চীনের গুয়াংজু ক্যান্টন মেলা: বাংলাদেশি ব্যবসার বিশাল সম্ভাবনার দুয়ার

সাইফুল ইসলাম (গুয়াংজু, চীন ঘুরে এসে) : সাংবাদিকতার পাশাপাশি চা ব্যবসার সাথে যুক্ত থাকায় ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর চীনের গুয়াংজু শহরে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ক্যান্টন মেলায় অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল। বিশেষ করে চীনের পণ্য বাংলাদেশের বাজারে ব্যবসার এক বিশাল সম্ভার তৈরি করেছে। এই লক্ষ্যেই গত বছরের ৩ নভেম্বর রাত ১০টা ১০ মিনিটে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে চীনের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গুয়াংজু বিমানবন্দরে পৌঁছে যাই রাত ৩টার দিকে। বিমান থেকে নেমে সুবিশাল রানওয়ে দেখে প্রথম দেখাতেই মন ভরে যায়।
খুব দ্রুত ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া শেষ করে ট্যাক্সিযোগে হোটেলের উদ্দেশ্যে রওনা দিই। আগে থেকেই হোটেল বুকিং করা থাকায় বিমানবন্দর থেকে প্রায় আধা ঘণ্টার মধ্যেই আমরা হোটেলে পৌঁছে যাই। আমাদের হোটেলটি ছিল সানুয়ানলি মেট্রো স্টেশন এলাকার মানকেদুন হোটেল। এটি একটি জেলা শহর হওয়া সত্ত্বেও এর আধুনিক অবকাঠামো রাজধানী ঢাকাকেও হার মানাবে। সানুয়ানলি মেট্রো স্টেশনের সি-২ গেটের কাছেই বেশ কিছু বাংলাদেশি হোটেল রয়েছে; যেমন রাঁধুনী, রিজিক ও ধানসিঁড়ি। এসব হোটেলে বিরিয়ানি, মাছের ঝোল ও খাঁটি দেশি স্বাদের খাবার পাওয়া যায়। এছাড়া আশেপাশেই অন্যান্য হালাল ও দক্ষিণ এশীয় রেস্তোরাঁও রয়েছে।
হোটেলে সকালের নাস্তা সেরে মেট্রো রেলে চড়ে আমরা ক্যান্টন ফেয়ারের উদ্দেশ্যে রওনা হই। যদিও সেদিন ছিল ক্যান্টন মেলার শেষের দিন, আর দুপুরের দিকে আকাশে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। বিশাল এলাকা জুড়ে আয়োজিত এই মেলায় রয়েছে কয়েক স্তরের কঠোর নিরাপত্তা বলয়। ইনভাইটেশন কার্ড ছাড়া কারো প্রবেশাধিকার নেই। প্রবেশদ্বারে নিরাপত্তারক্ষীরা পাসপোর্ট ও ইনভাইটেশন পেপার যাচাই করে স্ক্যান করার মাধ্যমে সাথে সাথেই আইডি কার্ড তৈরি করে আমাদের হাতে তুলে দেন। এরপর শুরু হয় আমাদের মেলা প্রাঙ্গণে প্রবেশ।
ভেতরে প্রবেশ করতেই চোখ ধাঁধাঁনো সব পণ্যের সমারোহ দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। মেলায় আমার সাথে গুয়াংজু ঘুরে দেখেছেন ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ নিয়ামুল হক তরফদার এবং সহকর্মী সাংবাদিক শরীফ আহমদসহ অনেক বাংলাদেশি ব্যবসায়ী। এই তিনজনের একসাথে ভ্রমণ ব্যবসা নিয়ে এক অন্যরকম অনুভূতির জন্ম দিয়েছিল। গুয়াংজুর এই বিশাল প্রদর্শনী কেন্দ্রের ভেতরে ঢুকলেই প্রথম যে অনুভূতি জাগে, তা হলো— মানুষ আর পণ্যের এক অদ্ভুত সমুদ্র। এক পাশে স্মার্ট মেশিন, অন্য পাশে অটোমেটেড প্রোডাকশন লাইন, আবার কয়েক কদম এগোলেই নতুন ডিজাইনের গার্মেন্টস এক্সেসরিজ, কাঁচামাল, হোম অ্যাপ্লায়েন্স ও কৃষি যন্ত্রপাতি— যেন চোখের সামনে জীবন্ত এক ‘ভবিষ্যত বাজার’।
