সত্য প্রকাশে আপোষ নেই, সংবাদ ও সাংবাদিকতায় ইসলামের নির্দেশনা

September 13, 2026,

মোয়াজ্জেম চৌধুরী : পরিবর্তিত সমাজ বাস্তবতায় সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। গণমাধ্যমকে বলা হয় সমাজের দর্পণ। মানুষের অধিকার, বঞ্চনা, অবহেলা, নিপীড়ন, দুর্নীতি, অনিয়ম, বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একজন সাংবাদিকের কলম কখনো কখনো নির্যাতিত মানুষের শেষ আশ্রয় হয়ে ওঠে, আবার কখনো ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির মুখোমুখি দাঁড় করানোর শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।

সাংবাদিকতাকে রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ বলা হয়। সংবাদ হলো সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন ঘটনা, সমস্যা, অর্জন, অনিয়ম ও মানুষের জীবন-বাস্তবতার তথ্যসমৃদ্ধ উপস্থাপন। মুদ্রিত সংবাদপত্র থেকে শুরু করে টেলিভিশন, রেডিও, অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমও বিস্তৃত হয়েছে। ফলে একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে তাঁর নৈতিক ও সামাজিক জবাবদিহিও।

ইসলামের দৃষ্টিতে সংবাদ ও তথ্য কোনো সাধারণ বিষয় নয়। সত্য সংবাদ মানুষের কল্যাণে ভূমিকা রাখতে পারে, আবার মিথ্যা, বিকৃত বা যাচাইহীন সংবাদ একটি ব্যক্তি, পরিবার, প্রতিষ্ঠান এমনকি একটি সম্পূর্ণ সমাজের অপূরণীয় ক্ষতি করতে পারে। এ কারণে ইসলাম সংবাদ, তথ্য, সাক্ষ্য, গুজব ও মানুষের সম্মান-সম্মানিত হওয়ার বিষয়কে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে।

সাংবাদিকতা একটি পবিত্র আমানত :

সাংবাদিকের কাছে তথ্য একটি আমানত। সেই আমানত রক্ষা করার অর্থ হলো—যে তথ্য জনগণের সামনে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তা যথাসম্ভব সত্য, নির্ভুল, প্রাসঙ্গিক ও বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরা।

ব্যক্তিগত স্বার্থ, রাজনৈতিক মতাদর্শ, দলীয় আনুগত্য, অর্থনৈতিক সুবিধা, বিজ্ঞাপনের চাপ, সম্পর্কের প্রভাব কিংবা কারও প্রতি ব্যক্তিগত আক্রোশের কারণে সংবাদকে বিকৃত করা সাংবাদিকতার নৈতিকতার পরিপন্থী।

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনের সূরা আল-আহযাবের ৭০ নম্বর আয়াতে মুমিনদের উদ্দেশে বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো।’

সাংবাদিকের জন্য এই নির্দেশনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একটি বাক্যও বহু মানুষের চিন্তা, সিদ্ধান্ত ও সামাজিক অবস্থানের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই অপরিহার্য :

সাংবাদিকতার প্রথম শর্তগুলোর একটি হলো তথ্য যাচাই। কোনো ব্যক্তি অভিযোগ করলেই তা সত্য হয়ে যায় না। কোনো ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলেই সেটি সত্য প্রমাণিত হয় না। কোনো অডিও, ছবি বা নথি হাতে এলেই তার প্রেক্ষাপট যাচাই না করে সংবাদ প্রকাশ করা দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিচয় নয়।

পবিত্র কোরআনের সূরা আল-হুজুরাতের ৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা সতর্ক করে বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ! কোনো ফাসিক ব্যক্তি যদি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে দেখো; যাতে অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে না বসো এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও।’

এই আয়াত বর্তমান ডিজিটাল যুগে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েক মিনিটের মধ্যে একটি মিথ্যা তথ্য হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে।

তাই সাংবাদিকের দায়িত্ব হলো একটি তথ্য প্রকাশের আগে তার উৎস, প্রেক্ষাপট, সত্যতা ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য যাচাই করা।

যা শুনি, তাই প্রকাশ, এটি সাংবাদিকতা নয় :

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সতর্ক করেছেন যে, একজন মানুষের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য সে যা শুনে তাই বলে বেড়ানোই যথেষ্ট।

