হাওর পাড়ে হাহাকার : চাল কিনতেই সব শেষ

ইমাদ উদ দীন॥ তিন বেলা যে শুধু সাদা ভাত খাব। এমনটিও নাগালের বাহিরে চলে যাচ্ছে। চালের দাম যে বাড়তে শুরু করেছিল আর থামেনী। এখন চাল কিনার পর ডাল,সবজি বা মসলা কিনব সে সাধ্যটা কোথায়। চালের মত বেড়েই চলেছে সবজির দামও। এবছর দূর্যোগে এমন দূর্ভিক্ষ। আয় নেই,রোজগার নেই। চারদিকে শুধু থৈ থৈ পানি। প্রায় ৭মাস সবই পানির দখলে। কৃষিজমি,ঘরবাড়ি,মৎস্য খামার সব জায়গাতে দীর্ঘ দিন থেকে পানির রাজত্ব। এবছর চৈত্রের আগাম বন্যায় তলিয়ে নেয় বোরো ধান। এরপর চলমান দীর্ঘ বন্যায় স্থায়ী জলবদ্ধতায় আমনও আউশ ধানও হয়নি। তাই স্থানীয় পর্যায়ে কৃষকের ঘরে নেই ধান চালের পর্যাপ্ত মজুদ। ধান চালের এমন সংকট দেখিয়ে হাওর তীরে বেড়েই চলেছে চালের দাম। ৩০ টাকার আতপ চাল এখন ৫০ টাকা। ক্ষোভে দুঃখে এমনটিই জানালেন বোরো,আউশ ও আমন ধান হারানো হাকালুকি,কাউয়াদিঘি ও হাইল হাওরের বাসিন্দারা। তারা জানালেন প্রতিদিনই তাদের (১০-১৫ জনের) পরিবারে চাল লাগে ৪-৫ কেজি। স্থানীয় বাজারে কোনো চালই ৪৫-৫০ টাকার কমে মিলছে না। এ হিসেবে প্রতিদিনই তাদের শুধু চাল কিনতে প্রয়োজন পড়ছে দুই থেকে আড়াইশ’ টাকা। আর এর বাইরে ডাল,মাছ সবজিসহ অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় খরচ তো থাকছেই। তাদের মতো জেলার অন্যান্য ছোট বড় হাওর ও নদী পাড়ের বাসিন্দাদের একই অবস্থা। এখন বোরো ধান ও আমন ধান নষ্ট হওয়ার অজুহাতে হাওর পাড়ের ছোট খুচরা দোকানি থেকে শুরু করে উপজেলা শহরের দোকানগুলোয় চালের দাম বেড়েই চলেছে। ২৫-২৬ দিনের ব্যবধানে স্থানীয় বাজারগুলোতে খুচরা চালের দাম বেড়েছে কেজি প্রতি ১৫-২০ টাকা। জেলা শহরসহ সবকটি উপজেলা শহর ও স্থানীয় হাটবাজারগুলোয় হু হু করে বাড়ছে চালের দর। মাস দেড় মাস আগে যে আতপ (পাইজম) চালের দাম ছিল প্রতি বস্থা ১৭-১৮ শ টাকা। এখন তা বিক্রি হচ্ছে ২৪-২৫শ টাকা। হাকালুকির তীরবর্তী বড়লেখা, জুড়ী ও কুলাউড়ার স্থানীয় বাজারগুলোর চালের খুচরা ও পাইকারি দোকানগুলোতে এমন বাড়তি দাম লক্ষ্য করা যায়। একই অবস্থা কাউয়াদিঘি ও হাইল হাওর তীরবর্তী রাজনগর, মৌলভীবাজার, কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল উপজেলার বাজারগুলোরও। কোথাও চালের দামের কমতি নেই। দেশে চালের কোনো ঘাটতি নেই তাহলে কেন এত দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছেন। এমন প্রশ্নে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, আমরা মহাজনদের কাছ থেকে বাড়তি দাম দিয়ে ক্রয় করছি বলেই তা দামে বিক্রি করছি। জেলা ও উপজেলা শহরের কজন পাইকারি চাল ব্যবসায়ী (আড়ৎদার) বলেন বোরো,আমন ও আউশ ধানের উৎপাদন না হওয়াতে আমাদের এলাকার অটোরাইস মিল বা চাতাল কলগুলো বন্ধ। তাই স্থানীয় পর্যায়ে নেই চালের উৎপাদন। এ কারণে এখন আমরা যাদের কাছ থেকে চাল কিনছি তারাই মূলত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ধান উৎপাদন না হওয়ার অজুহাতে হাওর ও নদী তীরবর্তী এলাকায় বেশি দরে চাল বিক্রি করছেন। আমরা এর প্রতিবাদ করলে তারা আমাদের চাল দেয়া বন্ধ করার