মনু নদীর দু’টি স্থানে ভাঙ্গন : ফসলের ব্যাপক ক্ষতি : ২৫ গ্রামের ৩৫ হাজার মানুষ ফের পানিবন্দি

মু. ইমাদ উদ দীন॥ আবারও ৫ম দফা আকস্মিক বন্যায় পানিবন্ধি হয়ে পড়েছেন জেলার কুলাউড়া উপজেলার ২৫ গ্রামের প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ। দু’ দিনের টানা মাঝারী ও ভারী বৃষ্টির সাথে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলে ফের নতুন করে বন্যার দূর্ভোগে পড়েছে মনুনদী তীরবর্তী বাসিন্ধারা। স্থানীয় নদী ও হাওরগুলোতে হঠাৎ পানি বেড়ে তীরবর্তী এলাকার ক্ষেতকৃষি আবারও গ্রাস করেছে বন্যা। হঠাৎ এমন আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে আগাম শীতকালী সবজি ও আমন ধানের। তাছাড়া শীতকালীন সবজির জন্য প্রস্তুতকৃত জমি টানা দুদিনের বৃষ্টির পানি ডুবিয়ে দিয়েছে। এবছর বার বার বন্যা আর অতিবৃষ্টির কারনে ব্যাপক ফসল হানিতে দিশেহারা এজেলার কৃষককূল। জানা যায় গত দুদিনের টানা ভারী বৃষ্টিতে মনু নদীর দুটি স্থানে প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে কুলাউড়া উপজেলার শরীফপুরে চাতলা সেতু সংলগ্ন এলাকা এবং উপজেলার টিলাগাও এলাকায় আরও একটি বাঁধ ভেঙ্গে দ্রুত গতিতে ঢলের পানি প্রবেশ করে ফসলি জমি ও নদী তীরবর্তী কয়েকটি গ্রাম নিমজ্জিত করছে। হঠাৎ নতুন করে মনু নদীর তীরবর্তী কুলাউড়া উপজেলার শরীফপুর, টিলাগাও ও হাজিপুর ইউনিয়নের প্রায় ২৫টি গ্রামের প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। আর ঘরবাড়ি ও ক্ষেতকৃষিতে ঢলের পানি উঠে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। শরীফপুর ইউনিয়নের কালারায়েরচর, ইটারঘাট ও চারিয়ারঘাট এই তিনটি গ্রামের লোকজন ঘরবাড়ি ছেড়ে এখন আশ্রয় নিয়েছেন বেড়িবাধঁ এলাকায়। এই তিনটি গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে হানা দিয়েছে বানের পানি। ইতিমধ্যেই বানের পানির ¯্রােতের তোড়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে চাতলাপুর সেতুর। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন বৃষ্টি আর এরকম ¯্রােত অব্যাহত থাকলে সেতুটির বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। এমন আশংকায় উদ্বিগ্ন তারা। স্থানীয় সড়কগুলোও ডুবিয়ে দিয়েছে বানের পানি।