এই শিক্ষা সাংবাদিকতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন সাংবাদিকের কাজ কেবল তথ্য সংগ্রহ করা নয়; বরং তথ্যকে যাচাই-বাছাই করে সত্য ও প্রাসঙ্গিক অংশ জনগণের সামনে তুলে ধরা।

অর্থাৎ, শোনা কথা-সংবাদ, অভিযোগ-প্রমাণ, সন্দেহ-সত্য, ভাইরাল হওয়া-সত্যতা। এই পার্থক্য বুঝতে না পারলে সাংবাদিকতা সহজেই গুজব ছড়ানোর মাধ্যমে পরিণত হতে পারে। অভিযোগ প্রকাশ করা যাবে, তবে অভিযোগকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যাবে না।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্নীতি, অনিয়ম, প্রতারণা, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা মানুষের অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ সামনে এলে সাংবাদিকের কাজ তা অনুসন্ধান করা। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক সীমারেখা রয়েছে।

কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সংবাদে স্পষ্ট করতে হবে, এটি অভিযোগ, প্রমাণিত সত্য নয়। অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। নথি, সাক্ষ্য, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং অন্যান্য স্বাধীন উৎসের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করতে হবে। কারণ সাংবাদিকের কলম যেন আদালতের রায় ঘোষণা করার জায়গা না হয়ে যায়। একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব হলো সত্য উদঘাটনের চেষ্টা করা; কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা নয়।

ক্ষমতাবানদের প্রশ্ন করা সাংবাদিকের অপরাধ নয় :

ইসলামে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং ন্যায়ের পক্ষে কথা বলার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ফলে কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা প্রভাবশালী মহলের অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তোলা সাংবাদিকের অপরাধ নয়; বরং ন্যায়সঙ্গতভাবে সত্য অনুসন্ধান করা দায়িত্বের অংশ হতে পারে।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামে বর্ণিত একটি প্রসিদ্ধ হাদিসে অত্যাচারী শাসকের সামনে ন্যায়ের কথা বলাকে উত্তম জিহাদ বলা হয়েছে। এর মর্ম সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও গভীর তাৎপর্য বহন করে, ক্ষমতার ভয়, বিজ্ঞাপনের ভয়, মামলা-মোকদ্দমার ভয় কিংবা সামাজিক চাপের কারণে সত্যকে গোপন করা উচিত নয়।

তবে সাহসী সাংবাদিকতা কখনো দায়িত্বহীন সাংবাদিকতা নয়। সাহসের সঙ্গে সত্য বলতে হবে, কিন্তু প্রমাণ ছাড়া কাউকে অভিযুক্ত করা যাবে না।

সত্য প্রকাশে আপোষ নয়, আবার অন্যায় অপবাদও নয় :

সত্য প্রকাশে আপোষ না করার অর্থ এই নয় যে, সাংবাদিক যা ইচ্ছা তাই লিখবেন। বরং সত্যের প্রতি আপোষহীন থাকার অর্থ হলো তথ্য যতটা প্রমাণিত, সংবাদও ততটাই নির্ভুল হবে।

কোনো ব্যক্তি সাংবাদিকের ব্যক্তিগত পছন্দের না হলেও তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা লেখা যাবে না। আবার কোনো ব্যক্তি সাংবাদিকের ঘনিষ্ঠ হলেও তাঁর অপরাধ বা অনিয়ম আড়াল করা উচিত নয়। এটাই ন্যায়বিচারের দাবি।

আল্লাহ তায়ালা সূরা আল-মায়েদার ৮ নম্বর আয়াতে ন্যায়বিচারের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের ন্যায়বিচার থেকে বিরত না রাখে। ন্যায়বিচার করো; এটাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।’ এই শিক্ষা সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পক্ষপাতিত্ব সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি :

সাংবাদিক যদি কোনো রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, প্রতিষ্ঠান বা মতাদর্শের প্রতি অন্ধ আনুগত্য দেখান, তাহলে তাঁর সংবাদ বস্তুনিষ্ঠতা হারাতে পারে। একজন সাংবাদিকের কাছে ন্যায়বিচারের মাপকাঠি সবার জন্য সমান হওয়া উচিত। যে অন্যায় করেছে, সে নিজের লোক হলেও অন্যায়। আর যে নির্যাতিত হয়েছে, সে ভিন্ন মতের হলেও তার বক্তব্য শোনার অধিকার রয়েছে। সাংবাদিকের পরিচয় পক্ষের নয়, সত্যের।

