বিএনপি : চেনা দৃশ্যে পরিবর্তন ॥ মান অভিমান ভুলে নেতাকর্মীরা মাঠে

February 27, 2018,

মু. ইমাদ উদ দীন॥ পেক্ষাপট বদল হয়নি। মামলা হামলার খড়গও ঝুলন্ত। তারপরও অনেকটা ঝুঁকি নিয়ে নিজেদের বদলানোর চেষ্ঠা। এজন্যই আগের চেয়ে এখন দেখা মিলছে রাজপথে। এমনটিই জানালেন জেলা বিএনপির কয়েকজন নেতা। সম্প্রতি জেলা শহরের রাজপথে অল্প পরিসরে হলেও চোখে পড়ছে বিএনপির আন্দোলন। খন্ড খন্ড ঝটিকা মিছিল কিংবা সমাবেশ। আর কেন্দ্রীয় নানা কর্মসূচী পালনে। হঠাৎ কাঙ্খিত এমন সক্রিয়তায় উজ্জীবিত দলের কর্মী,সমর্থক ও শোভাকাঙ্খিরা। আন্দোলনে নিজেদের বদলে ফেলার এমন প্রত্যয়ে কৌতুহলী জেলার সর্বমহল। বলতে গেলে এখন জেলা বিএনপির চেনা দৃশ্যে অনেকটাই পরিবর্তন। আগের চেয়ে এখন সক্রিয় নেতাকর্মীরা। আন্দোলনে মাঠে থাকছেন। কেন্দ্রীয় কর্মসূচী পালনে তৎপর হচ্ছেন। এখন আগের মত প্রেস রিলিজ নির্ভার সাংগঠনিক কাজে সীমাবদ্ধ থাকতে পচন্দ করছেন না। বরং রাজপথে মিছিল মিটিং ও সমাবেশ মুখী হচ্ছেন। অপেক্ষাকৃত তরুণদের সাথে দলের জেলা কমিটির সিনিয়র নেতৃবৃন্দরাও মাঠে থাকছেন। এতে অনুপ্রাণিত হচ্ছেন দলের নিবেদীত প্রাণ কর্মীরা। জেলা কমিটি নিয়ে গ্রুপিং দ্বন্ধ আছে। চলমান এ দ্বন্ধ নিরসন না হওয়াতে এখন তিন ভাগে বিভক্ত নেতাকর্মীরা। কিন্তু আগের মত আন্দোলনে বাধা হচ্ছেনা এই গ্রুপিং দ্বন্ধ। বরং তিন নেতার নেতৃত্বে তাদের অনুসারীরা পৃথক ভাবে পালন করছেন কেন্দ্রীয় কর্মসূচী। চলমান কেন্দ্রীয় কর্মসূচী পালনে নামে বে-নামে পুলিশি মামলা আর হামলার ভয় থাকলেও তারা ছাড়ছেন না রাজপথ। এমন দৃশ্য কয়েক মাস আগেও দেখা যায়নি জেলায়। জানা গেল দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া সিলেট সফরের সময় থেকেই এই পরিবর্তনের সূচনা। এরপর থেকেই ধীরে ধীরে মাঠে আন্দোলনে পরিচিত দৃশ্যপটে পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। জিয়া অরফানেজ ট্রাষ্ট মামলায় বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়ার সাজা হয়। রায় ঘোষণার দিন দুপুর থেকেই জেলা বিএনপির নেতাকর্মীরা রাজপথে সোচ্ছার। তাদের সাথে দলের অঙ্গ ও সহযোগি সংগঠনগুলোও। জেলা শহরে রাজপথে আন্দোলনে থাকায় উপজেলায় এর প্রভাব পড়ে। তবে জেলা জুড়ে নেতাকর্মীদের মুখে মুখে দলের দুর্দিনে প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন। তৃণমূলের কর্মীদের তরফে জোরালো দাবী উঠছে ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার। তারা বলছেন একাধিক গ্রুপে বিভক্ত হয়ে আন্দোলন করায় কেন্দ্রীয় কর্মসূচী পালিত হচ্ছে টিকই কিন্তু সাধারণ মানুষকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করা যাচ্ছে কম। তাছাড়া