পৌরসভার উদ্যোগে রাস্তা সম্প্রসারণ : অল্প ছাড়ে বড় স্বস্তি : সরু রাস্তা হচ্ছে বড়

ইমাদ উদ দীন॥ যাতায়াত ও জলাবদ্ধতা দূর্ভোগের অন্ত ছিলনা। মনে হচ্ছিল এ বিড়ম্বনা থেকে রেহাই পাবনা। রোগী নিয়ে ঝামেলায় পড়তাম। এ্যাম্বুলেন্স কিংবা ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি আসতনা। এখন ছোট বড় সব গাড়িই আসবে। সামান্ন বৃষ্টিতে ঘরে পানি ঢুকতো। রাস্তায় হাটু পানি লেগে থাকতো। ঘরেও নানা সমস্যা দূর হবে আর জমির দামও বাড়বে। নিজের অল্প ক্ষতিতে সবার বড় লাভ। এমনটিই হাঁসি মুখে জানালেন শহরের পূর্ব গীর্জাপাড়া এলাকার বাসিন্দা হাজি গোলাম মোস্তফা(৭০), মুহিবুর রহমান (৩৮),ইমদাদুর রহমান (৬০) মঞ্জু গোপাল দেব (৭৫),লুৎফুন্নেছা বেগম (৫৬)।
উপরের উল্লেখিত সকলেই নিজের দেওয়াল ভেঙ্গে রাস্তা ও ড্রেনের জন্য জায়গা ছেড়ে দিয়েছেন। মৌলভীবাজার শহরের পাড়া মহল্লার ছোট রাস্তা গুলো বড় হচ্ছে। তাই চলাচলে আগের মত এখন আর ঝামেলা পোহাতে হবেনা। এ্যাম্বুলেন্স,গাড়ি, রিকশা আর আমরা। সকলেই একসাথে চলতে পারব। দীর্ঘদিন পর এই দূর্ভোগ থেকে মুক্তি পাচ্ছি। এটা অন্যরকম এক আনন্দ অনুভূতি। অল্প জায়গা ছাড় দিলাম। সবার অল্প দানে এখন দেখছি অনেক বড় রাস্তা। এখন চলাচলে সবাই স্বস্তি পাবে। এমন আনন্দ গল্প এখন পৌর শহরের এ পাড়া থেকে ওই পাড়ায়।
ধীরে ধীরে প্রতিদিনই এগিয়ে চলছে রাস্তা সম্প্রসারণের কাজ। আর এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছড়াচ্ছে পৌর বাসির সরু সড়কে চলাচলের বিড়ম্বনা থেকে মুক্তির খোশগল্প। এ যেন অল্প দানে অনেক বড় তৃপ্তি। এমনটিই জানালেন শহরের ধরকাপন এলাকার শাহ ইমরুল আক্তার কয়েস, সৈয়দ হুমায়েদ আলী শাহিন, মাওলানা সৈয়দ মাসউদ আহমদ, সৈয়দ জাহিদ আলী সহ অনেকেই। তারাও নিজের দেয়াল ভেঙ্গে রাস্তা প্রসস্ত করণে জমি দিয়ে সহায়তা করেছেন। তারা জানালেন মানুষ যে মানুষের জন্য ওই রাস্তা আর ড্রেইন গুলোই এর অন্যতম উদাহরণ। মেয়র সাহেবের ব্যাতিক্রমী এই উদ্যোগকে সবাই স্বাগত জানাচ্ছে। ব্যাপক সাড়া দিচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দারা। মানুষ নিজ হাতে তার বসত ঘরের দেওয়াল কিংবা সীমানা প্রাচীর ভেঙ্গে মূল্যবান জায়গা রাস্তা ও ড্রেনের জন্য ছেড়ে দিচ্ছে। এমন দৃশ্য অন্যরা দেখে অনুপ্রাণিত হচ্ছে। তারাও জনকল্যাণে এগিয়ে আসছে। এটি ছোট বড় সবার জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। এটি যে শুধু রাস্তা বড় হচ্ছে এমন নয়।