সংবাদে অর্থের প্রভাব স্বার্থের সংঘাত :

সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক প্রলোভন একটি বড় নৈতিক ঝুঁকি। উপহার, অর্থ, সুবিধা, বিজ্ঞাপন, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা ভবিষ্যৎ লাভের আশায় সংবাদ পরিবর্তন করা সংবাদমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করে।

কোনো সংবাদ প্রকাশের বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ, উদ্দেশ্যমূলকভাবে কারও বিরুদ্ধে সংবাদ তৈরি করা কিংবা অর্থের বিনিময়ে কারও অনিয়ম আড়াল করা—এসব আচরণ সাংবাদিকতার মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে।

একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় সম্পদ তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা। অর্থ দিয়ে সেই বিশ্বাসযোগ্যতা বিক্রি করা হলে সাময়িক লাভ হলেও দীর্ঘমেয়াদে হারাতে হয় সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ—জনগণের আস্থা।

হলুদ সাংবাদিকতা চাঞ্চল্যকর শিরোনাম :

বর্তমান সময়ে অনলাইনে পাঠক আকর্ষণের প্রতিযোগিতা অনেক সময় সংবাদকে অতিরঞ্জিত করার প্রবণতা তৈরি করে। ক্লিক, ভিউ, শেয়ার ও ভাইরালের আশায় এমন শিরোনাম দেওয়া হয়, যা মূল প্রতিবেদনের তথ্যের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এটি সাংবাদিকতার জন্য বিপজ্জনক। একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিকের শিরোনাম হতে হবে তথ্যনির্ভর। শিরোনাম দেখে পাঠকের যে ধারণা তৈরি হবে, প্রতিবেদনের মূল তথ্যও তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। শিরোনাম যেন সত্যকে আকর্ষণীয় করে, সত্যকে বিকৃত না করে।

ব্যক্তিগত গোপনীয়তা মানুষের সম্মান :

ইসলাম মানুষের সম্মান ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক বিষয়, ব্যক্তিগত ছবি বা এমন তথ্য যা প্রকাশের মাধ্যমে তার অযথা ক্ষতি হতে পারে—তা কেবল কৌতূহল মেটানোর জন্য প্রকাশ করা নৈতিক নয়।

তবে যদি কোনো ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জনস্বার্থ, দুর্নীতি, প্রতারণা, মানুষের নিরাপত্তা বা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ সরাসরি জড়িত থাকে, তখন বিষয়টি অনুসন্ধানের প্রয়োজন হতে পারে।

এখানেও মূল প্রশ্ন হবে, এটি কি জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় তথ্য, নাকি শুধুই ব্যক্তিগত কৌতূহল? এই পার্থক্য একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিককে বুঝতে হবে।

নির্যাতিতের কণ্ঠ তুলে ধরা :

গণমাধ্যমের অন্যতম বড় দায়িত্ব হলো যাদের কণ্ঠ সমাজে দুর্বল, তাদের কথা তুলে ধরা। নির্যাতিত নারী, শিশু, শ্রমিক, দরিদ্র মানুষ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী কিংবা ক্ষমতাহীন মানুষের অভিযোগ অনেক সময় ক্ষমতাবানদের বক্তব্যের আড়ালে চাপা পড়ে যায়। তাই সাংবাদিকের দায়িত্ব শুধু ক্ষমতাবানদের বক্তব্য প্রকাশ করা নয়; বরং যার কথা শোনার মতো শক্তিশালী কোনো মাধ্যম নেই, তার বক্তব্যও যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা। তবে নির্যাতিতের পক্ষে দাঁড়ানোর অর্থ একতরফা সংবাদ প্রকাশ নয়। বরং সত্য উদঘাটনের জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য ও প্রমাণ যাচাই করাই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা।

সংবাদ প্রকাশের পর ভুল হলে সংশোধনের নৈতিকতা :

