অন্যের সফলতা কেন সহ্য হয় না?  মনস্তাত্ত্বিক ও ইসলামি পর্যালোচনা

June 23, 2026,

বশির আহমদ : মানুষ সামাজিক জীব। একে অপরের সঙ্গে বসবাস, সহযোগিতা ও সৌহার্দ্যের মাধ্যমে সমাজ গড়ে ওঠে। স্বাভাবিকভাবে একজন মানুষের সফলতায় অন্যদের আনন্দিত হওয়ার কথা। তাকে অভিনন্দন জানানো, উৎসাহ দেওয়া এবং আরও এগিয়ে যেতে সহায়তা করাই মানবিক ও ইসলামি মূল্যবোধের দাবি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অন্যের সফলতা, অগ্রগতি বা কোনো মহৎ উদ্যোগের বাস্তবায়ন সহজভাবে গ্রহণ করতে পারে না। এর পেছনে রয়েছে কিছু মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক ও নৈতিক কারণ।

মনস্তাত্ত্বিক কারণ

১. সামাজিক তুলনাঃ মানুষ স্বভাবতই নিজের অবস্থান অন্যের সঙ্গে তুলনা করে। যখন কেউ দেখে তার পরিচিত কোনো ব্যক্তি বেশি সফল হয়েছে, তখন নিজের সীমাবদ্ধতা বা ব্যর্থতার কথা মনে পড়ে। এই তুলনা অনেক সময় হীনমন্যতা ও অস্বস্তির জন্ম দেয়।

২. ঈর্ষা হিংসাঃ মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, অন্যের প্রাপ্তিকে নিজের ক্ষতি মনে করার প্রবণতা থেকেই ঈর্ষার জন্ম হয়। ফলে কেউ কেউ চায় না অন্য ব্যক্তি সম্মান, জনপ্রিয়তা বা সফলতা অর্জন করুক।

৩. আত্মমর্যাদার সংকটঃ যাদের আত্মবিশ্বাস কম, তারা প্রায়ই অন্যের সাফল্যকে নিজের মর্যাদার জন্য হুমকি মনে করে। ফলে তারা সমালোচনা, বিরূপ মন্তব্য বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার চেষ্টা করে।

৪. পরিবর্তনের ভয়ঃ কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন অনেক সময় সমাজে নতুন বাস্তবতা তৈরি করে। যারা পুরোনো অবস্থান বা প্রভাব হারানোর আশঙ্কা করে, তারা সেই সফলতাকে সহজে মেনে নিতে পারে না।

৫. স্বীকৃতি পাওয়ার আকাক্ষাঃ অনেকেই চান প্রশংসা ও কৃতিত্ব শুধু তারাই লাভ করুক। অন্য কেউ বেশি প্রশংসিত হলে তাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়।

সামাজিক কারণ

সমাজে দলাদলি, প্রতিযোগিতা, ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা এবং সংকীর্ণ মানসিকতা অনেক সময় অন্যের সফলতাকে মেনে নেওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করে। বিশেষ করে যেখানে সহযোগিতার চেয়ে প্রতিযোগিতা বেশি, সেখানে ঈর্ষা ও বিরোধের প্রবণতাও বৃদ্ধি পায়।

ইসলামি দৃষ্টিকোণ

ইসলাম মানুষকে হিংসা-বিদ্বেষ থেকে দূরে থাকার শিক্ষা দিয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা হিংসুকের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনার নির্দেশ দিয়েছেন। ইসলাম অন্যের কল্যাণে আনন্দিত হতে এবং তার জন্য দোয়া করতে উৎসাহিত করে।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে, তার ভাইয়ের জন্যও তা পছন্দ করে।”

অতএব, একজন মুসলমানের দায়িত্ব হলো অন্যের সফলতায় আনন্দিত হওয়া, অভিনন্দন জানানো এবং তার জন্য কল্যাণের দোয়া করা।

আমাদের করণীয়

নিজের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করা। অন্যের সফলতাকে অনুপ্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করা। কৃতজ্ঞতা ও সন্তুষ্টির মানসিকতা গড়ে তোলা। হিংসা নয়, সহযোগিতার সংস্কৃতি তৈরি করা। অন্যের অর্জনের প্রশংসা করতে শেখা। আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকা।

উপসংহার

অন্যের সফলতা সহ্য করতে না পারা মূলত মানুষের দুর্বল মানসিকতা, আত্মবিশ্বাসের অভাব, ঈর্ষা এবং সংকীর্ণ চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। অথচ মানবিকতা ও ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয়,অন্যের কল্যাণে আনন্দিত হতে, তার সফলতায় অভিনন্দন জানাতে এবং আরও এগিয়ে যেতে সহযোগিতা করতে। যে ব্যক্তি অন্যের সফলতায় খুশি হতে পারে, তার হৃদয় হিংসা থেকে মুক্ত থাকে এবং সমাজে সৌহার্দ্য, ভালোবাসা ও সহযোগিতার পরিবেশ গড়ে ওঠে।

লেখক : অধ্যক্ষ, উলুয়াইল ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, মৌলভীবাজার সদর।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com