বিএসএফের বাঁধায় বন্ধ থাকা মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ দিয়ে লোকালয়ে পানি

মাহফুজ শাকিল : টানা কয়েকদিনের অবিরাম বৃষ্টি ও ভারত থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার মনু নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। নদীর প্রবল স্রােত ও পানির উচ্চতা বাড়তে থাকায় নদী তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এদিকে বুধবার গভীর রাতে পৃথিমপাশা ইউনিয়নের শিকড়িয়া এলাকায় বিএসএফের বাঁধায় বন্ধ থাকা মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের ভাঙ্গনকৃত স্থান দিয়ে ফের পানি লোকালয়ে প্রবেশ করেছে। এতে স্থানীয় শিকড়িয়া,গনকিয়াসহ আশপাশের কয়েকটি এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে অনেক মানুষের বসতবাড়ি পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে বলে জানা গেছে। এদিকে সীমান্তবর্তী শরীফপুর ইউনিয়নের কালারায়ের চর, নিশ্চিন্তপুর, ছারিয়াঘাট (হাসারকোনা) এলাকায় বাঁধের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় ২০-২৫টি বসতবাড়ি পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। এরমধ্যে কয়েকটি কাঁচাঘর ভেঙ্গে পড়েছে। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য জয়নুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
সরেজমিনে পৃথিমপাশা ইউনিয়নের শিকড়িয়া বেঁড়িবাঁধ এলাকায় দেখা যায়, ২০২৪ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ প্রায় ১০০ ফুট ভাঙ্গনের কাজ এখনো শুরু হয়নি বিএসএফের বাঁধায়। কিন্তু কয়েক মাস আগে সীমান্তের ওপারে ভারতের মাগুরউলি, দেবীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় কাটাতার ঘেষে বেড়িবাঁধে বিএসএফের উপস্থিতিতে কাজ করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল হান্নান (৪৫), রজব আলী (৫০) ও রমিজ আলী (৫৬) বলেন, “গতবছরও মনু নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পৃথিমপাশা ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছিল। বিশেষ করে শিকড়িয়া গ্রামে ভারতের বিএসএফের বাঁধায় বন্ধ থাকা মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধে বুধবার রাতে ফের পানি প্রবেশ করে। এই বাঁধ যদি সরকার দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ না নেয় তাহলে আবারো মনু নদীর পানি বৃদ্ধি পেলে এই বাঁধ দিয়ে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করবে। এতে আমাদের বাড়িঘর ও কৃষিজমির ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। আমরা সরকারের কাছে দ্রুত ভাঙা বাঁধটি পুন নির্মাণের জোর দাবি জানাচ্ছি।
স্থানীয় বাসিন্দা ফয়জুল হক, মখলিছ মিয়া, আতিক মিয়া বলেন, ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট ভয়াবহ বন্যায় উপজেলার টিলাগাঁও ইউনিয়নসহ আশপাশের কয়েকটি ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক গ্রামের কয়েক শতাধিক মানুষের ঘর-বাড়ি ক্ষতিগ্রস্থ হয় এবং হাজার হাজার একর ফসলি জমি নদীর পানিতে তলিয়ে যায়। এর আগেও ২০১৮ সালের বন্যায় উপজেলার টিলাগাঁও, হাজীপুর, শরীফপুর ও পৃথিমপাশা ইউনিয়নে অর্ধ-শতাধিক গ্রামের মানুষের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। বর্ষা মৌসুমে নদীতে পানি বাড়লে প্রতিরক্ষা বাঁধ, নদী আর গ্রাম কোনটির কোনো অস্তিত্ব থাকে না। সেই সঙ্গে এ ইউনিয়নগুলোর বানভাসী লোকজন প্রতিটি মুহুর্তে বন্যা আতঙ্কে তাদের দিন কাটায়। তারা আরো বলেন, বিএসএফের বাঁধায় বাংলাদেশ অংশে কাজ বন্ধ হলেও ভারতীয় অংশে ঠিকই কাজ চলছে। দ্রুত প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন করে যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিরক্ষা বাঁধের কাজ বাস্তবায়ন না করা যায় তাহলে আবারো নদী ভাঙ্গনের আতঙ্কে রয়েছেন মনু পাড়ের মানুষ। স্থানীয়রা বাঁধটি দ্রুত মেরামতের দাবি জানিয়েছেন।
কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা আক্তার বলেন, পৃথিমপাশা ইউনিয়নের শিকড়িয়ায় মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের ভাঙ্গনকৃত স্থান পরিদর্শন করেছি। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য ত্রাণ সহায়তার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসন থেকে আপাতত ৫০ বস্তা শুকনো খাবার বরাদ্দ পাওয়া গেছে। বাঁধের বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তারা বলেছে আপাতত তাদের পক্ষ থেকে ওই বাঁধ মেরামত করার কোন সুযোগ নেই। কারণ বিএসএফের বাঁধায় সীমান্তের ১৫ গজের ভেতর শিকড়িয়া এলাকার ভাঙ্গনকৃত বাঁধটির কাজ দীর্ঘদিন থেকে বন্ধ রয়েছে। বিষয়টি জেলা প্রশাসক মহোদয়কে অবহিত করেছি। স্থায়ীভাবে এই সমস্যার সমাধান করতে হলে বাংলাদেশ-ভারতের আন্ত:মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কার্যত উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালিদ বিন অলিদ বলেন, ভারী বৃষ্টি ও ভারত থেকে নেমে আসা ঢলে মনু নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। কুলাউড়ায় এখনো মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধে ভাঙ্গনের খবর পাওয়া যায়নি। তবে পৃথিমপাশা ইউনিয়নের শিকড়িয়া এলাকায় ক্ষতিগ্রস্থ বেড়িবাঁধে ফের বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। গতবছর এই বাঁধের কাজ শুরু করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বিএসএফের বাঁধায় কাজ শুরু করা যায়নি। কাজ শেষ করতে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার চিঠি প্রেরণ করা হয়েছে। যেহেতু বিষয়টি দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। অনুমোদন পেলে কাজ শুরু করা হবে।



মন্তব্য করুন