সাংবাদিক মানুষ। তাই ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকতেই পারে। কিন্তু ভুল বুঝতে পারার পর সেটি সংশোধন না করা আরও বড় সমস্যা। কোনো তথ্য ভুলভাবে প্রকাশিত হলে সংবাদমাধ্যমের উচিত যথাসম্ভব দ্রুত সংশোধনী প্রকাশ করা এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য বা প্রতিবাদ প্রকাশ করা। ভুল স্বীকার করা সাংবাদিকের দুর্বলতা নয়; বরং পেশাগত সততার পরিচয়।

সোর্সের নিরাপত্তা গোপনীয়তা :

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ তথ্যদাতা নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে চান না। কারণ তাঁর চাকরি, সামাজিক অবস্থান, নিরাপত্তা বা ব্যক্তিগত জীবনে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

তাই কোনো তথ্যদাতার পরিচয় গোপন রাখার প্রতিশ্রুতি দিলে সাংবাদিকের উচিত যথাসম্ভব তা রক্ষা করা। তবে একই সঙ্গে সাংবাদিককে নিশ্চিত হতে হবে যে, বেনামি সূত্রের তথ্য যথেষ্ট যাচাই করা হয়েছে। শুধু ‘নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ব্যক্তি বলেছেন’ এই ভিত্তিতে গুরুতর অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রকাশ করা দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়।

ছবি, ভিডিও অডিও নিয়েও সতর্কতা প্রয়োজন :

ডিজিটাল যুগে ছবি, ভিডিও ও অডিও সহজেই সম্পাদনা করা যায়। পুরোনো ভিডিওকে নতুন ঘটনার ভিডিও হিসেবে প্রচার করা, ভিন্ন ঘটনার ছবি ব্যবহার করা কিংবা সম্পাদিত অডিওকে সম্পূর্ণ বক্তব্য হিসেবে প্রকাশ করা মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। তাই সাংবাদিককে মাল্টিমিডিয়া প্রমাণের ক্ষেত্রেও উৎস, সময়, স্থান, প্রেক্ষাপট ও সত্যতা যাচাই করতে হবে। তথ্য গোপন করা যেমন অনৈতিক, তেমনি অপ্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশও ক্ষতিকর। ইসলামে সাক্ষ্য গোপন করার ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, সাংবাদিকের কাছে থাকা প্রতিটি ব্যক্তিগত তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করতেই হবে। সাংবাদিককে বিবেচনা করতে হবে, কোন তথ্য জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ এবং কোন তথ্য প্রকাশ করলে অপ্রয়োজনীয় ক্ষতি হতে পারে।

সাংবাদিকতার মূলনীতি হতে পারে, জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় সত্য প্রকাশ করতে হবে; ব্যক্তিগত কৌতূহল মেটাতে মানুষের অযথা ক্ষতি করা যাবে না।

ধর্ম, বর্ণ, জাতি পরিচয়ের ঊর্ধ্বে সংবাদ :

সত্যের কোনো ধর্ম, বর্ণ বা দল নেই। অপরাধী কে—এটি গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু তার ধর্ম, জাতি বা সামাজিক পরিচয়কে অপরাধের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয়ভাবে যুক্ত করা ন্যায়সংগত নয়। একজন সাংবাদিকের সংবাদে সব মানুষের জন্য সমান মর্যাদা থাকা উচিত। ইসলামের দাওয়াত যেমন সমগ্র মানবজাতির জন্য, তেমনি ন্যায় ও সত্যের সংবাদও কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

সাংবাদিকতা শুধু সমালোচনা নয়, সমাধানের পথও দেখাবে :

গণমাধ্যমের দায়িত্ব শুধু দুর্নীতি, অনিয়ম ও অপরাধ তুলে ধরা নয়। সমস্যার পাশাপাশি সম্ভাব্য সমাধান, বিশেষজ্ঞ মতামত, প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং জনগণের করণীয়ও তুলে ধরা প্রয়োজন। সমাজকে শুধু ভয় দেখানো নয়—সচেতন করা সাংবাদিকতার লক্ষ্য হওয়া উচিত। পবিত্র কোরআনের সূরা আন-নাহলের ১২৫ নম্বর আয়াতে প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে আল্লাহর পথে আহ্বানের নির্দেশ রয়েছে। সাংবাদিকতার ভাষাও তাই হতে পারে যুক্তিনির্ভর, মার্জিত, দায়িত্বশীল ও মানুষের কল্যাণমুখী।

