুরুল হক এর উপস্থিতি শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে উচ্চ পর্যায়ে বৈঠকে হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতে নিম্নতম মজুরি বাস্তবায়নের জন্য ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া। কিন্ত সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিদেশনা দেওয়া পরও মৌলভীবাজার জেলায় হোটেল রেস্তোরাঁ খাতে নিম্নতম মজুরি ও শ্রমআইন বাস্তবায়নের তৎপরতা দৃশ্যমান নয়। শ্রম আইনে স্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ ও বাসস্থানের বিধান থাকলেও শ্রমিকদের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ করতে ও থাকতে বাধ্য করা হয়।
শ্রমিকরা দৈনিক ১০/১২ ঘন্টা অমানবিক পরিশ্রম করে অর্ধাহারে-অনাহারে পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়। যার কারণে হোটেল-রেস্টুরেন্ট-সুইটমিট শ্রমিকদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। স্মারকলিপিতে আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে উৎসব বোনাস ও মজুরিসহ ছুটি প্রদান, সরকার ঘোষিত নিম্নতম মজুরি বাস্তবায়ন এবং হোটেল সেক্টরে ৮ ঘন্টা কর্মদিবস, নিয়োগপত্র, পরিচয়পত্র প্রদানসহ শ্রমআইন বাস্তবায়ন করার প্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার দাবি জানানো হয়।



মন্তব্য করুন