ইসলামে এতিমের দায়িত্ব গ্রহণ ও লালন-পালন

July 1, 2026,

বশির আহমদ :

ভূমিকা : মানবসভ্যতার ইতিহাসে এতিম শিশুদের অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ইসলাম এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সমাজের সবচেয়ে অসহায় ও ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণির অন্যতম হলো এতিম শিশু। পিতার স্নেহ, অভিভাবকত্ব ও নিরাপত্তা হারিয়ে তারা প্রায়ই দারিদ্র্য, অবহেলা, বঞ্চনা ও মানসিক অনিশ্চয়তার মধ্যে বেড়ে ওঠে। তাই তাদের দায়িত্ব গ্রহণ করা শুধু মানবিকতার বিষয় নয়; বরং ইসলামের দৃষ্টিতে এটি একটি মহান ইবাদত এবং ঈমানের বাস্তব প্রকাশ।

বিশেষ তাৎপর্যের বিষয় হলো, আমাদের নবী  হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজেও শৈশবে পিতৃহীন ছিলেন। ফলে তিনি এতিমের হৃদয়ের ব্যথা ও বাস্তবতা গভীরভাবে উপলব্ধি করতেন। তাঁর জীবন, শিক্ষা ও আদর্শে এতিম প্রতিপালন একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

এতিম কাকে বলে?

ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়, যে শিশুর পিতা তার বালেগ হওয়ার পূর্বে ইন্তেকাল করেন, তাকে এতিম বলা হয়।

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, (لَا يُتْمَ بَعْدَ احتلام) অর্থ: “বালেগ হওয়ার পর আর এতিম থাকে না।” (সুনানে আবু দাউদ)

অর্থাৎ, শরিয়তের দৃষ্টিতে এতিম হওয়ার বিধান শিশুকাল পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। তবে বালেগ হওয়ার পরও কেউ অসহায় বা দরিদ্র থাকলে তার সহযোগিতা করা অবশ্যই ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দায়িত্ব।

কুরআনের দৃষ্টিতে এতিমের মর্যাদা

পবিত্র কুরআনে এতিমদের অধিকার সংরক্ষণ, তাদের প্রতি সদাচরণ এবং সম্পদের নিরাপত্তার বিষয়ে বহুবার নির্দেশনা এসেছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, (فَأَمَّا الْيَتِيمَ فَلَا تَقْهَرْ﴾) “অতএব, তুমি এতিমের প্রতি কঠোর আচরণ করো না।” (সূরা আদ-দুহা: ৯)

আরও বলেন, (وَآتَى الْمَالَ عَلَىٰ حُبِّهِ ذَوِي الْقُرْبَىٰ وَالْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينِ﴾) অর্থাৎ, প্রকৃত নেকি হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আত্মীয়স্বজন, এতিম ও অভাবগ্রস্তদের জন্য সম্পদ ব্যয় করা। (সূরা আল-বাকারা: ১৭৭)

এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ সম্পর্কে কুরআনের সতর্কবাণী অত্যন্ত কঠোর, (إِنَّ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ أَمْوَالَ الْيَتَامَىٰ ظُلْمًا إِنَّمَا يَأْكُلُونَ فِي بُطُونِهِمْ نَارًا﴾) “অর্থঃ যারা অন্যায়ভাবে এতিমের সম্পদ ভক্ষণ করে, তারা নিজেদের পেটে আগুনই ভরে।” (সূরা আন-নিসা: ১০)

আবার আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন,(﴿وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْيَتَامَىٰ ۖ قُلْ إِصْلَاحٌ لَّهُمْ خَيْرٌ﴾) “তারা আপনাকে এতিমদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলুন, তাদের কল্যাণসাধন করাই উত্তম।” (সূরা আল-বাকারা: ২২০)

এসব কোরআন শরীফের আয়াত প্রমাণ করে, ইসলাম শুধু দান করার নির্দেশ দেয়নি; বরং এতিমদের মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করার শিক্ষা দিয়েছে।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দৃষ্টিতে এতিম প্রতিপালনের মর্যাদা

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, (أَنَا وَكَافِلُ الْيَتِيمِ فِي الْجَنَّةِ هَكَذَا) এরপর তিনি তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল পাশাপাশি করে দেখালেন। (সহিহ বুখারি)

অর্থাৎ, যে ব্যক্তি একজন এতিমের দায়িত্ব গ্রহণ করবে, সে জান্নাতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সান্নিধ্য লাভ করবে। অন্য হাদিসে এসেছে, (مَنْ مَسَحَ رَأْسَ يَتِيمٍ لِلَّهِ كَانَ لَهُ بِكُلِّ شَعْرَةٍ حَسَنَةٌ)

অর্থাৎ, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোনো এতিমের মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দেয়, তার জন্য প্রতিটি চুলের বিনিময়ে নেকি লেখা হয়। (মুসনাদ আহমদ)

