উলুয়াইল ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসাঃ প্রতিষ্ঠা, ঐতিহ্য ও অগ্রযাত্রা

July 2, 2026,

বশির আহমদ : উলুয়াইল ইসলামিয়া আলিম মাদরাসা মৌলভীবাজার জেলার একটি ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি ও আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই প্রতিষ্ঠানটি এলাকার ধর্মীয়, নৈতিক ও শিক্ষাবিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এর প্রতিষ্ঠার পেছনে রয়েছে এলাকার আলেম-ওলামা, মুরব্বি ও ধর্মপ্রাণ মানুষের একান্ত আন্তরিকতা, অক্লান্ত পরিশ্রম ও আত্মত্যাগের এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস।

প্রতিষ্ঠার সূচনা (১৯৭৫)

১৯৭৫ সালে উলুয়াইল মাস্টারবাড়ি জামে মসজিদের তৎকালীন ইমাম মাওলানা মো. আব্দুল করিম এলাকার ধর্মীয় জাগরণ ও দ্বীনি শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে একটি ওয়াজ মাহফিল আয়োজনের প্রস্তাব দেন। তাঁর এ প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে বিশিষ্ট মুরব্বি আলহাজ বকশী মো. আব্দুস সোবহানের নেতৃত্বে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে এক বৃহৎ ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করা হয়।

উক্ত মাহফিলে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শামসুল উলামা আল্লামা মো. আব্দুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী (রহ.)। বিশেষ অতিথি ছিলেন আল্লামা হরমুজ উল্লাহ সায়দা (রহ.), মাওলানা মো. ইসমাইল হোসেন রাইয়াপুরী এবং মাওলানা মো. আব্দুল কুদ্দুস নুরী (রহ.) প্রমুখ।

ওয়াজ মাহফিলে আল্লামা ফুলতলী সাহেব কিবলা (রহ.) উলুয়াইল এলাকায় একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। উপস্থিত এলাকাবাসী আনন্দচিত্তে সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং মাদরাসা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় জমি দানে সম্মতি প্রকাশ করেন।

ভূমি দান আর্থিক সহযোগিতা

মাদরাসা প্রতিষ্ঠার জন্য যাঁরা মূল্যবান ভূমি দান করেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন— মরহুম বকশী মো. আব্দুল মুকিত, মরহুম বকশী আব্দুল মন্নান, মরহুম আলহাজ বকশী মো. আব্দুস সোবহান, আলহাজ বকশী হারুনুর রশিদ, বকশী কাওছার রশীদ, মরহুম বকশী আলতাফুর রহমান, মরহুম বকশী আব্দুল বারী, মরহুম হাজী আবরু মিয়া, মরহুম আলহাজ মকবুলুর রহমান, মরহুম আলহাজ মুসলিম মিয়া, মরহুম আলহাজ মো. তাহির মিয়া, মরহুম এ. কে. এম. নুরুজ্জামান, মরহুম মো. আব্দুর নুর, মরহুম শাহ আলহাজ আলখাছ মিয়া, আলহাজ শাহ কাপ্তান মিয়া, মরহুম আলহাজ আকলু মিয়া, মরহুম আলহাজ মফিজ মিয়া এবং আলহাজ রফিজ উদ্দিন আহমেদ প্রমুখ।

এ ছাড়া এলাকার বহু ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি আর্থিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন, মরহুম আলহাজ বকশী সুলেমান, মো. শমছু মিয়া, আলহাজ শাহ মো. আলাউর রহমান, মরহুম হাজী মখলিছুর রহমান, মরহুম আলহাজ মো. আব্দুস সালাম (হারিছ মিয়া), আলহাজ শেখ জয়নাল আবেদীন, আলহাজ মো. নজরুল ইসলাম চৌধুরী, মরহুম আলহাজ মো. নেছার আহমদ (ইসলামপুর), মো. কয়ছর আহমদ (কচুয়া), শাহ মো. গিয়াস মিয়া (কচুয়া) এবং মরহুম হারিছ মিয়া (কচুয়া) প্রমুখ।

শিক্ষা কার্যক্রমের অগ্রগতি

আল্লামা ফুলতলী সাহেব কিবলা (রহ.)-এর দোয়া ও পরামর্শে মাদরাসাটি প্রথমে ইবতেদায়ি মাদরাসা হিসেবে যাত্রা শুরু করে। পরবর্তীতে এটি দাখিল এবং পরে আলিম মাদরাসায় উন্নীত হয়।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে মরহুম আলহাজ বকশী মো. আব্দুস সোবহান (রহ.) তাঁর ইন্তেকাল (১৯৯৬ সাল) পর্যন্ত এলাকার ধনী-গরিব নির্বিশেষে সকলের সহযোগিতায় মাদরাসার সার্বিক কার্যক্রম নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে পরিচালনা করেন।

প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা

১৯৯৬ সালের পর মাদরাসাটি অ্যাডহক কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হতে থাকে।

আহ্বায়ক ছিলেন মরহুম আলহাজ বকশী আলতাফুর রহমান। প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বকশী কাওছার রশীদ এবং শিক্ষানুরাগী সদস্য ছিলেন মরহুম মো. ওয়াসিদ মিয়া।

মাদরাসার প্রথম সুপার ছিলেন মাওলানা মো. আব্দুল করিম। পরবর্তীকালে মাওলানা মো. হাবিবুর রহমান, মাওলানা মো. নাছির উদ্দীন দায়িত্ব পালন করেন। এমপিওভুক্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মাওলানা আবু জাফর মো. ইউসুফ।

