সেচের অভাবে শ্রীমঙ্গলে নষ্ট হয়ে গেছে কয়েশ একর জমির ফসল

April 12, 2020,

শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি॥ চা বাগান অধ্যুষিত শ্রীমঙ্গলে যে স্বল্প পরিসরে কৃষি চাষাবাদ হয় তা এখানকার হাইল হাওর কেন্দ্রিক। অবারিত পানির উৎস হাইল হাওরের দু’পাশে বিস্তুৃর্ণ অঞ্চলে ধান ও রবি শস্য ফলিয়ে আশপাশের মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। বছরের এই সময়ে বোরো মৌসুমে হাওরের দু’পাশ সোনালী ধানে ভরে উঠে। কিন্তু এবার তার ব্যতিক্রম হতে চলেছে। এখানকার প্রান্তিক চাষিরা বলেছেন, পানির অভাবে প্রায় কয়েক শত একর ধানের চারা নষ্ট হতে বসেছে। শুকিয়ে যাওয়া মাটি ফেঁটে চৌঁচির। এই সময়ে ধান গাছে ফুল এসেছে কিন্তু, পানির অভাবে এসব ধান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অনেক জায়গায় ধানের চারা মরে গেছে। তারা বলেছেন, চলতি করোনা মহামারির কারণে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চিন্তায় এই ধানের উপর তারা আশার বীজ বপন করেছিলেন। এখন তাদের সব স্বপ্ন ধুলায় মিশে যেতে বসেছে।

শুক্রবার সরেজমিন হাইল হাওর পরিদর্শনে জানা গেছে, শ্রীমঙ্গল উপজেলার সদর ইউনিয়নের হাইল হাওরের উত্তরসুর অংশে শতাধিক কৃষক এক ফসলা জমিতে বোরো ধান চাষ করে জীবিকা নির্বাহ হরে আসছে। পাশে হাওর থাকায় নিজেদের উদ্যোগে তারা পানি ব্যবস্থানায় জমিতে সেচ দিতেন। স্থানীয় কৃষকরা জানান, সেকেলে পানি সেচ  ব্যবস্থানায় প্রযুক্তি ও সহজ করতে সরকার গেল ৫ বছর আগে হাওরের অদূরে প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যায়ে একটি রাবার ড্যাম নির্মাণ করে। প্রথম কয়েক বছর এ থেকে সুফল পেলেও এই ড্যাম এখন এ অঞ্চলের দরিদ্র কৃষকদের গলার কাটায় রূপ ধারণ করেছে। ড্যাম নির্মাণের পর পানি ব্যবস্থাপনার শৃংখলা আনতে লংলা নদী সমবায় সমিতি একটি সমিতি গড়ে তোলা হয়। ভুনবীর ইউপি চেয়ারম্যান চেরাগ আলী এই সমিতির সভাপতি আর সেক্রেটারী স্থানীয় ইউপি সদস্য দুদু মিয়া।

স্থানীয় কৃষক নেপাল বৈদ্য জানান, এখানে ১৪ কেয়ার জমিতে তিনি এবার বোরো লাগিয়েছেন। কিন্তু পানির অভাবে ৪-৫ কেয়ার জমির ফসল পুড়ে গেছে। তার অভিযোগ, বোরোর ফসলের এই পানি পাশের ব্র্যাক মাছের খামারে বিক্রি করছে সমিতি। সামনে করোনা থেকে খাদ্য সংকট দেখা দিলে এই ফসলে পরিবার পরিজন নিয়ে দুবেলা খেয়ে পড়ে বেচে থাকতে পারতাম। ফসল নষ্ট হলে এখন তো বউ ছেলে নিয়ে পথে বসতে হবে আমাদের -জানালেন নেপাল।

২২ কেয়ার জমিতে এবার বোরো চাষ করে বিপাকে পড়েছেন আরেক কৃষক ওমর আলী। তিনি বলেন, গেল ১ মাস ধরে ধর্ণা দিয়ে পানি পাচ্ছে না। ধানের চারায় এসময় ফুল এসেছে আর সেই সময়ে পানির অভাবে চারা শুকিয়ে ধুসর বর্ণ ধারণ করছে। তিনি বলেন এই ফসল ঘরে তুলতে না পারলে আমরা খাব কি?