এদিকে নিন্মচাপের প্রভাবে টানা বৃষ্টিতে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া,জুড়ী, বড়লেখা,শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলার সবগুলো পাহাড়ি ছড়ার পানি বিপদ সীমা অতিক্রম করে প্রবাহিত হচ্ছে। হাকালুকি ও কাউয়াদিঘি হাওরেরও একই অবস্থা,ক্রমেই বেড়ে চলছে পানি। জুড়ী,মনু,ধলাই ও ফানাই নদী ও পাহাড়ি ছড়াগুলোরও পানি বিপদ সীমা অতিক্রম করে নিমজ্জিত করে ফেলেছে তীরবর্তী গ্রামগুলোর আমন ও আগাম শীতকালীন সবজি ফসল। বৃহস্পতিবার রাত থেকে হালকা আকারে বৃষ্টি শুরু হলেও শুক্র ও শনিবার দুই দিন দুই রাত অবিরাম মাঝারী ও ভারী বর্ষণে কমলগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী ইসলামপুর ইউনিয়ন থেকে রহিমপুর ইউনিয়ন পর্যন্ত সবগুলো পয়েন্টে ধলাই নদের পানি বিপদ সীমা অতিক্রম করেছে। জেলার রবি শস্যেভান্ডার হিসেবে খ্যাত কমলগঞ্জ ও কুলাউড়া উপজেলায় এবছর বার বন্যায় কারনে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা। সর্বশেষ গত দুদিনের বৃষ্টিতে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় তাদের আগাম শীতকালিন সবজি ও আমন ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আর ব্যাপক হারে শীতকালীন সবজি চাষের জন্য প্রস্তুত কৃষিজমিতে পানি উঠে তা সবজি চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
শরীফপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো: জুনাব আলী গতকাল বিকেলে মুঠোফোনে এ রিপোর্টারকে জানান,কুলাউড়া উপজেলার শরীফপুর ইউনিয়নের চাতলাপুর বিজিবি ক্যাম্প সংলগ্ন মনু নদের বাঁধ ভেঙ্গে দ্রুত ঢলের পানি প্রবেশ করে তার ইউনিয়নের প্রায় ১৫টি গ্রাম বন্যা আক্রান্ত হয়েছে। ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ ৩টি গ্রামের লোকজন ইতিমধ্যে বেড়ি বাধে আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি জানান রোববার রাত ১২টার পর মনু নদের প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে ঢলের পানি গ্রামগুলোতে প্রবেশ করতে শুরু করে। অবস্থা দেখে অনুমান করা যায় এ অবস্থার আরও অবনতি হতে পারে। তাছাড়া পানির ¯্রােতের আঘাতে চাতলা সেতুও এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। অপর দিকে কুলাউড়া উপজেলার টিলাগাও ইউনিয়নের আশ্রয় গ্রাম এলাকায় মনু প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে ইতিমধ্যেই ইউছুব পুর, বালিয়া, চানপুর আংশিকসহ প্রায় ১০ টি গ্রামে পানি প্রবেশ করেছ। একই ভাবে বানের পানি প্রবেশ করছে হাজিপুর ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামেও। খবর পেয়ে ঘটনাস্থল গুলো পরিদর্শন করেন কুলাউড়া উপজেলা চেয়ারম্যান আ.স.ম কামরুল ইসলাম।কুলাউড়া উপজেলা চেয়ারম্যান আ.স.ম.কামরুল ইসলাম গতকাল বিকেলে মুঠোফোনে রিপোর্টারকে জানান, মনু নদীর দুটি এলাকায় বাঁধ ভেঙ্গে তার উপজেলার ৩টি ইউনিয়নের কয়েক হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। পানিতে তলিয়ে গেছে ওই ইউনিয়নের গ্রামগুলোর রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি।

কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহমুদুল হক ও স্থানীয়বাসিন্দারা জানান ধলাই নদ ও লাঘাটাসহ সবগুলো পাহাড়ি ছড়ার পানি এখন বিপদ সীমা অতিক্রম করে দ্রুত পানি গ্রামে প্রবেশ করে গ্রাম্য রাস্তাঘাট নিমজ্জিত করছে। ইসলামপুর ইউনিয়নের কালারায় বিল,শ্রীপুর, পাথারী গাঁও, কানাইদাশী ও গুলের হাওর গ্রাম, কমলগঞ্জ সদর ইউনিয়নের চৈতন্যগঞ্জ গ্রাম ও ছাইয়াখালি হাওরের, পতনউষার ইউনিয়নের কেওলার হাওর, মুন্সীবাজার ইউনিয়নের রুপশপুর, শমশেরনগর ইউনিয়নের শিরাউলী, মরাজানের পর, সতিঝির গাঁও, গ্রামের ব্যাপক এলাকার আমন ও শীতকালীন সবজির ফসল নিমজ্জিত করেছে। তাছাড়া শ্রীপুর এলাকার ধলাই নদের পুরাতন ভাঙ্গন দিয়ে দ্রুত ঢলের পানি প্রবেশ করছে গ্রামে। কমলগঞ্জ পৌরসভার আলেপুর গ্রাম এলাকার ধলাই প্রতিরক্ষা বাঁধের পুরাতন ভাঙ্গন দিয়েও দ্রুত ঢলের পানি প্রবেশ করছে। তারা জানান উজানে ভারতীয় এলাকায় বৃষ্টি না থামলে ও ধলাই নদের পানি নাম কমলে ধলাই প্রতিরক্ষা বাঁধের আরও কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে ভাঙ্গন দেখা দিয়ে অবস্থার আরও অবনতি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। অপর দিকে টানাবৃষ্টি ও উজানের ঢলে শ্রীমঙ্গল উপজেলার পাহাড়ী ছড়া গুলো ডুবে গিয়ে শনিবার রাতে ও রবিবার ভোরে কয়েকশত বাড়িঘরে পানি উঠে ভুগান্তিতে পড়েন স্থানীয় বাসিন্ধারা। জেলা কৃষি অফিস সুত্রে জানা যায় দুদিনের টানা মাঝারী ও ভারী বৃষ্টি এবং নদীভাঙ্গনের কারনে প্লাবনের পানিতে আমন ফসল,আগাম শীতকালীন সবজি ও শীতকালীন সবজি ক্ষেতের প্রস্তুতকৃত মাঠ পানিতে নিমজ্জিত হওয়ায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন চাষীরা।



মন্তব্য করুন