মৌলভীবাজারে ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের বিপ্লব বার্ষিকীতে লাল পাতাকা মিছিল ও আলোচনা সভা

November 8, 2026,

স্টাফ রিপোর্টার : মহান অক্টোবর বিপ্লবের ১০৯-তম বার্ষিকীতে বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির উদ্যোগে শহরে লাল পতাকা মিছিল ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

৭ নভেম্বর শনিবার সন্ধ্যায় শহরের চৌমুহনাস্থ কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ জেলা কমিটির সহ-সভাপতি মোঃ সোহেল মিয়া। সংগঠনের জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক রজত বিশ্বাসের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সাবেক সভাপতি নিরঞ্জন দাশ, মৌলভীবাজার জেলা হোটেল শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি তারেশ চন্দ্র দাস, চা-শ্রমিক সংঘ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক হরিনারায়ন হাজরা ও সাংগঠনিক সম্পাদক নারী চা শ্রমিক নেত্রী লক্ষীমনি বাক্তী, মৌলভীবাজার জেলা রিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি মোঃ গিয়াস উদ্দিন, শ্রমিকনেতা ফজলুর রহমান ও মো: জসিম উদ্দিন প্রমূখ।  আলোচনা সভা পূর্বে একটি লাল পতাকার মিছিল শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে চৌমুহনাস্থ কার্যালয়ে এসে আলোচনা সভায় মিলিত হয়।

আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ১৯১৭ সালের ৭ নভেম্বর মহামতি লেনিনের নেতৃত্বে রাশিয়ার বলশেভিক পার্টি তথা শ্রমিকশ্রেণি বলপ্রয়োগে বুর্জোয়াশ্রেণিকে উৎখাত করে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব জয়যুক্ত করলে পৃথিবীর ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা ঘটে। প্রতিষ্ঠিত হয় পৃথিবীর প্রথম সমাজতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন। যে দেশে শ্রমিক-কৃষক-জনগণের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষার মতো ৫টি মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হয়। ব্যক্তিমালিকানার পরিবর্তে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়; বুর্জোয়া একনায়কত্বের পরিবর্তে কার্যকরী করা হয় শ্রমিক শ্রেণির একনায়কত্ব। শ্রমিকশ্রেণির একনায়কত্বাধীনে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক বিনির্মাণের যাত্রাবিন্দু। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ও বিনির্মাণ প্রক্রিয়া অগ্রসর হওয়ার মধ্যদিয়ে রাশিয়ায় শ্রেণি শোষণ-লুণ্ঠন, দারিদ্র-বেকারত্বসহ শ্রমিক-কৃষক-জনগণের ৫টি মৌলিক চাহিদা অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষা পুরণ হয়। শ্রেণি শোষণের অবসানের মধ্যদিয়ে নিপীড়িত জাতিসত্তাসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, নারী মুক্তি, শিক্ষা-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব অগ্রগতিসহ সাংস্কৃতিক বিপ্লব, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বৈপ্লিবিক পরিবর্তনসহ চিন্তা-চেতনার বৈপ্লবিক রূপান্তরে দৃষ্টান্ত হয়ে উঠে। অক্টোবর বিপ্লব দুনিয়ার শ্রমিকশ্রেণি, নিপীড়িত জাতি ও জনগণের সামনে মুক্তির আলোকবর্তিকা হিসেবে প্রথ প্রদর্শন করে।

সভায় বক্তারা আরও বলেন সাম্প্রতিক সময়ে লাগামহীন দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতির পাশাপাশি গ্যাস-বিদ্যুত-জ্বালানি সংকট ও বিদ্যুতের লোড শেডিংয়ের কারণে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন দ্রব্যমূল্যের কষাঘাতে জর্জরিত জনগণের জীবনে নাভিশ্বাস উঠছে। দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতির এই সময়ে বাচাঁর মত মজুরি না পেয়ে অর্ধাহার-অনাহার ক্লিষ্ট শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি জনগণের জীবন চলাই দায় হয়ে পড়েছে। জীবনযাত্রার প্রতিটি ক্ষেত্রেই লাগামহীন মূল্য বৃদ্ধি ঘটলেও শ্রমিক-কৃষক-জনগণের মজুরি বা আয় বাড়েনি। সরকারি কর্মচারীদের জন্য পে স্কেলে ১৪২ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির কথা সরকারিভাবে প্রচার করা হয়েছে। যার কারণে ইতোমধ্যে বাজারে আরেক দফা দ্রব্যমূল্য বেড়েছে। সরকার ১৪/১৫ লাখ সরকারি কর্মচারীদের জন্য বেতন বৃদ্ধির ব্যবস্থা করলেও দেশের অর্থনীতির অন্যতম মূল চালিকা শক্তি প্রায় সাড়ে ৭ কোটি শ্রমিক-কর্মচারীদের জন্য জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘোষণার কোন উদ্যোগ নেয়নি। গার্মেন্টস শ্রমিকরা রাজপথে মজুরিতে দাবিতে আন্দোলনে নামলে সেখানেও সরকারী ও দলীয় বাহিনী শ্রমিকদের উপর নির্যাতন চালায়। অথচ সরকারের পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপে উঠে আসে শহরাঞ্চলে একটি পরিবারে কমপক্ষে ৩৭,৩৪৪ টাকা লাগে। ঘনবসতি পূর্ণ শিল্পাঞ্চলে তা দ্বিগুণের বেশি লাগে। তারপরও সরকার ও মালিকপক্ষ শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবি উপেক্ষো করে চলেছে। সম্প্রতি নারায়নগঞ্জ চেম্বারের সাবেক সভাপতি সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন ঘুষ, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজী বন্ধ হলে শ্রমিকদের ৪০ হাজার টাকা মজুরি দেওয়া সম্ভব।  সরকার শ্রমিক-কর্মচারীদের দাবি উপেক্ষা করে চললেও প্রভূ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাথে দাসত্বের বাণিজ্য চুক্তির শর্ত পুরণে জনগণের ঘাড়ে ঋণের বোঝা চাপিয়ে ২৫ টি বোয়িং ও ১০ এয়ারবাস বিমান কেনার চুক্তি করেছে। শুধু তাই নয় ভূরাজনৈতিক ও রণনীতিগত গুরুত্বপূর্ণ নয়াউপনিবেশিক আধাসামন্ততান্ত্রিক বঙ্গোপোসাগরীয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে নিয়েও আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধে সম্পৃক্ত করার ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত অগ্রসর করে চলেছে। মার্কিনের নেতৃত্বে পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদ ও প্রতিপক্ষ সাম্রাজ্যবাদী চীন-রাশিয়া উভয়পক্ষই স্বপক্ষে বাংলাদেশকে যুদ্ধে সম্পৃক্ত করতে চায়। আজ তাই বাংলাদেশের শ্রমিক-কৃষক-জনগণকে জীবিকার সংগ্রামের সাথে সাথে জীবন রক্ষায় আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। বক্তারা বর্তমান বাজারদরের সাথে সংগতিপূর্ণভাবে জাতীয় ন্যূনতম মূল মজুরি ৩০ হাজার টাকা ঘোষণা, গার্মেন্টস শ্রমিক হত্যার দৃষ্ঠান্তমূলক শাস্তি ও নিহতের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপুরণ প্রদানের পাশাপাশি অবিলম্বে গঠিত মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে বাজারদরের সাথে সংগতিপূর্ণ মজুরি ঘোষণা, গণতান্ত্রিক শ্রমআইন প্রণয়ন ও অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ ১০ দফা দাবিতে ঐক্যবদ্ধ শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তোলার পাশাপাশি আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহবান জানান।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com