মৌলভীবাজার চা-শ্রমিক সংঘের শ্রম মন্ত্রী ও স্বাস্থ্য মন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি

স্টাফ রিপোর্টার : দীর্ঘ ৫২ থেকে ডানকান ব্রাদার্সের পরিচালনাধীন ১৬ টি চা-বাগানের লক্ষাধিক চা-জনগোষ্টির চিকিৎসা সুবিধা বঞ্চিত করে ক্যামেলিয়া হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা বন্ধ থাকায় চা-শ্রমিক সংঘ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির পক্ষ থেকে শ্রম মন্ত্রী ও স্বাস্থ্য মন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করে দ্রুত হাসপাতাল চালু করারসহ ৪ দফা দাবি জানানো হয়।
১৭ মে বরিবার দুপুরে বিভিন্ন বাগানে শতাধিক শ্রমিকরা মৌলভীবাজারে এসে বিক্ষোভ মিছিল করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে স্মারকলিপি প্রদান করেন। এসময় চা-শ্রমিকদের প্রতিনিধি চা-শ্রমিক সংঘ সহ-সভাপতি মধু রজক, সাধারণ সাধারণ হরিনারায়ন হাজরা, সাংগঠনিক সম্পাদক লক্ষèীমনি বাক্তি, চা-শ্রমিকনেতা সবুজ বাউরীসহ নেতৃবৃন্দ জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেলের নিকট স্মারকলিপি তুলে দেন। জেলা প্রশাসক স্মারকলিপিটি গ্রহণ করে যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট স্মারকলিপি প্রেরণসহ হাসপাতাল চালুর প্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস প্রদান করেন।
স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয় চা-শ্রমিকরা অত্যন্ত নিম্ন মজুরিতে (দৈনিক সর্বোচ্চ ১৮৭.৪৩ টাকা) শিক্ষা, চিকিৎসা তথা মৌলিক অধিকারের সুযোগ-সুবিধা থেকে কার্যত বঞ্চিত থেকে জীবন সংগ্রামে লিপ্ত রয়েছেন। দেশের চা-উৎপাদনকারী শীর্ষ কোম্পানি ডানকান ব্রাদাসের পরিচালনাধীন মৌলভীবাজার জেলার ১২ টি ও হবিগঞ্জ জেলার ৪ টিসহ মোট ১৬ টি চা-বাগানের (মৌলভীবাজার জেলার আলীনগর, শমসেরনগর, চাতলাপুর, মাইজদি, লংলা, হিংগাজিয়া, পাল্লাকান্দি, শিলুয়া, রাজকী, কমিরপুর, ইটা, চাকলাপুঞ্জি এবং হবিগঞ্জের আমু, নলুয়া, চাঁনপুর, লস্করপুর চা-বাগান) শ্রমিক-কর্মচারী ও তার পরিবারের প্রায় লক্ষাধিক জনগণের জন্য ১৯৯৪ সালের ২৬ মার্চ কমলগঞ্জ উপজেলার শমসেরনগর চা-বাগানে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন হাসপাতাল উদ্ধোধন করা হয়। হাসপাতালটির ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে হাসপাতালটিতে মেডিসিন, অর্থোপেডিক্স, রেডিওলোজি, প্রসূতিবিদ্যা ইত্যাদি চিকিৎসা সেবা প্রদানের পাশাপাশি রোগ নির্ণয়ের জন্য প্যাথলজি ও অপারেশন থিয়েটার রয়েছে। এছাড়াও উল্লেখ করা হয়েছে চা-বাগান এলাকায় ক্যান্সারের প্রকোপ অনেক বেশি এবং এখন পর্যন্ত হাসপাতালটিতে ৬০৩ জন ক্যান্সার রোগী শনাক্ত করেছে, যার মধ্যে ৩৪০ জনকে চিকিৎসা প্রদান করা হয়েছে।
ক্যামেলিয়া হাসপাতালে ১৬ টি বাগানের লক্ষাধিক চা জনগোষ্টির চিকিৎসার জন্য যে ন্যূনতম সুযোগ ছিল তাও গত ৫২ দিন যাবত বন্ধ রয়েছে। গত ২৭ মার্চ ২০২৬ তারিখে একজন চা-শ্রমিক সন্তানের অনাকাঙ্খিতভাবে মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঐদিন থেকে ‘ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন হাসপাতাল’-এর চিকিৎসা সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়। গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন সূত্রে জানা যায় ২৬ মার্চ রাতে শমসেরনগর চা-বাগানের বাবুল বরিদাসের ৭ম শ্রেণিতে পড়য়া ১৩ বছরের স্কুল ছাত্রী কিশোরী ঐশী রবিদাস মাথা ব্যাথ্যা নিয়ে ক্যামেলিয়া হাসপাতালে ভর্ত্তি হয়। পরদিন সকালে ঐশী রবিদাসের মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় বিক্ষুদ্ধ শ্রমিকরা হাসপাতালের ডাক্তারসহ স্টাফদের অবরুদ্ধ করে রাখে। পরবর্তীতে প্রশাসনের সহযোগিতায় তাদের উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তার অজুহাতে চা-শ্রমিকদের জিম্মি করে চিকিৎসা সেবা বন্ধ করে দেন। গত ৫২ দিনে চিকিৎসার অভাবে অন্তত ১০ জন চা-শ্রমিকের মৃত্যুর সংবাদও পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে । বাংলাদেশে বড় বড় হাসপাতালে রোগীদের সাথে চিকিৎসকদের অনভিপ্রেত ঘটনা প্রায়শঃই সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ হয়, আবার সেটা অল্প সময়ের মধ্যে সমাধানও হয়। কিন্ত শ্রমিকদের চিকিৎসা সেবাকে জিম্মি করে এভাবে হাসপাতাল বন্ধ রাখার ঘটনা নজিরবিহীন। দৈনিক মাত্র ১৮৭.