হুমকি দেন। ব্যবসা ধরে রাখার স্বার্থে ওদের কাছ থেকে ক্রয় করা চাল আমরা অনেকটা অল্প লাভেই বাজারে ছেড়ে দিচ্ছি। তার পরও দাম অনেক বেশি এমনটি স্বীকার করছি। কিন্তু এ বিষয়ে আমাদের কোনো হাত নেই। তাছাড়া আগে যাদের চাল ও ধান মজুদ ছিল তারাও এ সুযোগে অধিক মুনাফার চিন্তায় চালের দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছেন। হাওর পাড়ের মুদিদোকানিরা জানালেন অন্যান্য বছর এসময় তাদের দোকানে একবস্তা চাল বিক্রি করতে ১০-১২ দিন লাগত। কিন্তু এ বছর চালই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে। ২-৩ দিনেই বিক্রি হচ্ছে এক বস্তা চাল। মৌলভীবাজার শহরের মুদিদোকানি সাকিব আহমদ, উত্তম পাল, সেলিম আহমদ, কালাম মিয়া, শরীফ আহমদসহ অনেকেই জানান, তারা এখন প্রতি কেজি আতপ (পাইজম) খুচরা বিক্রি করছেন ৪৮-৫০ টাকা। যা মাস দিন আগে ছিল ৩৫-৩৬ টাকা। কাটারি ভোগ ৫৭-৫৮ টাকা। মাস দিন আগে ছিল ৪০-৪৫ টাকা। বাসমতি মিনিকেট ৫৫-৫৬ টাকা। আগে ছিল ৩৮-৪০ টাকা। শাহজালাল (মধ্যম মোটা চাল) ৪৫-৪৬ টাকা। আগে ছিল ২৮-৩০ টাকা। জেলায় সবকটি উপজেলায় এবছর কমি বেশি বোরো ধান হারিয়ে যাওয়ায় হঠাৎ দাম বেড়েছে চালের। এখন এজেলার হাওর ও নদী পাড়ের লোকজনের সঙ্গে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-আয়ের লোকজনও চাল কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন। অতি সম্প্রতি আরো একধাপে বেড়েছে চালের দাম। গতকাল সরজমিনে মৌলভীবাজার শহরের পশ্চিমবাজার চালের দোকানের তাবাসসুম ফ্রেস ফুড, হালিম চালের দোকান, ইশা ট্রেডার্স, মেসার্স ফজলুর রহমান ও রনজিৎ পাল চালের দোকান ও টিসি মার্কেটের খুচরা ও পাইকারী দোকানগুলোতে ঘুরে জানাগেল প্রায় সপ্তাদিন আগের বাজার দর আর বর্তমান দরে অনেক তারতম্য।
শাহ জালাল জাতের চাল কয়েক দিন আগে ছিল ২১৫০ বর্তমানে ২৪৮০। বিআর-২৮ আগে ছিল ২১৫০ বর্তমানে ২৪০০। মিনিকেট রশিদ আগে ছিল ২৪৫০ বর্তমানে ২৭০০। সটার-২৮আগে ছিল ২২৫০বর্তমানে ২৫০০। মোটা চাল আগে ছিল ১৯০০বর্তমানে ২১২০। নাজির শাইল আগে ছিল ২৯৮০ বর্তমানে ৩৩০০। গোটি চাল আগে ছিল ২০০০ বর্তমানে ২২৫০। ইন্ডিয়ান আতব ২১৫০টাকা এটা মৌলভীবাজারের দোকান গুলোতে নতুন এসেছে। মিনিকেট সটার আগে ছিল ২৬০০ বর্তমানে ২৮৫০। গোল্ডেন রাইস আগে ছিল ২৫০০ বর্তমানে ২৭৫০। গোল্ডেন রাইস বাসমতি আগে ছিল ২৭০০বর্তমানে ৩০০০টাকা দরে বস্তা বিক্রি হচ্ছে। চালের দাম বাড়ার বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর মৌলভীবাজার জেলা সভাপতি সিনিয়র সাংবাদিক ডা. ছাদিক আহমদ ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সদস্য সিনিয়র সাংবাদিক বকশি ইকবাল আহমদ বলেন হাওর ও নদী তীরের অসহায় মানুষগুলোর দুর্দিনে যারা সাহায্যের পরিবর্তে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে মিলমালিক,মজুদদার ও কালোবাজারিরা সিন্ডিকেট করে মুনাফার লুটার চেষ্টা করছেন তাদের এমন নিন্দনীয় কাজকে ঘৃণাজানাই। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে চালের বাজার মনিটরিং জোরদার করার জোরালো দাবি জানান তারা।



মন্তব্য করুন