মিছিল মিটিং ও সমাবেশে কলেবরও বড় হচ্ছেনা। এর ফলে আন্দোলনের সফলতাও হচ্ছেনা দৃশ্যমান। তাই রাজপথের এই আন্দোলন গুলো হয়ে উঠছে অনেকটা দায়সার গুছরের। দলীয় সুত্রে জানা গেল এখন জেলা বিএনপি চলমান দু’ধারা থেকে এখন ত্রিধারায় বিভক্ত। নেতাকর্মীদের তরফে অভিযোগ উঠেছে গ্রুপিং দ্বন্ধ থাকায় সাহসিকতার সাথে রাজপথে আন্দোলন হচ্ছেনা। তেমন জোরালো ভাবে মাঠে নামতে পারছেন না নেতাকর্মীরা। এর প্রভাব পড়েছে জেলার অন্যান্য উপজেলা,পৌরসভা ও ইউনিয়নেও। বিভক্ত রয়েছে জেলার ৭টি উপজেলা, ৫টি পৌরসভা ও ৬৭টি ইউনিয়ন কমিটিও। তবে অনেক নেতাকর্মী জানান দলের দ্বন্ধের কারনে নয়, রাজনৈতিক একাধিক মিথ্যা মামলায় অনেক নেতা কর্মী নিস্ক্রিয় হয়ে বাড়ি-ঘর ছেড়ে অন্যত্র আছেন। তারাও মাঠে আসতে শুরু করছেন। তাদের প্রত্যাশা এখন রাজপথে দেখা মিলবে নেতাকর্মীদের। সবাই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে বদ্ধপরিকর হচ্ছেন। এখন এমন প্রচেষ্ঠা চলছে দলের ভেতরেও। তারা জানালেন দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের জেলা ও উপজেলা কমিটিতে মূল্যায়ন না করায় মান অভিমান থেকে দ্বন্ধ সৃষ্টি হচ্ছে। জানাগেল আগে জেলা বিএনপি দু’ধারায় বিভক্ত থাকলেও এখন তিন ভাগে বিভক্ত। একপক্ষ কোন কর্মসূচি ঘোষণা দিলে অপর পক্ষের নেতাকর্মীরা কর্মসূচির স্থান ও সময় প্রশাসনকে জানিয়ে দিচ্ছেন। যার কারণে নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হওয়ার আগেই পুলিশ এসে উপস্থিত হচ্ছে। এ কারণে কেন্দ্রীয় সকল কর্মসূচি পালন করা তাদের জন্য কষ্ঠকর হচ্ছে। দলীয় সূত্র জানায়, বর্তমানে জেলা বিএনপির একটি বলয়ের নেতৃত্ব দিচ্ছেন জেলা সভাপতি ও সাবেক এমপি এম নাসের রহমান। অপর দুটি অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাধারণ সম্পাদক ও সদর উপজেলার চেয়ারম্যান ভিপি মিজানুর রহমান মিজান এবং সম্প্রতি সাবেক ২ বারের পৌর মেয়র ও জেলা বিএনপি’র সহ-সভাপতি ফয়জুল করিম ময়ূন। জানা যায়, দীর্ঘ ৮ বছরের গ্রুপিং এর অবসান ঘটিয়ে ২০১৭ সালের ২৫ মে বিএনপির মহাসচিব স্বাক্ষরিত প্যাডে ৪৮ সদস্য বিশিষ্ট মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির নতুন (আংশিক) কমিটি ঘোষণা করা হয়। ওই কমিটিতে বিবাদমান দু’গ্রুপ থেকেই সভাপতি ও সাধারন সম্পাদক মনোনিত হন। জেলার তৃণমূলের নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা ছিল দীর্ঘ ৮ বছরের চলমান এ দ্বন্ধের অবসান হবে। কিন্তু কমিটি ঘোষণার পর নতুন করে পুরনো দ্বন্ধ আবারো প্রকাশ্যে রুপ পেয়েছে। এখন আবারো পৃথক ভাবে পালিত হচ্ছে কেন্দ্রীয় কর্মসূচী। কেন্দ্রীয় ঘোষিত জেলা কমিটিতে সঠিক মূল্যায়ন না হওয়ায় মান