বাসাবাড়ির মালিকরা তাদের বড় মনেরও পরিচয় দিচ্ছেন। অনেকেরই বাসা পাড়ার সীমান্তবর্তী হওয়ায় তার জন্য এই রাস্তাটি তেমন প্রয়োজনীয় নয়। তিনি চাইলে পাশর্^বর্তী বিকল্প রাস্তা ব্যবহার করতে পারবেন। তারপরও তিনি প্রতিবেশীদের যাতায়াত অসুবিধা দূর করতে নিজ হাতে নিজের শখের (টাইলস করা) সীমানা প্রাচীর হাতুড়ি দিয়ে ভেঙ্গে মূল্যবান জায়গা রাস্তার জন্য ছেড়ে দিচ্ছেন।পূর্ব গীর্জাপাড়া (ফাটাবিল) এলাকার জয়তারা ভিলার মালিক যুক্তরাজ্য প্রবাসী নজরুল ইসলাম,একই এলাকার বাসিন্দা ফজলুর রহমান, কিশোর ভট্রাচার্য্য, রাকু সেন গুপ্ত,তপন দেব,মৌসুমী দে বলেন যেটি কখনো ভাবিনি তা চোখের সামনেই হচ্ছে।পাড়ার সরু রাস্তা গুলোর ঘা ঘেঁসে বাসাবাড়ির চকচকে দেওয়াল। কেউ নিজেদের চৌসীমানা এক ইঞ্চি মাটি ছাড় দিতে নারাজ। সকলের এমন মনোভাবে পাড়ার পথে ছোট বড় গাড়ি এমনকি হাটাচলাও কষ্ঠকর। এমন অবস্থা চলতে থাকলে আগামী প্রজন্ম কি ভয়াবহ সমস্যায় পড়বে তা এখনই টের মিলছে।
কিন্তু তারপরও কেউ কিঞ্চিত জায়গায় ছাড় দিতে অমত। ওখানকার বাসিন্দারা এটা বুঝেও ঝুঁকি নিয়ে চলে। কিন্তু পাড়ার ছোট রাস্তাটি প্রসারে উদাসীন। কারন একটাই পরের তরে দিতে হবে নিজের মূল্যবান জায়গা। এমন অসাধ্য কাজটি সাধ্যে এনেছেন মেয়র। নানা ভাবে তিনি সবাইকে নিয়ে বৈঠক করেছেন। সবাইকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছেন। মানুষের কল্যাণে মানুষকেই এগিয়ে আসতে অনুপ্রাণিত করেছেন। তার এমন যাদু মন্ত্রে বিষয়টি অনুধাবন করে সবাই এখন এগিয়ে এসেছেন। নিজ হাতে নিজেদের দেওয়াল ভেঙ্গে রাস্তার জন্য জায়গা দিচ্ছেন। তারা বলেন আমরাতো আমাদের জন্যই ঐক্যবদ্ধ হয়েছি। নিজেদের কল্যাণে এমনটি করছি। আগে যেটি করতে পারিনি সেটা হয়ত এখন করছি। বলতে পারেন দেরীতে হলেও তা আমরা অনুধাবন করতে পেরেছি। মেয়র সাহেবের ঐকান্তিক ইচ্ছায় আমাদের এমন প্রয়াস। ভালো কাজে কখনো আবদ্ধ থাকেনা। কোন না কোন ভাবেই তা বিকশিত হয়। পৌর শহরের পূর্বগীর্জাপাড়া (ফাটাবিল) এলাকায় মহল্লার সরু রাস্তা সম্প্রসারণের কাজ উদ্বোধন কালে স্থানীয় বাসিন্দারা এমনটিই জানান।
সরজমিনে সকাল থেকে একাজের উদ্বোধন ও তদারকিতে ব্যাস্ত মৌলভীবাজার পৌরসভার মেয়র ফজলুর রহমান। তার সাথে প্যানেল মেয়র ফয়ছল আহমদ পৌর কাউন্সিলর আলহাজ্ব আয়াছ আহমদ, মনবীর রায় মঞ্জু সাবেক কাউন্সিলর আশু রঞ্জন, নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল হোসেন খান, সহকারী প্রকৌশলী সৈয়দ নকিবুর রহমান, উপ সহকারী প্রকৌশলী আব্দুল মুমিন, কনজারভেনন্সি পরিদর্শক আব্দুল মতিনসহ পৌরসভার কর্মকর্তা