মৌলভীবাজারে টানা বিদ্যুৎ সংকটে চা শিল্পে বিপর্যয় দেড় কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা

কমলগঞ্জ প্রতিনিধি : দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সবুজ পাহাড়, বিস্তীর্ণ চা বাগান আর মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা মৌলভীবাজার জেলা ‘চায়ের রাজধানী’ হিসেবে সুপরিচিত। দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এই জেলার চা শিল্প বর্তমানে ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়েছে। টানা পাঁচ দিন ধরে বিদ্যুৎ না থাকায় সরকারি ও বেসরকারি চা বাগানগুলোর উৎপাদন কার্যক্রম প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এতে প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জেলার ৯২টি চা বাগানের মধ্যে ৫টি সরকারি চা বাগান রয়েছে। এসব বাগানে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ কাঁচা চা পাতা সংগ্রহ করে কারখানায় প্রক্রিয়াজাত করা হয়। কিন্তু বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বর্তমানে সরকারি পাঁচটি চা বাগানেই পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে উৎপাদন। একই অবস্থা ব্যক্তিমালিকানাধীন বাগানগুলোতেও।
সড়জমিনে বিভিন্ন চা উৎপাদন কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, প্রায় আড়াই লাখ কেজি কাঁচা চা পাতা মজুদ রয়েছে। এসব পাতা থেকে প্রায় ৬০ হাজার কেজি চা উৎপাদনের কথা ছিল। কিন্তু সময়মতো প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব না হওয়ায় পাতাগুলো মাচায় পড়ে থেকে পচে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
চা শিল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, এই পরিস্থিতিতে শুধু বাগান কর্তৃপক্ষই নয়, ক্ষতির মুখে পড়ছে সরকারও। উৎপাদন বন্ধ থাকায় কমছে রাজস্ব আয় এবং ব্যাহত হচ্ছে দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানিমুখী শিল্পের স্বাভাবিক কার্যক্রম।
বিদ্যুৎ সংকটের কারণে গত পাঁচ দিন ধরে কাজ করতে পারছেনা হাজার হাজার চা শ্রমিক। দৈনিক মজুরির ওপর নির্ভরশীল এসব শ্রমিক পরিবারে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। শ্রমিকরা জানান, প্রতিদিন কাজ করেই তাদের সংসার চলে। কয়েকদিন কাজ বন্ধ থাকায় আয়-রোজগার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
একজন শ্রমিক বলেন, “আমরা দিন আনি দিন খাই। পাঁচ দিন ধরে কাজ নাই, ঘরে খাবার নেই। খুব কষ্টে দিন কাটছে।”
ন্যাশনাল টি কোম্পানির মাধবপুর চা বাগানের ব্যবস্থাপক দিপন কুমার সিংহ বলেন, “সরকারি ৫টি চা বাগানে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে উৎপাদন। বাগানগুলোতে প্রায় আড়াই লাখ কেজি কাঁচা চা পাতা মজুদ রয়েছে। এগুলো থেকে প্রায় ৬০ হাজার কেজি চা উৎপাদনের কথা ছিল। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় পাতাগুলো নষ্ট হচ্ছে। এতে প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, “শুধু সরকারি বাগান নয়, ব্যক্তিমালিকানাধীন বাগানগুলোর অবস্থাও একই। কারখানার চাকা থেমে গেছে, উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ।”
ন্যাশনাল টি কোম্পানির পাত্রখোলা চা বাগানের ব্যবস্থাপক মো. ইউসুফ খাঁন বলেন, “এপ্রিল মাসের শুরু থেকেই প্রতিদিন ৫ থেকে ৭ ঘণ্টা লোডশেডিং হয়েছে। তবে ২৬ এপ্রিল থেকে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। বর্তমানে দিনে মাত্র ১ থেকে ২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে।
তিনি জানান, প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার কেজি কাঁচা চা পাতা মাচায় পড়ে আছে, যা দ্রুত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা।
কমলগঞ্জ পল্লী বিদ্যুতের মাধবপুর ইউনিটের ইনচার্জ মো. রহমতউল্লা বলেন, “ঘন ঘন ঝড়-তুফানের কারণে বিদ্যুৎ লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “পুরো উপজেলায় বিদ্যুৎ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। ধীরে ধীরে সব এলাকায় সংযোগ পুনরায় চালু করা হবে। দ্রুত সমস্যা সমাধানে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ কাজ করছে।”
চা শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে শুধু উৎপাদন নয়, দীর্ঘমেয়াদে দেশের অন্যতম প্রধান এই শিল্প বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। একই সঙ্গে হাজারো শ্রমিক পরিবার আরও গভীর সংকটে নিমজ্জিত হবে।



মন্তব্য করুন