এমপিও একাডেমিক স্বীকৃতি

মাদরাসাটি ১৯৯৫ সালে বৈধতা লাভ করে এবং ২০০০ সালে দাখিল পর্যায়ে এমপিওভুক্ত হয়। এ ক্ষেত্রে বকশী ইকবাল আহমদ, বকশী মিসবাহ উর রহমান এবং মো. সুন্দর মিয়ার অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়।

এমপিওভুক্তির পর ২০০০ সালে মাওলানা মো. শামসুল ইসলাম সুপার/অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং প্রায় ১২ বছর অত্যন্ত দক্ষতা ও সুনামের সঙ্গে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। তাঁর সময়েই ২০১০ সালে আলিম শ্রেণির অনুমোদন লাভ করে।

বর্তমান অবস্থা

বর্তমান অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা বশির আহমদ ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর উদ্যোগে আলিম একাডেমিক স্বীকৃতির জন্য আবেদন করা হয় এবং দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর ২০২১ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে একাডেমিক স্বীকৃতি অর্জিত হয়। বর্তমানে মাদরাসাটি আলিম পর্যায়ে এমপিওভুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে। মাদ্রাসায় শিশু শ্রেণী থেকে আলিম ২য় বর্ষ পর্যন্ত ৭৫০ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে।এছাড়াও এতিমখানা লিল্লাহ বোডিং এ আরও ৯০ জন ছাত্র আবাসিক থেকে লেখাপড়া করছে। সকল পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল সন্তোষজনক।

অবকাঠামো অন্যান্য প্রতিষ্ঠান

প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম প্রথমে টিনশেড ও আধাপাকা ঘরে পরিচালিত হতো। পরবর্তীতে ২০০৫ সালে বিএনপি সরকার আমলে তৎকালীন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম. সাইফুর রহমান এবং সংসদ সদস্য এ. নাসের রহমানের সহযোগিতায়, বকশী মিসবাহ উর রহমান ও মাওলানা মো. শামসুল ইসলামের প্রচেষ্টায় একটি তিনতলা ফ্লাড সেন্টার নির্মিত হয়। বর্তমানে এই ভবনেই শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তবে এখনো সরকারিভাবে কোনো একাডেমিক ভবন বরাদ্দ পাওয়া যায়নি।

সামাজিক অবদান

প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই উলুয়াইল ইসলামিয়া আলিম মাদরাসা এলাকায় শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এখান থেকে শিক্ষা অর্জন করে বহু শিক্ষার্থী দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ লাভ করেছে এবং রেমিট্যান্স অর্জনের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতেও অবদান রাখছে। অনেকে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিতে যোগদান করে স্বচ্ছল জীবনযাপন করছেন।

এই মাদরাসার কল্যাণে এলাকার শিশু-কিশোরদের মধ্যে শিক্ষার আলো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে প্রায় প্রতিটি ঘরেই দাখিল ও আলিম পাস শিক্ষিত ছেলে-মেয়ে পাওয়া যায়। এ পরিবর্তনের পেছনে উলুয়াইল ইসলামিয়া আলিম মাদরাসার অবদান অনস্বীকার্য।

বর্তমানে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে এসে অধ্যয়ন করছে। বিনামূল্যে আবাসিক সুবিধা থাকায় দরিদ্র ও দূরবর্তী এলাকার শিক্ষার্থীরাও সহজেই শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে।

লন্ডনপ্রবাসী আলহাজ শেখ জয়নাল আবেদীন এবং মরহুম আলহাজ মো. আব্দুস সালাম (হারিছ মিয়া) একটি এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজও সুনামের সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে।

উল্লেখ্য, মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা মরহুম আলহাজ বকশী মো. আব্দুস সোবহান সাহেবের ইন্তেকালের পর থেকে তাঁর সুযোগ্য সন্তান বকশী কাওছার রশীদ মাদরাসার হাল দৃঢ়ভাবে ধরে রেখেছেন। প্রতিষ্ঠানের সুখে-দুঃখে, উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার প্রতিটি পদক্ষেপে তাঁকে সর্বাগ্রে দেখা যায়।

এলাকার প্রবীণদের মুখে আজও শোনা যায়, মাদরাসা প্রতিষ্ঠার পর আলহাজ বকশী মো. আব্দুস সোবহান সাহেব দিনের মতো রাতেও লণ্ঠন জ্বেলে ধনী-গরিব নির্বিশেষে মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে মাদরাসার জন্য চাঁদা সংগ্রহ করতেন, যাতে মাস শেষে শিক্ষকদের বেতন পরিশোধ করা সম্ভব হয়।

আল্লাহ তাআলা যেন এ প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা, দাতা, শুভানুধ্যায়ী, শিক্ষক ও সকল খিদমতগারের আন্তরিক শ্রম ও ত্যাগ কবুল করেন, তাঁদের উত্তম প্রতিদান দান করেন এবং উলুয়াইল ইসলামিয়া আলিম মাদরাসাকে দ্বীনি ও আধুনিক শিক্ষার এক সমৃদ্ধ, আদর্শ ও কল্যাণময় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন। আমিন।

লেখক: বশির আহমদ, অধ্যক্ষ, উলুয়াইল ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com