একই এলাকার ইন্নান মিয়া জানান ১২ কেয়ার জমিতে এবার বোরোব আবাদ করেছেন। জমি তৈরী, বীজ, চারা রোপন, সার ও পরিচর্যা করে এ পযর্ন্ত চারা বড় করতে সব খরচ করে ফেলেছেন। সরকার থেকে কোন সহায়তাও পাওয়া যায়নি। এখন পানির অভাবে এই শস্য ঘরে তুলতে না পারলে পরিজন নিয়ে অভুক্ত থাকতে হবে। এইক অবস্থা এই এলাকার রহমত আলী, মিন্টু বৈদ্য, মাঃ মইনুদ্দিন, ছবির মিয়া, মংগল মিয়া, ফয়জুল্লাহ, ওমর মিয়াসহ আরোও অনেক প্রান্তিক কৃষকের। তারা জানান, ড্যামের অপর অংশে বিলাশের পারে ফসল নেই এমন জমিতে ও বিভিন্ন ফিসারীতে পানি বিক্রি করা হচ্ছে। অথচ কৃষিকাজের জন্য নির্মিত সরকারী এই ড্যামের পানি থেকে কৃষকরাই বঞ্চিত হচ্ছেন।

এ ব্যাপারে গত ৯ এপ্রিল স্খানীয় কৃষকগণ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বরাবর সেখাসে পানি সেচের দাবীতে একটি লিখিত আবেদন করেন।

এব্যাপারে স্থানীয় ইউপি সদস্য দুদু মিয়া বলেন, আশিদ্রোন, উত্তরসূর ও ভূনবীর এলাকায় এই ড্যামের পানি বন্টন করা হয়। কিন্তু এবার খরার কারনে গোপলা নদীর পানি প্রবাহ কমে গেছে। একই সাথে চারিদিকে পানির চাহিদা বেড় যাওয়ায় এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন ২-১ দিনের মধ্যে এ সমস্যা কেটে যাবে। ড্যাম অপারেটর সুরুক মিয়াও একই ভাবে খরাকে দুষছেন। বলেন, পানির জন্য এতদিন কেউ তার কাছে আসেনি। এখন খরার কবলে পড়ে সব জায়গা থেকে পানির চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় সাময়িক এই সমস্যা দেখা দিয়েছে। ড্যামের পানি মাছের খামারে বিক্রির বিষয়ে জানতে চাইলে সুরুক মিয়া বলেন, আগে দিয়েছি এখন বন্ধ। তিনি জানান সমিতির সদস্যরা পানির মূল্য হিসেবে কেয়ার প্রতি আধামন করে ধান দেয়ার কথা, কিন্তু বেশীর ভাগ কৃষক তাও দেন না। ড্যামের রক্ষনাবেক্ষনে রশিদ মূলে ব্র্যাক ফিসারীতে ৩০ হাজার টাকায় কিছু পানি বিক্রি করা হয়েছিল বলে তিনি জানান।

এ ব্যাপারে শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিলুফার ইয়াসমিন শনিবার দুপুরে বলেন, ‘এবার তো বৃষ্টি নেই। ফলে বিলাসের উৎসমূখে পানি কম আসছে। তাছাড়া ড্যাম থেকে উত্তরসূর পর্যন্ত কয়েক কিলোমিটার পথে প্রপার কোন ড্রেন নেই। অনেক স্থানে সংস্কার অভাবে ড্রেন মুখ বন্ধ হয়ে গেছে। এ কারণে পানি যেতে অনেকটা সময় লাগে। তিনি বলেন, ইউপি সদস্য দুদু মিয়া ও ড্যাম দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা সুরুক মিয়াকে বলে দিয়েছি, যতদ্রুত সম্ভব পানি প্রবাহের সব প্রতিবন্ধকতা দূর করে ক্ষতিগ্রস্থ জমিতে সেচের পানি দেয়ার জন্য। এছাড়া বিলাসে দিকে যে সমস্ত জমিতে আবাদ নেই অথচ পানি চলে যাচ্ছে তা বন্ধ করতে বলেছি’। তিনি জানান এবার শ্রীমঙ্গলে ৯ হাজার ৪শ’ ১২ হেক্টর জমিতে বোরো চাষাবাদ হচ্ছে। গত বছর এই জমির পরিমান ছিল ৯ হাজার ৩শ’ ৯৫ হেক্টর।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com