অভিমানে দলীয় সকল কার্যক্রম থেকে নিজেকে অনেকটাই গুটিয়ে নিয়ে ছিলেন সাবেক জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রিয় সাবেক পৌর মেয়র ফয়জুল করিম ময়ূন। বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর থেকে তিনি নিজের একটি বলয় সৃষ্টি করে নেতাকর্মী নিয়ে মাঠে রয়েছেন আন্দোলনে। তিনি আলাদা ভাবে কেন্দ্রীয় কর্মসূচী পালন করায় চলামান দ্বন্ধ আরো প্রকাশ্যে রুপ নিল। তবে জেলা কমিটির অধিকাংশ নেতা আশ্বশÍ করে বলছেন দ্বন্ধ নিরসনে তারা কাজ করছেন। খুব শিগগিরই সবাই একমঞ্চে বসবেন। একসাথে কেন্দ্রীয় কর্মসূচীও রাজপথে পালন করবেন। এবিষয়ে জেলা বিএনপির সহ সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র ফয়জুল করিম ময়ূন বলেন জেলা কমিটি নিয়ে অনেকের মত আমারও মান অভিমান ছিল। দলের একজন নিবেদীত কর্মী কখনো দূর্দিনে ঘরে বসে থাকতে পারেনা। দলের চেয়ারপার্সন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত মামলায় জেল খাটবেন। আর তার প্রতিবাদে মাঠে আন্দোলন না করে ঘরে বসে থাকি কি করে। তিনি দ্বন্ধ নিরসনে কেন্দ্রীয় কমিটির হস্তক্ষেপ চান। একই সাথে দলের নিবেদীতদের কমিটিতে নেওয়ার জোর দাবী জানান। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ভিপি মিজানুর রহমান বলেন কমিটি ঘোষণার পর থেকে দ্বন্ধ নিরসনের প্রচেষ্ঠা অব্যাহত রয়েছে। আশাকরি এই দ্বন্ধ চলমান থাকবেনা। দলের দূর্দিনে সকলের ঐক্যবদ্ধ থাকার প্রয়োজন। জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক বকসী মিছবাউর রহমান বলেন জেলা বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম আগের চাইতে এখন অনেকটাই উন্নতি হয়েছে। দলের চেয়ারপার্সন কারাগারে তাই এই মুহুর্তে দলাদলির বিষয়টি মূখ্য নয়। বড়দল তাই সবাই পদপদবী পাননা এনিয়ে নেতাকর্মীদের মান অভিমান থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। তিনি বলেন জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক এমপি এম. নাসের রহমানও দলের নেতাকর্মীদের মান অভিমান দূর করে ঐক্যবদ্ধ করতে প্রচেষ্ঠা চালাচ্ছেন। নেত্রী কারাগারে থাকায় নেতাকর্মীদের মনে সাংগঠনিক কাজে যে আবেগ ও আন্তরিকতা সৃষ্টি হয়েছে তা ধরে রেখে মান অভিমান দূর করার চেষ্ঠা চলছে। জেলা ছাত্রদলের আহবায়ক ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহ সাংগঠনিক সম্পাদক জাকির হোসেন উজ্জ্বল বলেন অভিভাবক সংগঠন বিএনপির ভেদাভেদ দূর হলে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন গুলো চাঙ্গা হয়ে উঠবে। আমরা চাই খুব শিগগিরই চলমান গ্রুপিং দ্বন্ধ নিরসন হবে।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com