সিলেটের ঐতিহ্যবাহী বাঁশের পিঠা “চুঙ্গা”

ইমাদ উদ দীন॥ শীতের পিঠা ‘চুঙ্গা’। সিলেট অঞ্চলে রেওয়াজী ঐতিহ্য। তাই শীত এলেই কদর বাড়ে এই পিঠার। আর আয়োজন হয় গ্রামে গ্রামে সিলেটীদের ঘরে ঘরে। শীতের আমেজে উৎসব আর আনন্দের মাত্রা বাড়াতে এ পিঠার জুড়ি নেই। প্রবাসী অধ্যুষিত এ অঞ্চলের প্রবাসীরা শীত মৌসুমে বাড়ি এলে আয়োজন করেন এই পিঠা উৎসবের। কারণ এই পিঠার স্বাদ আর ব্যতীক্রমী আয়োজন মন কাড়ে সকলের। খড়, বিন্নী চাল ও চাল গুড়ো আর বাঁশ। এই চার পদের উপকরণ সংগৃহিত হলে বিকেল হতেই চলে আয়োজন। রাত হলেই শুরু হয় পিঠা তৈরীর কার্যক্রম।বাড়ির আঙ্গিনায় বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরী হচ্ছে পিঠা।আর বাড়ির রান্না ঘরে তৈরী হচ্ছে ভাজা মাছ,নারকেলের মিঠা আর ভোনা মাংস। সাথে আছে দুধের মলাই, খেজুরের গুড় ও দুধের সর কিংবা খেজুর,তাল আর আখের রসের লালী (দীর্ঘ সময় আগুনে তাপ দেওয়া রস)।
সব উপকরণ প্রস্তুত হলে ডাক পড়ে খাবারের। আয়োজন,তৈরী আর খাবার। এই সব কাজেই সরব বাড়ির ছোট বড় সবাই। দলবেঁধে নানা গল্প আড্ডায় আর উৎসব আমেজে অংশ নেন সকলেই। শীতের রাতে খড়ের আগুনে বিশেষ পদ্ধতিতে তাপ দেওয়া হচ্ছে বাঁশের ভেতরে থাকা পিঠার। আর বাড়ির ছোট বড় সকলেই খড় কুটের আগুনের চার পাশে গোল হয়ে শীত তাড়াতে তাপ নেন আগুনের। বছরে এরকম একটি আয়োজনের মধ্য দিয়ে আতœীয় স্বজনসহ এলাকার সকলের সাথে যোগসূত্রতা ও আতœীয়তার বন্ধন দৃঢ় হয়। কিন্তু নানা কারণে এই ঐতিহ্য আর ধরে রাখা যাচ্ছেনা। এমনটিই জানালেন এই অঞ্চলের গ্রামীণজনপদের কৃষিজীবী লোকজন। তারা জানালেন ওখানকার গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে শীতকালের চুঙ্গা পিঠা তৈরীর এমন দৃশ্য এখন চোখে পড়ছে কম। নানা কারনে এখন কমে যাচ্ছে চুঙ্গা পিঠা খাওয়ার সিলেটীদের এমন রেওয়াজী উৎসব। তারপরও কোন রকম ঠিকে আছে হাওর ও পাহাড় ঘেরা এ অঞ্চলের ঐতিহ্য শীতে চুঙ্গা পিঠার রেওয়াজ। গেল প্রায় মাস খানেক থেকে ওখানকার স্থানীয় বাজার গুলোতে চোখে পড়ছে পাহাড়ী ঢলু বাঁশের পসরা।
শীত এলেই স্থানীয় বাজার গুলোতে হাঁট বারের দিন চোখে পড়ে পাহাড়ী ঢলু বাঁশ বিক্রির এমন দৃশ্য। আগেকার দিনের মত দোকানীরা ঢলু বাঁশের বড় পরিসরের পসরা না বসালেও এবছর অল্প করে হলেও এরকম বাঁশ বিক্রি হচ্ছে মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া,জুড়ী বড়লেখা ও কমলগঞ্জের স্থানীয় বাজার গুলোতে। কিন্তু বাজার গুলোতে হাতে গুনা কয়েকজন বিক্রেতা হলেও ক্রেতার সংখ্যা বেশি। তাই বিক্রেতারা পসরা সাজানোর আগেই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে এসকল বাঁশ। কয়েকজন বিক্রেতার সাথে আলাপে জানাগেল পাহাড়ে আর আগের মত নেই পিঠা তৈরীর বাঁশ ঢলু। তারা সারাদিন বন থেকে বনে ঘুরে ১০-১৫ আটি (এক আটিতে ২০টি পিঠা তৈরীর বাঁশ থাকে) বাঁশ সংগ্রহ করতে হিমশিম খান। যেমনটি তারা আগে ১-২ ঘন্টায় পাহাড় থেকে সংগ্রহ করতে পারতেন। এখন নানা কারণে পাহাড়ী বাঁশ,গাছ আর বন উজাড় হওয়ায় তারা মৌসুমেও প্রতিদিন তা বাজারে বিক্রির জন্য নিয়ে বসতে পারেন না। এক কুড়ি একই আকার ও আয়তনের বাঁশ (২০টি পিঠা তৈরীর বাঁশ) বিক্রি করেন ৩শ-৪শ টাকা। বিক্রেতারা জানালেন গেল পৌষ সংক্রান্তির সময় এক কুড়ি বাঁশ ৪শ-৫শ টাকাও বিক্রি করেছেন তারা।
