এনডিএফ’র প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ডাঃ এম. এ. করিম এঁর ৪র্থ মৃ/ত্যু/বার্ষিকী পালন

স্টাফ রিপোর্টার : প্রবীণ রাজনীতিবিদ জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট-এনডিএফ প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ, আমলা মুৎসুদ্দি পুঁজিবিরোধী জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের আপসহীন, অকুতোভয়, দৃঢ়চেতা, সাহসী জননেতা এবং সাপ্তাহিক সেবা পত্রিকার সম্পাদক ডাক্তার এম. এ. করিম-এঁর ৪র্র্থ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট-এনডিএফ মৌলভীবাজার জেলা শাখার উদ্যোগে ৪ নভেম্বর সন্ধ্যায় এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
শহরের চৌমুহনা এলাকায় সংগঠনের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা এনডিএফ সহ-সভাপতি মো: নুরুল মোহাইমীন। জেলা এনডিএফ’র সাধারণ সম্পাদক রজত বিশ্বাসের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সহ-সভাপতি মো: সোহেল মিয়া, এনডিএফ নেতা তারেশ চন্দ্র দাস, মৌলভীবাজার জেলা হোটেল শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো: শাহিন মিয়া, মৌলভীবাজার জেলা রিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি মো: গিয়াস মিয়া, শ্রমিকনেতা জামাল মিয়া, মিজান মিয়া প্রমূখ।
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন ত্রিকালদর্শী রাজনীতিবিদ ডা. এম এ করিম এক জীবন্ত ইতিহাসের অগ্রসেনা ও ইতিহাসের কালপঞ্জী ছিলেন। প্রায় ৮ দশক জুড়ে ছিল তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের সুদূর প্রসারী কর্মতৎপরতা ও সাধারণ মানুষের চিকিৎসা সেবায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি জগন্নাথ কলেজে ভিপি, পাকিস্তান রেড ক্রিসেন্টের প্রথম নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ’৪৬-এ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধ আন্দোলন, ছাত্র আন্দোলন, ’৫৪ নির্বাচনসহ সর্বত্রই তাঁর বিচরণ ছিল। আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন, ন্যাপ গঠন, যুবলীগ গঠন সর্বত্রই তিনি ছিলেন সরব। ১৯৬২ সালে বিনা পরোয়ানায় তাঁকে গ্রেফতার করে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে বিনা বিচারে ৫ মাস আটকে রাখা হয়। জেল জীবনের স্মৃতিকথা তিনি ‘ঢাকা সেন্ট্রাল জেল; নানান রঙের দিনগুলি’ গ্রন্থে তুলে ধরেছেন, যেখানে তিনি এদেশের রাজনীতির ইতিহাসের অনেক অজানা কথা পাঠকদের সামনে নির্মোহভাবে তুলে ধরেছেন। বিশ্বপরিসরে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট বিতর্কেও তিনি সব সময় সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থরক্ষাকারী সুবিধাবাদী ক্রশ্চেভ সংশোধনবাদ, তিন বিশ্ব তত্ত্ব ও মাওসেতু চিন্তাধারাসহ সকল প্রকার সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে তার অবস্থান ছিল স্পষ্ট ও দৃঢ়। রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে অনেকের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা হলেও আদর্শ ও রাজনৈতিক প্রশ্নে তিনি সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক বিপ্লবী বিকল্পধারা প্রতিষ্ঠায় তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে এতটুকু দ্বিধা করেননি। এখানেই ছিলেন ডাঃ এম এ করিম অনন্য ব্যতিক্রম। এদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে তিনি সাম্রাজ্যবাদের মুনাফা লুটার বাজার হিসেবে দেখতেন। তাই তিনি গণমুখী স্বাস্থ্যনীতি হিসেবে বুঝতেন সাম্রাজ্যবাদ সামন্তবাদ আমলা মুৎসুদ্দি পুঁজি তথা সকল প্রকার শোষণ-শাসনমুক্ত স্বাস্থ্য ও সমাজ ব্যবস্থাকে। আর তাই চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে এগিয়ে নেয়ার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন।
