পথশিশু ও টোকাইদের ভবিষ্যৎ: রাষ্ট্র, সমাজ ও মানবতার দায়িত্ব

July 5, 2026,

বশির আহমদ : বাংলাদেশের শহর, বন্দর, বাস টার্মিনাল ও রেলস্টেশনগুলোতে প্রতিদিন অসংখ্য পথশিশু ও টোকাইকে দেখা যায়। কেউ ভিক্ষা করছে, কেউ বোতল বা কাগজ কুড়াচ্ছে, কেউ গাড়ির কাঁচ পরিষ্কার করছে, আবার কেউ ফুটপাতে রাত কাটাচ্ছে। তাদের অনেকেরই কোনো নিরাপদ আশ্রয় নেই, নিয়মিত খাবার নেই, শিক্ষা নেই, চিকিৎসা নেই এবং ভবিষ্যতের কোনো নিশ্চয়তা নেই। তারা রাষ্ট্রের নাগরিক হলেও বাস্তবে মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত।

একজন শিশু জন্মগতভাবে অপরাধী নয়। পারিবারিক ভাঙন, দারিদ্র্য, অবহেলা, নির্যাতন এবং সামাজিক বৈষম্যই অনেক শিশুকে পথের জীবনে ঠেলে দেয়। অনেক শিশুর বাবা মারা যাওয়ার পর মা দ্বিতীয় বিয়ে করেন এবং সন্তানটি অবহেলিত হয়ে পড়ে। আবার কোথাও সৎ বাবা বা সৎ মায়ের নির্যাতন, কোথাও চরম দারিদ্র্য, কোথাও পারিবারিক কলহের কারণে শিশুরা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যায়। তারা শেষ পর্যন্ত কমলাপুর রেলস্টেশন, সদরঘাট, বাস টার্মিনাল কিংবা বিভিন্ন শহরের ফুটপাতকে আশ্রয়স্থল হিসেবে বেছে নিতে বাধ্য হয়।

এসব শিশুর জীবন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিদিন তারা ক্ষুধা, শীত, বৃষ্টি, অসুস্থতা, নির্যাতন, মাদক ব্যবসায়ীদের প্রলোভন, মানবপাচার, যৌন শোষণ এবং বিভিন্ন অপরাধচক্রের হুমকির মধ্যে বসবাস করে। কোনো সুরক্ষা না থাকায় তারা খুব সহজেই মাদকাসক্তি, চুরি, ছিনতাই বা অন্যান্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। অথচ তাদের অধিকাংশই অপরাধী হিসেবে জন্মায়নি। সমাজ ও রাষ্ট্রের অবহেলাই তাদের সেই পথে ঠেলে দেয়।

বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে কিছু পথশিশু পুনর্বাসন কর্মসূচি থাকলেও বাস্তব প্রয়োজনের তুলনায় তা অত্যন্ত সীমিত। দেশের বিভিন্ন রেলস্টেশন ও শহরে এখনো হাজার হাজার শিশু খোলা আকাশের নিচে রাত কাটায়। তাদের জন্য পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র, পুনর্বাসন ও দক্ষতা উন্নয়নের ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি।

ইসলামও এতিম, অসহায় ও দরিদ্র শিশুদের প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, “অতএব, তুমি এতিমের প্রতি কঠোর হয়ো না।” (সূরা আদ-দুহা: ৯)

রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আমি ও এতিমের লালন-পালনকারী জান্নাতে এভাবে পাশাপাশি থাকব।” এরপর তিনি নিজের দুটি আঙুল পাশাপাশি দেখিয়েছিলেন। (সহীহ আল-বুখারী)

এই শিক্ষা আমাদের জানিয়ে দেয় যে অসহায় শিশুদের দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়; এটি সমাজের প্রতিটি মানুষের নৈতিক ও ধর্মীয়  দায়িত্ব¡।

সমাধানের পথ

প্রথমতঃ প্রতিটি বিভাগ ও জেলায় সরকারি উদ্যোগে আধুনিক শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে, যেখানে নিরাপদ আবাসন, খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং মানসিক পরিচর্যার ব্যবস্থা থাকবে।

দ্বিতীয়তঃ পথশিশুদের জন্য কারিগরি শিক্ষা ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা ভবিষ্যতে সম্মানজনক জীবিকা অর্জন করতে পারে।

তৃতীয়তঃ যেসব পরিবার দারিদ্র্য বা সামাজিক সমস্যার কারণে শিশুদের হারাচ্ছে, তাদের আর্থিক ও সামাজিক সহায়তা দিতে হবে, যাতে শিশুরা পরিবারেই নিরাপদে বেড়ে উঠতে পারে।

চতুর্থতঃ রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল ও শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সমাজকর্মী ও শিশু সুরক্ষা টিম নিয়োগ করে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের দ্রুত উদ্ধার ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

পঞ্চমতঃ বেসরকারি সংস্থা, মসজিদ, মাদরাসা, সামাজিক সংগঠন, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান এবং বিত্তবান ব্যক্তিদের সমন্বয়ে দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন তহবিল গঠন করা যেতে পারে।

ষষ্ঠতঃ শিশুদের ব্যবহার করে ভিক্ষাবৃত্তি, মাদক ব্যবসা বা অপরাধে জড়িত চক্রগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

সপ্তমতঃ সমাজের প্রতিটি মানুষকে সচেতন হতে হবে। আমরা যদি অন্তত একজন পথশিশুর শিক্ষা, চিকিৎসা বা পুনর্বাসনের দায়িত্ব গ্রহণ করি, তবে সমাজে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসতে পারে।

উপসংহার

একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিশুদের ওপর। আজকের পথশিশুই আগামী দিনের নাগরিক। আমরা যদি তাদের অবহেলা করি, তবে তারা হতাশা, মাদক ও অপরাধের দিকে ঝুঁকতে পারে; আর যদি শিক্ষা, ভালোবাসা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ দিই, তবে তারাই দেশের দক্ষ জনশক্তি ও সম্পদে পরিণত হবে।

তাই পথশিশু ও টোকাইদের সমস্যাকে শুধু দান-খয়রাতের বিষয় হিসেবে নয়, বরং জাতীয় উন্নয়ন, মানবাধিকার এবং সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে দেখতে হবে। সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের বিত্তবান মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগেই তাদের জন্য একটি নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব। একটি শিশুর চোখের জল শুধু তার ব্যক্তিগত কষ্ট নয়,এটি আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র এবং মানবতার প্রতি এক নীরব প্রশ্ন।

লেখক: অধ্যক্ষ,উলুয়াইল ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, মৌলভীবাজার সদর।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com