চায়না ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট ফেয়ার, যা বিশ্বজুড়ে ‘ক্যান্টন ফেয়ার’ নামে পরিচিত, চীনের সবচেয়ে প্রাচীন, বৃহত্তম এবং প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক মেলাগুলোর একটি। চীনের গুয়াংডং প্রদেশের গুয়াংজু শহরে স্থায়ীভাবে এই বৈশ্বিক বাণিজ্য মেলার আয়োজন করা হয়। প্রতি বছর দুইবার (এপ্রিল-মে এবং অক্টোবর-নভেম্বর) এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এই দুই মৌসুমেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ব্যবসায়ীরা নতুন পণ্য খুঁজে পেতে, সরবরাহকারীদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে এবং দীর্ঘমেয়াদী ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তুলতে এখানে অংশ নেন।
মেলাটি তিনটি পৃথক পর্যায়ে (প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়) অনুষ্ঠিত হয়, যাতে বিভিন্ন শিল্পখাতের পণ্য সুশৃঙ্খলভাবে প্রদর্শন করা যায়:
প্রথম পর্যায়: ইলেকট্রনিক্স, শিল্প পণ্য এবং ভারী যন্ত্রপাতির প্রদর্শনী। প্রযুক্তিনির্ভর বা শিল্পভিত্তিক ব্যবসার জন্য এই ধাপটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয় পর্যায়ে: গৃহস্থালী পণ্য, উপহার সামগ্রী ও হোম ডেকোর আইটেমের বিশাল সংগ্রহ, যা খুচরা ব্যবসায়ীদের জন্য দারুণ সুযোগ তৈরি করে।
তৃতীয় পর্যায়: পোশাক, ফ্যাশন পণ্য, ওষুধ এবং স্বাস্থ্যসেবা সামগ্রী, যা ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল ব্যবসার জন্য বিশেষ আকর্ষণ।
মেলায় প্রতিটি স্টলেই থাকে নতুন উদ্ভাবন, আধুনিক প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পণ্য। বিশেষ করে ইলেকট্রনিক্স এবং নতুন প্রযুক্তির পণ্য বাংলাদেশের বাজারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ক্যান্টন ফেয়ারের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সরাসরি নির্মাতা বা সাপ্লায়ারদের সাথে যোগাযোগের সুযোগ। সরাসরি কারখানা পরিদর্শন করে নিজের চাহিদামতো মালামাল ক্রয় করা যায়। এই মেলায় অংশ নিয়ে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, তা আমার ভবিষ্যৎ ব্যবসায়ে দারুণভাবে কাজে লাগছে। ইতিমধ্যে আমার এই অভিজ্ঞতা শুনে অনেক নতুন ব্যবসায়ী ক্যান্টন মেলায় অংশ নিয়েছেন। বিশেষ করে নতুন পণ্যের ট্রেন্ড, বাজারের চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য এই মেলার জুড়ি নেই। আগে যেখানে একটি পণ্য বাংলাদেশে আনতে মাসের পর মাস সময় লাগত, এখন সরাসরি যোগাযোগের কারণে সময় অনেক কমে গেছে এবং ব্যবসার প্রসারও দ্বিগুণ বেড়ে গেছে।
চীনের ভাষা ও ব্যবসায়িক পরিবেশ
চীনের ভাষা কিছুটা কঠিন হলেও সেখানকার ব্যবসায়ীরা মোটামুটি ইংরেজি বোঝেন। এমনকি বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ীর সাথে কথা হয়েছে যারা খুব ভালো ইংরেজি বোঝেন এবং তাদের কাছ থেকে পণ্যও ক্রয় করেছি। অবাক করার বিষয় হলো, অনেক চীনা ব্যবসায়ী এখন বাংলা ভাষাও বুঝতে পারেন। এছাড়া সেখানে দীর্ঘদিন ধরে সফলভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছেন এমন বহু বাংলাদেশি ব্যবসায়ীও রয়েছেন, যাদের কাছ থেকে দারুণ সহযোগিতা পাওয়া যায়। সবচেয়ে বড় কথা, চীনে গিয়ে প্রতারিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই; কারণ এখানকার আইনকানুন অত্যন্ত কঠোর।



মন্তব্য করুন