সাদেক যখন সাজেকে

সাদেক আহমেদ : ১২ সেপ্টেম্বর চলে গেলাম বাংলাদেশের সুন্দর পাহাড়ের পাদদেশে প্রাকৃতিক লীলাভূমি মেঘের কোলে ভেসে বেড়ায় উচু উচু পাহাড় বেষ্টিত খাগড়াছড়ির সাজেক। অনেকে ছোটবেলায় আমাকে আদর করে ডাকতো সাজেক, শেষ পর্যন্ত বৃদ্ধ বয়সে ৬৭টি পেরিয়ে যখন মৃত্যুদূত হাতছানি দিয়ে ডাকছে। বলছে, তুমি যেখানেই থাকো সাদেক, তোমার সাজেক দেখা হয়ে গেছে, এখন তোমাকে আল্লার ডাকে চলে যেতে হবেই। তুমি বাংলাদেশের সবজেলাতেই বিচরণ করেছো পথিক মুসাফির রূপে। সাজেক দেখার পরে আর মনে হয় কোথাও ভ্রমনের দরকার নেই। এর আগে তুমি খাগড়াছড়ির আলু টিলায় ভ্রমণ করেছো। রাঙামাটির বরকলের পাকিস্তান টিলায়, অনেক উচুতে, বিজিবি সদস্যসহ ভ্রমণ করেছো।
এবার আমার নিজের কথায় আসি। সাজেক ভ্রমণে যেতে অনেক কষ্ট হলেও সাকেক দর্শনে সমস্ত কষ্ট দূর হয়েগেছে। সাজেক ভ্রমনের কাহিনি ীলখলে একটি বই হয়ে যাবে। তবুও মনে হয় সাজেকের সৌন্দ্যর্য বলে শেষ করা যাবে না। যাওয়ার পথে ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া আমাদের বাসটি, দিঘিনালার কাছে একটি সুন্দর স্পর্টে তিন ঘন্টার যাত্রাবিরতিতে ভালো ভাবে নাস্তা পরিবেশন করা হলো। আমরা সুস্বাদো খাবার থেয়ে তৃপ্ত হলাম। সব চেয়ে আর্কষণীয় এ্যডভেঞ্চার হলো খাগড়াছড়ি থেকে ছেড়ে যাওয়া খোলাজীপ, যার নাম চাঁদের গাড়ি। শথাধিক চাদেরগাড়ি আমাদেরকে পিকাপ কওে সাজেকের পথে রওয়ানা করলাম। এর ঘন্টাখানেক পওে বাগাতিপাড়া থেকে সেনাবাহিনি স্কট করে আমাদের সাজেকের অর্ধেক সরু ওয়ানওয়ে রাস্তা পর্য়ন্ত এগিয়ে নিয়ে অপেক্ষায় রাখে। কারণ ঐদিন শুক্রবার হওয়ার জন্য পর্যটক বেশি হওয়ায় গাড়ির সংখ্যাও ছিল বেশি। তাই সাজেক দিক থেকে ঘুরে আসা শতাধিক গাড়ি সেনাবাহিনি স্কট করে এখানে শৃক্সক্ষলাবদ্ধভাবে নিয়ে এসে বিপরীত দিকে চাদেরগাড়িগুলোকে এদিকে পার কওে দেয়। তারপর আমরা সাজেকের দিকে রওয়ানা করি।
বাঘাতিপাড়া সেনা কেম্পে লেখা ছিল, বিদেশিদের নাম তালিকাভূক্ত করে যেতে হবে। আমি নেপাল ভুটান থাইলেন্ড মালদ¦ীপ বহুবার গিয়েছি। অনেক পর্যটক যায়। কিন্তু বাংলাদেশের সাজেকবেলি এতো সুন্দর হওয়ার পরের এখানে সেদিন বিদেশি একজন পর্যটককেও ভিজিট করতে দেখিনি। অথচ সেখানে আমরা দুদিন অবস্থান করেছি।
চাকমা ও বাঙালির এমন সুন্দর সম্প্রীতির স্থান হলো সাজেক। যেমন শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জে রাসপূর্ণিমা উৎসব হয় মনিপুরি সম্প্রদায়ের, সেখানে দেশিবিদেশি পর্ডটকদের পদচারনায় মুখরিত হয়ে ওঠে।
গাজেকে হেলিপ্যাড দেখেছি, সুন্দর একটি মসজিদ দেখেছি, আর বিভিন্ন রিসোর্ট বাঁশের তৈরি, যা দেখলে মন ভরে যায়।
আমাদের আল্লাহ অনেক কিছু প্রাকৃতিক সৌর্ন্দয্যের লীলাভূমি সৃষ্টি কওে আমাদেও উপহার দিয়েছেন, ঘাগড়াছড়ি থেকে ঠিক উত্তর দিকে মাত্র ৭২ কিলোমিটার দূরে শৌভৈীবাজার শ্রীমঙ্গলের হরীণছড়া চা বাগান। এরপাশেই আদমপুর জলপ্রপাত, আরো আছে, দার্জিলিং টিলা, এম আর খান বাগানে যেতে চোখে পড়ে গ্রেন্ড সুলমান রির্সোড। অনেক দেশি বিদেশী পর্যটক শ্রীমঙ্গল যাচ্ছে, কিন্তু সাজেকে দেশি পর্যটক অসংখ্য থাকলেও বিদেশি পর্যটক একজনও দেখা গেলো না। এটা আমাদের যেমন অর্থনৈতিক ক্ষতি, তেমনি আমাদেও দেশের পর্যটনশিল্পকে বহিরবিশ্বে পচিতি না করার ব্যর্থতাও । এর দোষ কাকে দেবো?