স্থানীয় বাজার ঘুরে বিন্নী চাল পাওয়া গেলেও মেলেনী নানা জাতের দেশীয় প্রজাতির সুগন্ধী চিকন চাল। যে গুলি চুঙ্গা পিঠা তৈরীর অন্যতম উপকরণ। স্থানীয় বাসিন্ধারা জানালেন আগে বড়লেখার পাথরিয়া পাহাড়, কুলাউড়ার ষাড়েরগজ ও গাজীপুরের পাহাড়, রাজনগরের পাহাড়ী টিলার বনে, শ্রীমঙ্গলের কালাপুর পাহাড় ও জুড়ীর হলম্পা,সুরমাছড়া ও চুঙ্গাবাড়িসহ জেলার ছোট বড় পাহাড়ী টিলাগুলোতে প্রচুর ঢলুবাঁশ হতো। আর নানা জাতের সুগন্ধী ও বিন্নী ধানের চাষ হত কৃষি জমিতে। আমন ধান গোলায় তুলে বাড়ি বাড়ি এসকল চাল ঢেঁকিতে ভেঙে পিঠা তৈরির চালের গুড়া সংগ্রহ করা হতো। সেই চালের গুড়া দিয়ে শীত মৌসুমে ঘরে ঘরে উৎসব চলত পিঠাপুলির আয়োজনে।এ পিঠা স্বাদ আর সুখ্যাতি সিলেট বিভাগ ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানেও। এই পিঠার বিশেষত্ব হল বাঁশের মধ্যে থেকে এক ধরনের লোভনীয় সু-ঘ্রাণ চুঙ্গা পিঠার মাঝে পাওয়া যায়। ভাজা মাছ কিংবা ভোনা মাংসের সাথে খেতে এযেন অন্যরকম স্বাদের অনুভূতি। ঢলু বাঁশে এক ধরনের তৈলাক্ত রাসায়নিক পদার্থ থাকে যার ফলে আগুনে বাঁশের চুঙ্গাটি না পুড়ে ভিতরের পিঠা আগুনের তাপে সিদ্ধ হয়ে যায়। জানা যায় চুঙ্গা পিঠা তৈরী করতে হলে প্রথমে কলাপাতায় মুড়িয়ে ভেজানো বিন্নী চাল অথবা চালের গুড়ো (সাথে দিতে পারেন দুধ, চিনি ও নারিকেল) ঢলুবাঁশের ভিতর ভরে মুখটা কলাপাতা ও খড় দিয়ে শক্ত করে বন্ধ করে দিতে হয়।
কলাগাছের কান্ডের দুটি টুকরো অথবা ইট কিংবা মাটি দিয়ে বিশেষ চুলা তৈরী করে তার উপরে বাশের চুঙ্গাগুলো সাজিয়ে রাখাতে হয়। তারপর খড়ের আগুনে ভালো ভাবে চুঙ্গা গুলো পুড়িয়ে নিলেই চুঙ্গাটি পিঠাতে পরিনত হয়। পিঠা তৈরি হয়ে গেলে মোমবাতির মতো সাদা অংশ চুঙ্গার ভেতর থেকে পিঠা আলাদা হয়ে যায়। আগুনে পুড়ানো চুঙ্গাটি ভালো করে শুকনো কাপড় দিয়ে মুছে হাতদিয়ে কিংবা ছুরি দিয়ে আখের ছাল ছাড়ানোর মতো ছিলে নিতে হবে।ছাল ছাড়ানো হয়ে গেলে মিলে কাঙ্খিত সেই সুগন্ধ যুক্ত বাঁশে পিঠা চুঙ্গা।এখন বনদস্যু, ভুমিদস্যু এবং পাহাড়খেকোদের কারণে উজাড় হচ্ছে এ অঞ্চলের পাহাড়ী বন জঙ্গল। এরই ধারাবাহিকথায় এখন ধ্বংসের দোরগোড়ায় ঢলু বাঁশের বন। আর বেশী ফলনের আশায় প্রযুক্তি নির্ভার হাইব্রিড ধান উৎপাদনে হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় প্রজাতির বিন্নী ও সুগন্ধি ধানের চাষ। এসকল কারণেই কালের পরিক্রমায় চুঙ্গা পিঠার রেওয়াজী ঐতিহ্য ধরে রাখা দুস্কর হচ্ছে এ অঞ্চলের গ্রামীণজনপদে। জুড়ী বাঁশ মহালদার মামুনুর রশিদ মামুন মানবজমিনকে বলেন এ অঞ্চলের পাহাড়ে ঢলুবাঁশসহ নানা প্রজাতির ১৯টি বাঁশ মহাল ছিল।
শুধু জুড়ীতে থাকা ৭টি বাঁশ মহালের মধ্যে এখন কোন রকম ঠিকে আছে ৩টি। আর বাকী গুলো নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে। তিনি বলেন সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ একটু সদয় হলে কোন বিনিয়োগ ছাড়াই বাঁশ মহাল ঠিকে থাকবে আর বছরান্তে সরকার পাবে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব। স্থানীয় বাসিন্ধাদের জোর দাবী দীর্ঘদিনের এই সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে অতীত ঐতিহ্য তোলে ধরতে বিলুপ্ত হওয়ার আগেই পাহাড় গুলোতে ঢলুবাঁশের এই প্রজাতির সংরক্ষণের।



মন্তব্য করুন