ও কমচার্রীরা। উপস্থিত ছিলেন সদর উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান ভিপি মিজান ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যাক্তিবর্গ আর গনমাধ্যম কর্মীরা। উপস্থিত সকলেই এমন প্রশংসনীয় কাজের জন্য পৌর মেয়র, কাউন্সিলর ও স্থানীয় দানশীল ব্যাক্তিবর্গকে অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা জানান। দেখা গেল তাদের এমন কাজে সহযোগীতা করছেন স্থানীয় মহল্লাবাসীরাও। নির্দিষ্ট মাপ যোক শেষে বাড়ির সীমানা প্রাচীর নিজ হাতে ভেঙ্গে কাজের শুরু করছেন। অন্যরা এসময় দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে এই মহত কাজকে অভিবাদন জানাচ্ছেন। একের পর এক বাসাবাড়ির মালিক হাতুড়ি দিয়ে দেওয়াল ভেঙ্গে রাস্তার কাজ ত্বরান্বিত করছেন। উপস্থিত কাউন্সিলরা জানান মেয়র মহোদয়ের নেতৃত্বে আমারা সকলের সহযোগীতায় শহরের সৌন্দর্য বর্ধন ও পাড়া মহল্লার সরু রাস্তা গুলো বড় করছি। শুরুতে মানুষ কিছুটা বিব্রত হলেও এখন সবই অনেকটাই স্বতস্ফুর্ত আমাদের সহযোগীতা করছে। প্রতিটি পাড়া মহল্লায় কাজ শুরুর আগে মেয়র মহোদয় সংশ্লিষ্ট ওই এলাকার বাড়ির মালিকদের নিয়ে চা চক্রে মিলিত হন। তাদের কে নিয়ে বৈঠকের মত সবার মতামত ও পরামর্শ শুনে পৌরসভার চিন্তা ও পরিকল্পনার কথা বলা হয়। সবার স্বার্থে সরু রাস্তা বড় করতে সকলের সহযোগীতা চাওয়া হয়। এভাবে করেই এগিয়ে যাচ্ছে সরু রাস্তা বড় করার যাদু মন্ত্রের কাজ।
পৌরসভা অফিস সুত্রে জানা যায় এপর্যন্ত শহরের সরু রাস্তা বড় ও ড্রেনের কাজ চলছে পূর্ব ও পশ্চিম ধরকাপন, শেখের গাঁও, বড়কাপন, বড় হাট, ছুবরা, কাশিনাথ রোড, দীঘির পার, সার্কিট হাউজের পেছন, ছোট মাজার, গোবিন্দ্রশ্রী, বেরির চর, দরগাহ মহল্লা, সুলতানপুর, শাহ মোস্তফা ও পূর্ব গীর্জাপাড়া রোডে এই সম্প্রসারণ উন্নয়নের কাজ চলছে।
পৌর মেয়র ও জেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফজলুর রহমান বলেন একাজ আমার একার পক্ষে কখন সম্ভব ছিলনা। আমি প্রথমে সাহস করে জনকল্যাণের এ কাজ শুরু করতেই নানা বাধা বিপত্তি থাকলেও হাল ছাড়িনি। একাজে সম্মানিত নাগরিকবৃন্দ যথেষ্ট সহযোগীতা করছেন। এখন অনেক এলাকায় আগে থেকে নিজ উদ্যোগে জমির মালিকরা রাস্তার জন্য জায়গা ছাড়তে উৎসাহিত হয়ে আমাদের ডাকছেন। এটা আমার জন্য কাউন্সিলারদের জন্য আমার পৌরসভার জন্য সর্বপুরি মৌলভীবাজারের সম্মানিত নাগরিকদের জন্য অনেক সম্মানের বিষয়। আমি বিশ^াস এটি সারাদেশের মধ্যে একটি অনুকরণীয় উজ¦ল দৃষ্টান্ত হবে।



মন্তব্য করুন