ফিরে দেখা ২০১৭ দূধর্ষ অভিযান হিটব্যাক ও ম্যাক্সিমাস॥ গুলি আর বোমার শব্দে কাঁপে মৌলভীবাজার

December 27, 2017,

ওমর ফারুক নাঈম॥ ২০১৭ সালে মৌলভীবাজারের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল পৌর এলাকার বড়হাটে অপারেশন ‘ম্যাক্সিমাস’ ও ফতেহপুর ইউপির নাসিরপুর গ্রামে অপারেশন ‘হিটব্যাক’ শ্বাসরোদ্ধকর দূধর্ষ অভিযান। স্বাভাবিক ভাবেই অন্য সব দিনের মতই ২৮ মার্চ রাতে ঘুমাতে ঘুমিয়েছিলেন সবাই। কিন্তু অন্য সব দিনের মত স্বাভাবিকভাবে ঘুম থেকে জাগা হয়নি কারোও। গুলির শব্দ আর ভয়াবহ বিস্ফোরণের আতঙ্কে ঘুম থেকে জেগে ছিলেন মৌলভীবাজারবাসী।

পরবর্তীতে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের সুয়াত বাহিনির দূধর্ষ অভিযানে পরিস্থিতি হয়েছিল শান্ত। ওই অভিযানে নিহত হয় ১০ থেকে ১১ জন জঙ্গি। অভিযানে ফোড়ফোড় গুলি আর বোমা বিস্ফোরণের শব্দে কাঁপে মৌলভীবাজার।

জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে ২৮ মার্চ মঙ্গলবার দিবাগত রাত ২টা থেকে মৌলভীবাজার পৌরসভার বড়হাট এলাকায় একটি বাড়ি এবং শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে খলিলপুর ইউনিয়নের নাসিরপুর গ্রামে আরও একটি বাড়ি ঘিরে রাখে পুলিশ।

৩০ মার্চ বৃহস্পতিবার দুপুরে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার নাসিরপুরের বাগানবাড়িতে অপারেশন “হিট ব্যাক” সম্পন্ন হয়। বিকেলে খলিলপুর ইউনিয়ন পরিষদে প্রেস বিফিংয়ে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম জানান, নাসিরপুরের জঙ্গি আস্তানার বাড়িতে ৭-৮ জন জঙ্গির ছিন্নভিন্ন মরদেহ পড়ে আছে। মৃত দেহ গুলো ক্ষতবিক্ষত থাকায় নারী, পুরুষ ও শিশু কয়জন তা নিশ্চিত করে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি।

আগেরদিন ২৯ মার্চ বুধবার সন্ধ্যায় সোয়াতের অভিযানের শুরুতে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তারা স্বপরিবারে মৃত্যু বরণ করে। নিহত জঙ্গিরা নব্য জেএমবি। আতিয়ামহলে অভিযানের সময় সংঘটিত জোড়া বিস্ফোরণের সূত্র ধরেই কাউন্টার টেরোরিজম এর গোয়েন্দারা এই আস্তানার সন্ধান পায়। প্রথমে বড়হাটের বাড়িটি চিহ্নিত হলে ওখান থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে নাসিরপুরের বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। গ্রামীণ জঙ্গি আস্তানার মধ্যে সিলেট বিভাগেই এটিই প্রথম। তবে ঘটনার সাথে সিলেটের আতীয়ার মহল, চট্রগ্রামের সিতাকুন্ড ও বিমানবন্দরে আত্মঘাতী বোমা বহনকারী যুবকের বোমার সাথে ওখানের বোমার মিল রয়েছে।

১ এপ্রিল শনিবার মৌলভীবাজার শহরের বড়হাটের জঙ্গি আস্তানায় অপারেশন ম্যাক্সিমাসে নারীসহ তিনজন নিহত হয়। ওইদিন অভিযান শেষে ঘটনাস্থলে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে মনিরুল ইসলাম জানান, নিহত জঙ্গিদের মধ্যে একজন সিলেটের আতিয়া মহলের পাশে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে মৌলভীবাজারে চলে আসে। মঙ্গলবার রাত থেকে আস্তানাটি পুলিশ ঘিরে রাখলেও বুধবার বিকেলে থেকেই র‌্যাব, পুলিশ ও অনান্যবাহিনীর পাশাপাশি পুলিশের বিশেষ ক্রাইম রেসপন্স টিমের (সিআরটি) সদস্যরা বড়হাটের জঙ্গি আস্তানার জঙ্গিদের দূর্বল করতে নানা কৌশল অবলম্বন করে।

৩১ মার্চ শুক্রবার ১০টার দিকে বড়হাটের ৩ তলার ওই বাড়িটির জঙ্গি আস্তানায় অভিযান পরিচালনা করে সোয়াত টিম। অভিযানকে কেন্দ্র করে ওই এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। বড়হাটের ওই বাড়িতে অভিযানের সময় পুরো শহর জুড়ে নামে অজানা আতঙ্ক।

ওই দিন শুক্রবার সকালে বড়হাটে পৌঁছে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের কাছে খবর রয়েছে এ জঙ্গি আস্তানায় বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক, একজন বোমা বিশেষজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত জঙ্গি রয়েছে। সে কারণেই অপারেশন শেষ করতে কিছুটা বিলম্ব হতে পারে। তখন তিনি জানান সিলেটের আতিয়া মহলের ঘটনার সূত্র ধরেই চিহ্নিত করা হয়েছে মৌলভীবাজারের বড়হাটের আস্তানা। এই অপারেশনের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ম্যাক্সিমাস’। ওই দিন দুপুর ২টার দিকে বাড়ির ভিতরে বিকট শব্দে বোমা বিস্ফোরিত হয়। বোমার আঘাতে বাড়ির দেয়াল একটি অংশ ভেঙ্গে পড়ে বলে জানা যায়। বিকেল সাড়ে ৪ টার দিকে আবারও প্রচন্ড গোলাগুলি ও বোমা বিস্ফোরিত হয়। জঙ্গি আস্তানার উপরে ধোয়া উড়তে দেখা যায়। সন্ধ্যায় প্রেস বিফিংয়ে মনিরুল ইসলাম জানান আলোস্বল্পতার জন্য রাতে অভিযান স্থগিত থাকবে।

পরদিন ১ এপ্রিল শনিবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে প্রস্তুতি নেয় পুলিশের বিশেষ বাহিনী সোয়াত। প্রায় ৩ ঘন্টা অভিযান শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন মনিরুল ইসলাম। ‘অপারেশন ম্যাক্সিমাস’ এ তিন জঙ্গি নিহত হয়েছে বলে তিনি জানান। এদের মধ্যে দুইজন পুরুষ ও একজন মহিলা রয়েছে। নিহত তিন জঙ্গির একজন একজন সিলেটের আতীয়ার মহলের বোমা বিস্ফোরনের সাথে জড়িত ছিল। এবং এই দুই অভিযান মাইলফলক হয়ে থাকবে বলে তিনি জানান।

 

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com