সাংবাদিকের কলম যেন প্রতিশোধের অস্ত্র না হয় :

একজন সাংবাদিকের ব্যক্তিগত বিরোধ, পারিবারিক সম্পর্ক, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব বা ব্যক্তিগত ক্ষোভ সংবাদ প্রকাশের কারণ হওয়া উচিত নয়। কারও বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে ধারালো শব্দ ব্যবহার করে তাকে সামাজিকভাবে হেয় করা সাংবাদিকতা নয়; এটি ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার প্রকাশ। অন্যদিকে কারও অপরাধ বা অনিয়মের যথেষ্ট প্রমাণ থাকলে শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে সেটি আড়াল করাও অনৈতিক। অর্থাৎ, বন্ধুত্ব সংবাদকে অন্ধ করবে না, শত্রুতা সংবাদকে বিষাক্ত করবে না।

সাংবাদিকের স্বাধীনতা জবাবদিহি একসঙ্গে থাকতে হবে :

সাংবাদিকতার স্বাধীনতা গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও থাকতে হয়। ‘আমি সাংবাদিক, তাই যা ইচ্ছা লিখব’ এমন ধারণা ইসলামী নৈতিকতা তো নয়ই, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতারও পরিচয় নয়। সাংবাদিকের স্বাধীনতা মানে সত্য অনুসন্ধানের স্বাধীনতা; মিথ্যা ছড়ানোর স্বাধীনতা নয়। প্রশ্ন করার স্বাধীনতা আছে; কিন্তু অপমান করার অধিকার নেই। সমালোচনা করার অধিকার আছে; কিন্তু প্রমাণ ছাড়া অপবাদ দেওয়ার অধিকার নেই।

সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় পরিচয়, সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা :

একজন আদর্শ সাংবাদিকের কাছে সংবাদ কোনো পণ্য নয়; এটি জনস্বার্থের আমানত। তিনি ক্ষমতাবানকে প্রশ্ন করবেন, কিন্তু দুর্বলকে অন্যায়ভাবে আঘাত করবেন না। তিনি দুর্নীতি অনুসন্ধান করবেন, কিন্তু প্রমাণ ছাড়া কাউকে দুর্নীতিবাজ ঘোষণা করবেন না। তিনি অভিযোগ প্রকাশ করবেন, কিন্তু অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করবেন না। তিনি সত্য প্রকাশ করবেন, কিন্তু মানুষের ব্যক্তিগত মর্যাদা অযথা নষ্ট করবেন না। তিনি ভুল করলে সংশোধন করবেন। তিনি তথ্যের উৎসকে সম্মান করবেন। তিনি অর্থ, ভয়, রাজনৈতিক চাপ কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের কাছে সত্যকে বিক্রি করবেন না।

শেষ কথা :

সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়; এটি মানুষের কাছে পৌঁছানোর এক শক্তিশালী আমানত। একটি কলম মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দিতে পারে, আবার একটি মিথ্যা সংবাদ একটি নিরপরাধ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। তাই সাংবাদিকের প্রতিটি শব্দের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নৈতিক দায়িত্ব। ইসলামের শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সত্য বলতে হবে, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে হবে, অন্যায় থেকে বিরত রাখতে হবে এবং কোনো সংবাদ যাচাই না করে প্রচার করা যাবে না। সত্য প্রকাশে আপোষ করা যাবে না, কিন্তু সত্যের নামে অন্যায়ও করা যাবে না।

কলম হবে নির্ভীক, কিন্তু দায়িত্বশীল। সংবাদ হবে অনুসন্ধানী, কিন্তু বস্তুনিষ্ঠ। প্রতিবাদ হবে শক্তিশালী, কিন্তু ন্যায়ভিত্তিক। সমালোচনা হবে কঠোর, কিন্তু প্রমাণনির্ভর। কারণ একজন প্রকৃত সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর কলম নয়, তাঁর সততা, সত্যনিষ্ঠা ও বিশ্বাসযোগ্যতা। আর সেই বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষার দায়িত্ব সাংবাদিকের নিজের কাছেই। সত্য প্রকাশে আপোষ নেই, তবে সত্যের নামে অন্যায়ও নয়।

লেখক : মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী, গণমাধ্যম মানবাধিকার কর্মী, মৌলভীবাজার।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com