কুলাউড়ায় এলজিইডির প্রকৌশলীকে অপসারণের দাবিতে ১৩ চেয়ারম্যানের অভিযোগ

July 25, 2022,

মাহফুজ সাকিল॥ কুলাউড়ায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) উপজেলা প্রকৌশলী মোঃ আমিনুল ইসলাম মৃধার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও দূর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলীকে অনতিবিলম্বে কুলাউড়া থেকে অপসারণের জন্য উপজেলার ১৩ ইউপি চেয়ারম্যান একাট্টা হয়ে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বরাবরে একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। যার অনুলিপি স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ এলজিইডি’র বিভিন্ন দপ্তরে প্রেরণ করা হয়েছে। অন্যদিকে ওই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মেরামত কাজে প্রধান শিক্ষকদের কাছ থেকে ঘুষ দাবিসহ বিভিন্ন হয়রানীর প্রতিকার চেয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকবৃন্দ উপজেলা চেয়ারম্যান বরাবরে আরেকটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
এদিকে ২৪ জুলাই রোববার উপজেলা পরিষদের মাসিক সাধারণ সভায় সংসদ সদস্য সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ, উপজেলা চেয়ারম্যান একেএম সফি আহমদ সলমান ও ইউএনও মাহমুদুর রহমান খোন্দকারের উপস্থিতিতে এলজিইডি প্রকৌশলী আমিনুল ইসলাম মৃধাকে বক্তব্য দেয়ার সুযোগ দিলে সভায় এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে হট্টগোল বাঁধে। এসময় উপজেলার কাদিপুর ইউপি চেয়ারম্যান জাফর আহমদ গিলমান ও ভাটেরা ইউপি চেয়ারম্যান সৈয়দ একেএম নজরুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে তাদের বক্তব্যে বলেন, উপজেলা প্রকৌশলী আমিনুল ইসলাম একজন ঘুষখোর ও দূর্নীতিবাজ কর্মকর্তা। তাকে সভায় বক্তব্য দেয়ার সুযোগ দিলে আমরা চেয়ারম্যানবৃন্দরা সাধারণ সভা বয়কট করবো। ইতিপূর্বে আমরা প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিষয়ে অভিযোগ এনে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। তাকে অপসারণ না করা পর্যন্ত আমরা আগামীতে পরিষদের কোন সভায় অংশগ্রহণ করবো না।
এসময় এমপি সুলতান মনসুর ও উপজেলা চেয়ারম্যান সফি আহমদ সলমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ইউপি চেয়ারম্যানদের আশ^স্ত করে বলেন, উপজেলা প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে সকল চেয়ারম্যানবৃন্দ ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ যে অভিযোগ এনেছেন তা আমরা প্রশাসনিকভাবে এলজিইডি’র উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে অবহিত করবো। তারা তদন্তক্রমে তাঁর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
১৩ ইউপি চেয়ারম্যানের লিখিত অভিযোগ থেকে জানা যায়, জামায়তপন্থী আমিনুল ইসলাম মৃধা ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কুলাউড়ায় যোগদানের পর থেকে ইউনিয়ন পরিষদের উন্নয়ন কাজের প্রাক্কলন প্রণয়নে, প্রকল্প বাস্তবায়নে, এডিপির প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে বিভিন্ন অজুহাতে সময়ক্ষেপণ, স্বেচ্ছাচারিতা, নথি স্বাক্ষরের দীর্ঘসূত্রতা, হুয়রানী ও অসদাচরণ করে আসছেন। ঘুষের টাকা না দেওয়া পর্যন্ত তিনি কোন বিলপত্রে/কাগজে স্বাক্ষর করেন না। কোন কাজে বার বার ফোন দিলে চেয়ারম্যান-মেম্বারদের ফোন রিসিভ করেন না। তাঁর এমন অসদাচরণ, দূর্নীতি, ঘুষ ছাড়া নথি ছাড়, টাকার বিনিময়ে স্ক্রীম পরিবর্তন, পরিবর্ধন এবং স্বেচ্ছাচারিতার বিষয়ে ভুক্তভোগী হওয়ার পর উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে মৌখিকভাবে বিষয়টি অবহিত করার পর তারা কাজের বিল পান। জনপ্রতিনিধি হিসেবে নূন্যতম সম্মান তাঁর কাছ থেকে পাননি বলে অভিযোগে উল্লেখ করেন চেয়ারম্যানগণ।
এদিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মেরামত কাজে দুই লক্ষ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে কাজের প্রাক্কলন ও প্রত্যয়ন দিতে স্কুল প্রধান শিক্ষকদের কাছ থেকে ৫-১০ হাজার টাকা দাবি করে হয়রানি করে আসছেন বলে অভিযোগ করেন শিক্ষকরা। আর সরকারি অফিসে এসি না থাকায় অনেক সময় ওই প্রকৌশলী কুলাউড়া পৌর শহরের তাঁর পছন্দের এক ঠিকাদারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বসে অফিসের দাপ্তরিক কাজ চালান। অফিস চলাকালীন সময়ে উপজেলা প্রকৌশলী অফিসিয়াল পোশাক না পড়ে নিয়ম না মেনে নিজের পছন্দমত টিশার্ট (গেঞ্জি) পরিধান করেন। যার কারণে গত দুই মাস আগে এলজিইডি’র সিলেট অঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী গোপাল কৃষ্ণ দেবনাথ কুলাউড়ায় বিভিন্ন কাজ পরিদর্শনে আসলে উপজেলা প্রকৌশলী আমিনুল ইসলামকে অফিসিয়াল পোশাক না পড়ে গেঞ্জি পরিহিত অবস্থায় দেখতে পেয়ে ধমক দেন এবং দুই মিনিট দাঁড় করিয়ে রাখেন।
কুলাউড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও বিএইচ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল কাইয়ুম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, উপজেলার সব প্রাইমারী স্কুলের মেরামত কাজে প্রাক্কলণ ও প্রত্যয়নপত্র দিতে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা দাবি করেন। আমার ৩৫ বছরের শিক্ষকতা জীবনে এ ধরণের ঘুষখোর ও দূর্নীতিবাজ অফিসার কখনো দেখিনি।
উপজেলা প্রকৌশলী আমিনুল ইসলাম মৃধা তাঁর বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, চেয়ারম্যান ও শিক্ষকদের অভিযোগগুলো সঠিক নয়। ইউপি চেয়ারম্যানদের সাথে আমার তেমন কোন কাজ নেই, আমার কাজ উপজেলা পরিষদের সাথে। অফিসিয়াল পোশাকের বিষয়ে তিনি বলেন, সিলেটের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী একদিন গেঞ্জি পরিধানের জন্য আমাকে শাসিয়ে ছিলেন এরপর থেকে অফিসে অফিসিয়াল পোশাক পরি।
উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান একেএম সফি আহমদ সলমান বলেন, উপজেলা প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে সকল ইউপি চেয়ারম্যান ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দসহ আরো কয়েকটি পৃথক পৃথক অভিযোগ পেয়েছি। রোববার মাসিক সাধারণ সভায় বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা হয়েছে। অভিযোগের বিষয়টি সভার রেজুলেশনে নথিভুক্ত করে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য এলজিইডি’র উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সিলেট অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নির্মল কুমার বিশ^াস মুঠোফোনে বলেন, একজন উপজেলা প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে এত অভিযোগ শুনে খুবই আশ্চর্য্য হলাম। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে খুবই দ্রুত উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com