জুড়ীর ফুলতলা বশিরউল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয়ের অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত শুরু

আব্দুর রব : জুড়ীর ফুলতলা বশির উল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এবং সাবেক সভাপতির বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত শুরু করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সদস্য মো. কুদ্দুছ মিয়ার প্রায় ৬ মাস আগে পাঠানো লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক তদন্ত কমিটি গঠন করেন।
উক্ত তদন্ত কমিটির প্রধান মাউসি’র সহকারি পরিচালক-৫ (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মো: খায়শেদ আলম বুধবার ১২ আগস্ট সরেজমিনে ফুলতলা বশিরউল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয়ে যান। অভিযোগের তদন্তের অংশ হিসেবে তিনি অভিযোগকারি ও অভিযুক্তদের জবানবন্দি শ্রবণ ও প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট সংগ্রহ করেন। এসময় মৌলভীবাজার জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার ফজলুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবরে ফুলতলা বশিরউল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সদস্য মো. কুদ্দুছ মিয়ার প্রেরিত লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যালয়টি সুপ্রাচীন ও খ্যাতি সম্পন্ন একটি বিদ্যালয়। বিগত ফ্যাসিষ্ট সরকারের আমলে এই বিদ্যালয়ে দুর্নীতির মহোৎসব চালানো হয়। ২০২২ সালে ম্যানেজিং কমিটির সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর মো. কুদ্দুছ মিয়ার দৃষ্টিগোচর হয় বিদ্যালয়ের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি। তিনি বিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়ের হিসাব দেখেন। তার কাছে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়ম ধরা পড়ে। ফুলতলা বশিরউল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় তৎকালীন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, ফুলতলা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান অত্র বিদ্যালয়ের সভাপতি মাসুক আহমদ উপজেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষনা সম্পাদক ও অত্র বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আরমান আলীকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক করেন। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মাসুক আহমদ ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক উপজেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষনা সম্পাদক আরমান আলী একে অপরের যোগসাজশে ফুলতলা বশিরউল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয়ে বেপরোয়া অনিয়ম-দুর্নীতি চালিয়ে যান। স্কুলের নামে জনৈক ব্যক্তির দানকৃত ৩০ শতাংশ ভূমি অনিয়মের মাধ্যমে ১২ লাখ টাকা বিক্রি করে তা সম্পুর্ণ আত্মসাৎ করেন। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের যোগসাজসে বিদ্যালয়ের তহবিল থেকে নগদ এক লাখ টাকা ঋণ নেন সভাপতি মাসুক আহমদ। বিদ্যালয়ের অপর এক ম্যানেজিং কমিটির সদস্য পাঁচটি চেক মারফত সাত লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকা বিদ্যালয়ের একাউন্ট থেকে উত্তোলন করেন। এভাবে একটি সুপ্রাচীন বিদ্যালয়ের জমাকৃত ফান্ড তারা লুটপাট করেন। বিভিন্ন রকমের ভূয়া বিল ভাউচার তৈরি করে বিদ্যালয়ের তহবিল ফাঁকা করে ফেলেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কর্তৃপক্ষ যদি ২০১৮ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিদ্যালয়ের হিসাব বিবরণী পর্যালোচনা করে তবে এই দুর্নীতির মহোৎসব খুজে পাবেন। অত্র বিদ্যালয়ে দানকৃত বিভিন্ন জায়গা একসনা ইজারা প্রদানে ব্যাপক দুর্নীতির আশ্রয় নেন সভাপতি ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। জমি ইজারার টাকা স্কুল ফান্ডে জমা না দিয়ে তারা ভাগবাটোয়ারা করে নেন। উপজেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষনা সম্পাদক ও অত্র বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আরমান আলী ২০১৮ সালে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে উক্ত পদ ভাগিয়ে নেন। এরপর প্রায় ৬ বছর ভারপ্রাপ্ত প্রধানের দায়িত্ব পালন কওে অবসরে গেছেন। অবসরে যাওয়ার পূর্ব মুহুর্তে ২০২৪ সালে চরম দুর্নীতির মাধ্যমে নজরুল ইসলামকে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেন। ব্যাপক অনিয়ম ও অর্থ কেলেঙ্কারীর মাধ্যমে তৎকালীন সভাপতি ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ১০ লক্ষাধিক টাকা ঘুষ গ্রহণ করে যোগ্য প্রধান শিক্ষক প্রার্থীদের ইন্টারভিউতে অংশগ্রহণ করতে না দিয়ে অনৈতিকভাবে নজরুল ইসলামকে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেন। নজরুল ইসলামের নিয়োগে বিরাট অঙ্কের অর্থ-বাণিজ্যের ঘটনা ফাঁস হলে এলাকার সাধারণ জনগণ আন্দোলন ও বিক্ষোভ করেন। অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে প্রধান শিক্ষক নিয়োগের ওপর মৌলভীবাজার জজ আদালতে মামলা হয়। মামলা চলমান অবস্থায় দুর্নীতির মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ পাওয়া নজরুল ইসলাম রহস্যজনকভাবে এমপিও ভুক্তও হয়েছেন।
অপরদিকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আরমান আলীর বিরুদ্ধে দায়িত্বে থাকাকালীন দুর্নীতির অভিযোগে শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। উক্ত তদন্ত কমিটি আরমান আলীর বিরুদ্ধে বেশ কিছু অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পায়। তিনি বিএড স্কেল না ধরে টাইম স্কেল ধরে স্কুল থেকে এক লাখ সাত্রিশ হাজার ৩ শত টাকা অতিরিক্ত নেন। তৎকালীন মন্ত্রনালয়ের তদন্ত কমিটি আরমান আলীর কাছ থেকে একটি লিখিত অঙ্গীকারনামা আদায় করেন যাতে এই টাকাগুলো বিদ্যালয়ের ফান্ডে জমা প্রদান করেন। পরবর্তীতে আরমান আলী দলীয় পদ পদবীর প্রভাব খাটিয়ে উক্ত টাকা পরিশোধ না করে বরং বিদ্যালয় হতে ২০১১-২০২৪ইং পর্যন্ত প্রতি মাসে অতিরিক্ত ৪ হাজার টাকা করে নেন। উক্ত বিষয়গুলি নিয়ে এলাকার সচেতন মহল বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ প্রদান করলেও দলীয় প্রভাব খাটিয়ে আরমান আলী পার পেয়ে যান। বিগত ফ্যাসিষ্ট আমলে কোটি টাকার উপরে এই বিদ্যালয় হতে লুট করা হয় বলে মো. কুদ্দুছ মিয়া দাবি করেন।
মাউসি’র সহকারি পরিচালক-৫ (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মো. খায়শেদ আলম বৃহস্পতিবার দুপুরে জানান, মহাপরিচালক তাকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দিয়েছেন। ৬ আগস্ট তিনি নির্দেশের কপি হাতে পেয়ে ১২ আগস্ট অভিযোগ তদন্তে জুড়ী উপজেলার ফুলতলা বশিরউল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয় সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। এসময় তিনি অভিযোগ সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যবেক্ষণ, অভিযোগকারি ও অভিযুক্তদের জবানবন্দি গ্রহণ করেন। এছাড়াও আরো অনেকের সাথে কথা বলেছেন। আগামি এক মাসের মধ্যে মহাপরিচালকের দপ্তরে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আশা প্রকাশ করেন।
এব্যাপারে অভিযুক্ত বর্তমান প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম জানান, নিয়োগ সংক্রান্ত মামলা চলমান থাকলেও ইনজাংশন প্রত্যাহার করায় তিনি এমপিওভুক্ত হয়েছেন। ২০২৪ সালের আগের অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে তার কিছু জানা নেই। অনিয়ম-দুর্নীতির লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের একজন পরিচালক বুধবার অভিযোগগুলো তদন্ত করে গেছেন। তিনি তার বক্তব্য দিয়েছেন।



মন্তব্য করুন