৪৩ টাকা মজুরিতে চা-শ্রমিকদের ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’ অবস্থা, তার উপর ন্যূনতম যে চিকিৎসা ক্যামেলিয়া হাসপাতালে পাওয়া যেত তাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এমনিতেই চা-জনগোষ্টির মধ্যে অপুষ্টি ও রোগাক্রান্ত হওয়ার হার অনেক বেশি। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের যৌথ পরিচালনায় জরিপে চা-শ্রমিকদের করুণ স্বাস্থ্যগত অবস্থার চিত্র ফুটে উঠে। জরিপের উঠে আসে চা-বাগানের ৭৪ শতাংশ পরিবার দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করে; অপুষ্টির কারণে ৪৫ শতাংশ শিশু খর্বকায়, ২৭ শতাংশ শিশু শীর্ণকায়, ৪৭.৫ শতাংশ শিশু কম ওজনের, ১৮ বছরের নিচে কিশোরী বিয়ে হার ৪৬ শতাংশ, মা হওয়ার হার ২২ শতাংশ; ন্যূনতম স্যানিটেশন সুবিধার বাইরে ৬৭ শতাংশ শ্রমিক পরিবার। চরম দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত মৌলিক অধিকার বঞ্চিত চা-শ্রমিকদের চিকিৎসা সুবিধা বঞ্চিত রাখা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। এর আগেও গত ১৩ এপ্রিল চা-শ্রমিক সংঘের পক্ষ থেকে মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক ও সিভিল সার্জন এবং কমলগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করে ক্যামেলিয়া হাসপাতাল চালুর দাবি জানানো হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য অদ্যাবধি হাসপাতাল চালুর ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। তাই শ্রম মন্ত্রী ও স্বাস্থ্য মন্ত্রী হস্তক্ষেপের মাধ্যমে হাসপাতালটি চালুসহ চা-শ্রমিক সংঘের পক্ষ থেকে ৪ দফা দাবি বাস্তবায়নের জোর দাবি জানানো হয়। দাবি গুলো হলো অনতিবিলম্বে শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার জন্য ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন হাসপাতাল চালু করা; পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও স্টাফ নিয়োগসহ ক্যামেলিয়া হাসপাতাল আধুনিকায়ন করে পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও ঔষুধপত্র, যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে অস্ত্রোপচারের সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ; শ্রমিক সন্তান ঐশী রবিদাসের মৃত্যুর প্রেক্ষিতে যথাযথ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ঐশী রবিদাসের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপুরণ প্রদান; হাসপাতালের চিকিৎসক, কর্মকর্তা, নার্স ও স্টাফ এবং রোগীসহ সকলের যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনে হাসপাতালে আনসার নিয়োগ প্রদান করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
স্মারকলিপি প্রদানের পূর্বে মৌলভীবাজার চৌমুহনা চত্ত্বরে অনুষ্টিত শ্রমিক সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন চা-শ্রমিক সংঘ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সহ-সভাপতি মধু রজক। সংগঠনের জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক হরিনারায়ন হাজরার পরিচালনায় অনুষ্টিত সভায় বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক রজত বিশ্বাস, চা-শ্রমিক সংঘ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক লক্ষèীমনি ব্যাক্তি, সহ-সাধারণ সম্পাদক সুভাষ গৌড়, দপ্তর সম্পাদক রামনারায়ন গৌড়, প্রচার সম্পাদক কাজল হাজরা, শত্রুঘ্ন লোহার, নারী চা-শ্রমিকনেত্রী নমিতা বর্মা, গীতা গোয়ালা, শেফালী র্যালী প্রমূখ।



মন্তব্য করুন