এতে স্পষ্ট হয়, ইসলাম এতিমের শুধু অর্থনৈতিক প্রয়োজন নয়, তার মানসিক নিরাপত্তা ও ভালোবাসার প্রয়োজনকেও সমান গুরুত্ব দিয়েছে।

এতিম প্রতিপালনের প্রকৃত অর্থ

ইসলামে এতিম প্রতিপালন মানে কেবল খাবার বা অর্থ প্রদান নয়। বরং তাকে নিজের সন্তানের মতো স্নেহ করা, মানসম্মত শিক্ষা দেওয়া, নৈতিক চরিত্র গঠন, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, কর্মদক্ষ করে গড়ে তোলা এবং আত্মমর্যাদার সঙ্গে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়াই প্রকৃত “কাফালাতুল ইয়াতীম”।

খোলাফায়ে রাশেদীন ও সাহাবায়ে কেরামের অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর শিক্ষা তাঁর সাহাবায়ে কেরাম বাস্তব জীবনে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) খেলাফতের ব্যস্ত দায়িত্বের মধ্যেও অসহায় ও এতিমদের খোঁজখবর নিতেন।

হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) রাষ্ট্রীয় বায়তুল মাল থেকে এতিম ও অসহায় শিশুদের জন্য নিয়মিত ভাতার ব্যবস্থা করেছিলেন। তিনি রাতের আঁধারে নগর পরিদর্শনে বের হয়ে ক্ষুধার্ত শিশুদের খাদ্যের ব্যবস্থা করতেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি, “ফোরাত নদীর তীরে যদি একটি প্রাণীও অনাহারে মারা যায়, তবে সে ব্যাপারে উমরকে জবাবদিহি করতে হবে”।

হযরত উসমান (রা.) তাঁর বিপুল সম্পদ থেকে এতিম ও দরিদ্রদের জন্য অকাতরে ব্যয় করতেন। হযরত আলী (রা.) এতিমদের প্রতি পিতৃতুল্য স্নেহ প্রদর্শন করতেন এবং তাদের শিক্ষা, চরিত্র গঠন ও নৈতিক বিকাশে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন।

এসব দৃষ্টান্ত থেকে প্রতিয়মান হয় যে, এতিম প্রতিপালন শুধু দানশীলতার বিষয় নয়, বরং এটি একটি কল্যাণমুখী ও মানবিক বিষয় ও বটে।

ব্যক্তি, সমাজ রাষ্ট্রের দায়িত্ব

এতিমদের দায়িত্ব শুধু পরিবারের নয়; বরং ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আলেম-উলামা, দাতব্য প্রতিষ্ঠান এবং বিত্তবানদেরও সমান দায়িত্ব রয়েছে।

তাদের জন্য প্রয়োজন নিরাপদ আবাসন, দ্বীনি ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা বৃত্তি, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের করণীয়

বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সড়ক দুর্ঘটনা এবং বিভিন্ন সামাজিক সংকটের কারণে এতিম শিশুর সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমতাবস্তায় অনেক শিশু শিক্ষাবঞ্চিত হচ্ছে, শিশুশ্রমে জড়িয়ে পড়ছে কিংবা মানসিক অবহেলার শিকার হচ্ছে। এরি বাস্তবতায় তাদের  প্রতি আমাদের দায়িত্ব আরও বেড়ে গেছে।

বিভিন্ন জায়গায় এতিমখানা প্রতিষ্ঠা হচ্ছে সরকার সমাজসেবা অধিদপ্তর এর মাধ্যমে নিবন্ধন করে আংশিক অনুদান দিচ্ছেন, কিন্তু সুষ্ঠ ব্যবস্তাপনার অভাবে এতিমদের  কাংখিত লক্ষে পৌছানো সম্ভব হচ্ছে না। এতিমখানা গুলোতে এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে তারা পারিবারিক স্নেহ, মানসম্মত শিক্ষা, নৈতিক মূল্যবোধ, আধুনিক জ্ঞান, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপদ ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা পাবে।

উপসংহার

ইসলাম এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যেখানে কোনো এতিম নিজেকে অবহেলিত বা অসহায় মনে করবে না। একজন এতিমের মুখে হাসি ফোটানো, তার অশ্রু মুছে দেওয়া, তাকে শিক্ষিত, নৈতিক ও আত্মনির্ভরশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা এবং তার ভবিষ্যতের দায়িত্ব গ্রহণ করা শুধু মানবসেবা নয়; বরং এটি আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম মাধ্যম।

তাই আসুন, আমরা প্রত্যেকে আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী অন্তত একজন এতিমের শিক্ষা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন অথবা সার্বিক কল্যাণের দায়িত্ব গ্রহণে এগিয়ে আসি।

লেখক: বশির আহমদ, অধ্যক্ষ, উলুয়াইল ইসলামিয়া আলিম মাদরাসা

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com