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন সমগ্র পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থা এক গভীর ও সামগ্রিক সংকট, দ্বন্দ্ব-সংঘাতময় এবং উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। চলমান বাণিজ্যযুদ্ধ, মুদ্রাযুদ্ধ, আঞ্চলিক ও স্থানিক যুদ্ধের প্রক্রিয়ায় তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে। আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে বিশ্বযুদ্ধের সম্ভবনা মূর্ত হয়ে উঠেছে। তাদের এই যুদ্ধ প্রস্তুতি থেকে আমাদের দেশও মুক্ত নয়। বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক ও রণনীতিগত সামগ্রিক গুরুত্বের প্রেক্ষিতে একক পরাশক্তি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নেতৃত্বে পাশ্চাত্য এবং প্রতিপক্ষ সাম্রাজ্যবাদী চীন এদেশকে স্ব স্ব পক্ষে যুদ্ধে সম্পৃক্ত করতে চায়। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর চাপ কৌশলে বিদ্যমান ১৫% শুল্কের সাথে আরও ২০% শুল্ক বৃদ্ধি করায় বাংলাদেশকে ৩৫% শুল্ক (পোষাকখাতে ৩৬.৫%) দিয়ে রপ্তানি করতে হবে। তদুপরি মার্কিনের বিশ্বস্ত দালাল মো. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি পণ্য বিশ্ব বাজারের চেয়ে বেশি দামে গম, তুলা, এলএনজি আমদানি ও বোয়িং বিমান কেনাসহ বাণিজ্য আলোচনায় প্রকাশ না করার নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট (এনডিএ) এর মতো জাতীয় স্বার্থ বিরোধী চুক্তি করে। এ লক্ষ্যে মার্কিনের পরিকল্পনায় বার্মা অ্যাক্ট, মানবিক করিডোর প্রদান, চট্টগ্রাম বন্দরকে মার্কিন নৌবাহিনীর সাথে সম্পর্কিত ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা প্রদান, ঢাকায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের অফিস স্থাপন, স্টারলিংকের ইন্টারনেট চালু, মার্কিনের সাথে ধারাবাহিক যৌথ সামরিক মহড়া, মার্কিন সেনা উপস্থিতি ও ঘাঁটি নির্মাণের অপতৎপরতা ইত্যাদি জাতীয় স্বার্থবিরোধী পদক্ষেপ অন্তর্বর্তী সরকার গ্রহণ করে চলেছে। এর বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভ বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ ও দমনে চট্টগ্রাম বন্দর এলাকায় সভা, সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। এ সময়ে সরকার গঠনে নির্বাচন ইস্যুতে মার্কিনপন্থী দলগুলো পরস্পর বিরোধী বক্তব্য ও কৌশল গ্রহণ করে জনগণকে বিভ্রান্ত করার যত অপতৎপরতা চালাক না কেন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তার স্বার্থের সবচেয়ে উপযোগীদেরই ক্ষমতায় আনবে। যারা ক্ষমতাসীন হবে তারা এই অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় ও জনস্বার্থ বিরোধী কাজকে বৈধতা দেবে। এই নির্বাচন ও সরকার গঠনে শ্রমিক-কৃষক-জনগণের কোন লাভ নেই। তাই বিদ্যমান নয়াউপনিবেশিক আধাসামন্তবাদী সমাজ কাঠামো অক্ষুন্ন রেখে সাম্রাজ্যবাদের এক দালালের পরিবর্তে আরেক দালাল বা এক সাম্রাজ্যবাদের পরিবর্তে আরেক সাম্রাজ্যবাদের দালাল ক্ষমতাসীন হলেও জনগণের কোন মৌলিক পরিবর্তন হবে না। তাই জননেতা ডা. এম এ করিমের দেখিয়ে দেওয়া পথে সকল সাম্রাজ্যবাদ ও তার দালালদের বিরুদ্ধে জাতীয় গণতান্ত্রিক সংগ্রামকে বেগবান করে শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষের সামগ্রিক মুক্তির লক্ষ্যে জাতীয় গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অগ্রসর হতে হবে।
আমৃত্যু সংগ্রামী এই জননেতা ২০২১ সালের ৪ নভেম্বর ৯৮ বছর বয়সে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।



মন্তব্য করুন