১৯৪৭ সালে আমরা ত্রিপুরা ও আগরতলাকে আমাদের ভৌগলিক সীমারেখার ভিতরে নিতে পারিনি। হয়তো তখনকার ভূরাজনৈতিক ভাবে পূর্ব পাকিস্তানকে যদিও ইপিআর শক্তিশালী ছিলো, তারপরেও ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ফিল্ডমার্শাল আইয়ূব খান পূর্ব পাকিস্তানের দিকে একটু নজর দিতেন তাহলে পাকিসÍান সেনা বাহিনীর যে শক্তি ছিল, তা ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে কাজে লাগিয়ে বর্তমান বাংলাদেশের পূর্বদিকের পিঠ যে বাঁকা তা শ্রীমঙ্গলের হরীণছড়া থেকে খাগড়াছড়ি পর্যন্ত মার্চপাষ্ট কওে পিঠ সোজা করা যেত। কিন্তু আমাদের দূর্ভাগ্য আজ বিদেশি পর্যটকগণ শ্রীমঙ্গলের হরিণ ছড়া থেকে কয়েক কিলোমিটার দক্ষিন দিকে অবস্থিত সাজেকে আসতে পারেন না। কে কাকে দোষ দিবে, তাই অনেকে আমাকে বলে সাজেক না সাদেক? কেনো আজ চোখ থাকতেও ঐদিকে দেখো না।
সিলেট ও চট্টগ্রামের মধ্যে অনেক অধ্যাত্মিক বাণিজ্যিক যোগাযোগ রয়েছে। কিন্তু পর্যটনদের সেতু বন্দনের কোনো কাজ হয় না। ব্রহ্মন বাড়ীয়ার কাছেই ত্রিপুরা আগরতলার মানুষের মধ্যে নৃতাত্বিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক একই ভাষাভাষীর বন্ধনে আবদ্ধ, তাই ত্রিপুরার মানুষগণও আমাদের সাথে বাঁকা পিঠ সোজা করার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে।
চিনকে যদি আমরা একাজে সম্প্রীক্ত করতে পারি, তাহলে মিরেশশরাই ইপিজেডে মুহুরির চরে আমাদের জন্য যে ভারি অস্ত্র ও ড্রোন বানাবে তা তুরস্ক ও পাকিস্তানের সহযোগিতায় আমরা হারানো ত্রিপুরা ফেরত পেয়ে আমাদের বাকা পিঠ সোজা করতে পারি। এবং খাগড়াছড়ি থেকে দক্ষিন দিকে শ্রীমঙ্গলে যেতে পারি, তখন সিলেট ও পাবত্য চট্রগ্রামের দশনীয় স্থানগুলো দেশী বিদেশি পর্যটকদের জন্য ভ্রমণ সহজ হয়ে উঠবে, তাতে আমরা অর্থনৈতিক ও ভূসামরিক দিক দিয়ে লাভবাস হবো।
চীন আমাদের লোভনীয় প্রস্তাব দিয়েছে, সড়ক ও ট্রেনযুগে আমরা মায়ানমার হয়ে কুমিং শহরে যাওয়ার জন্য। সেই শহরকে আমি সবসময় ‘স্রিং’ মানে বসন্তের শহর বলে দুই হাজার সাত সালে আক্ষায়িত করে ছিলাম। সেখানে একটি সুন্দর পর্যটন এলাকা আমাকে নিয়ে দেখানো হয়। স্টোন ফরেষ্ট, মানে পাথরের বন। হাজার বছর পূর্ব থেকে সেই পাথরগুলো বড় বড় গাছের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে একই ভাবে। নিশ্চয়ই ঐ পাথর রাষ্ট্র ও জনগণ কল্যানে পর্যটকদের আর্কষণ বৃদ্ধি করার জন্য চীন সরকার তৎপর রয়েছে। কারণ, ঐ পাথর কারো যাদুটোনার নয় এবং চীনের ঐতিহাসিক গ্রেটওয়ালের কথাও তাদেও হাজার বছরের প্রশ্রিমিক জাতি বলে চীনের সুনাম রয়েছে।
আমাদের ৩৬০ আউলিয়ার শিরোমণি হযরত শাহজালাল (র.), গৌড়গোবিন্দের যাদুটোনার পাথরকে বলেছিলেন, ‘সিল হট।’ যার অর্থ দাড়ায়, পাথর সরে যাও। সেই সিলহট শব্দ থেকেই সিলেট শব্দটির উৎপত্তি হয়ে সিলেট নামে নামকরণ হয় বলে অনেক ঐতিহাসিকগণ মনে করে। সিলেট ও চট্রগ্রাম হলো অলিআউলিয়াদেও পূণ্যভূমি। অলিআউলিয়াদেও দোয়ার বরকতে আমাদের ছেলেমেয়েরা প্রবাসে পাড়ি জমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে ও সেখানে সেই দেশেরও উন্নয়নে অবদান রাখছে। সেভাবে ইউরোপ আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া, কানাডা, সৌদি, মালোয়শিয়াসহ অনেক মুসলিম দেশে আমাদেও ম্যানপাওয়ারের কদর বাড়ছে। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।



মন্তব্য করুন