পুরুষ শূন্য শিমুলিয়া এলাকা আসামীদের বাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট : নারী ও শিশু নির্যাতন ইউপি সদস্যের নির্দেশে

হোসাইন আহমদ॥ মৌলভীবাজার সদর উপজেলার শিমুলিয়া এলাকায় গাছকাটাকে কেন্দ্র করে মাসাদ মিয়া নিহতের ঘটনায় ৫৮দিন ধরে বাড়ির বাহিরে অবস্থান করছে আসামীরা। এই সুযোগে বাদী পক্ষের লোকজন ইউপি সদস্যের নেতৃত্বে দুই দফায় আসামীদের ৫টি বাড়ির ৩৫টি ঘর এবং আসবাবপত্র ভাঙচুর করে ব্যাপক লুটপাট সংঘঠিত হয়েছে।
এলাকাবাসী সূত্রে জানাযায়, রবিবার ২৯ অক্টোবর সকাল ১০টায় ঘটনাটি ঘটে। এ সময় ইউপি সদস্য মশাহিদ মিয়ার নেতৃত্বে বাড়ি-ঘর এবং আসবাবপত্র ভাঙচুর করে স্বর্ণলংকার, নগদ টাকা, মোবাইল ফোন, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, চাউল, ফ্রিজ, কম্বল, ফিসারীর মাছ, নৌকা, মাছ ধরার জাল, গোলার ধান ও জমির ফসল কেটে প্রায় দেড় কোটি টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে গেছে। ৫ বাড়ির মহিলা, শিশু ও যুবতী মেয়েসহ তাদের গোষ্ঠীর অন্যান্য বাড়ির মহিলারা অন্য গ্রামে আত্মীয়ের বাড়িতে অবস্থান করছেন। এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে আতংক বিরাজ করছে। যে কোনো সময় ঘটতে পারে আরোও বড় ধরনের দূর্ঘটনা।
ভাঙচুরের সময় মহিলারা বাঁধা দিলে হামলাকারী সংঘবদ্ধ দল তাদের সাথে অশালীন ভাষায় কথা বার্তা বলে ও শারিরিক ভাবে নির্যাতন করে। এসময় মহিলারা মুহিত নামে এক হামলাকারীর পায়ে হাতে ধরে অনুরোধ করলেও হামলা বন্ধ করেনি। স্থানীয় একজন লোক বলেন, শিশুর সামন থেকে খাবারের প্লেটটিও তারা নিয়ে যায়।
এ ঘটনায় করিমা বেগম বাদী হয়ে ৩০ জনকে আসামী করে ১ নভেম্বর মৌলভীবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে মামলা দায়ের করেন (মামলা নং ৫৯৮/১৭)।
সরেজমিন এলাকায় গেলে দেখা যায়, হামলাকারীরা আবু বক্কর মিয়ার বাড়ির পশ্চিম পাশের ১০টি ঘরের দেয়াল ভেঙ্গে প্রতিটি রুমের সকল আসবাবপত্র, বাথ রুমের কমেড, রান্না ঘরের চুলা ভাঙচুর করে এবং ঘরের উপরের টিন কেটে ফেলে। যাওয়ার সময় তারা পানির টিউবওয়েলটিও খুলে নিয়ে যায়।
ওই বাড়ির গৃহবধূ সুমিনা বলে, দরবেশ, ইউপি সদস্য মোশাহিদ মিয়া, আনহার, মনসুর, রুপা, লকুছ, মুহিত, জামিল, শামিম, লিমন, সাফি, নবীরুল, আবুল ও কটু’র নেতৃত্বে ৮০/১০০ লোক হামলা করে।
পাশের বাড়ির লুৎফুন নাহারের পাকার তৈরি ঘরের দেয়াল ভেঙে দরজা, জানালা, আসবাবপত্র, বাথরুম ও রান্না ঘরের সকল জিনিষপত্র ভাঙচুর করে ৪ ভরি স্বর্ণ, নগদ ২০ হাজার টাকা ও ২টি ফ্যান নিয়ে যায়।
লুৎফুন নাহার বলেন, লকুছ, মুহিত, জামিল ও শামীমের হুকুমে ৫০জন লোক হামলা করে। বাড়িতে হামলার কথা শুনে প্রবাসে থাকা আমার ছেলে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তিনি দুই পুত্র বধূ ও ৩ নাতি নাতনিকে নিয়ে অন্য গ্রামে বসবাস করছেন। এসময় শাপলা, শুভ ও নাবিল নামের ৩ শিক্ষার্থী বলে, ওরা পড়ার বই ও খাতা নিয়ে গেছে। আমরা এখন বই ছাড়া কি দিয়ে লেখাপড়া করব।
সাবেক মহিলা ইউপি সদস্য জেবী বেগম বলেন, মুহিত, লকুছ ও আসাদ এর নেতৃত্বে হঠাৎ আমার বাড়িতে হামলা চালিয়ে ঘরের পাকার দেয়াল ভেঙ্গে আসবাবপত্র ভাঙচুর করে মোবাইল, নগদ টাকা ও স্বর্ণলংকার নিয়ে যায়। একই বাড়ির মৌলদা বেগম, আবিদ মিয়া, আব্দুল করিম, পাকু মিয়া ও চুনু মিয়ার ঘরেও ভাঙচুর করা হয়েছে। হামলাকারীরা মসজিদের পাশ থেকে রুমি মিয়ার ফসলি জমির ধান কেটে নিয়ে গেছে।
হামলার বিষয়ে কাগাবালা বাজারে একাধিক ব্যবসায়ী ও স্থানীয় লোকের সাথে কথা হলে তারা বলেন, শিবলী মিয়া’র লোকেরা নৃশংস এ হামলা করেছে। ইতি পূর্বে আমাদের এলাকায় এরকম ঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেনি।
এবিষয়ে মামলারবাদী শিবলী মিয়া বলেন, আসামীরা বাহির থেকে লোক এনে আমাদেরকে ফাঁসানোর জন্য তাদের ঘর নিজেরাই ভাঙচুর করেছে।
বাদী শিবলী মিয়া’র লোকেরা ভাঙচুর করেছে এ কথা স্বীকার করে ইউপি চেয়ারম্যান আজির উদ্দিন বলেন, হামলাকারীরা অন্য দুটি বাড়ি ভেঙে যখন আবু বক্করের বাড়িতে আসে তখন আমি নিজে গিয়ে তাদেরকে বিদায় করে দিয়েছি। ঘটনার পরে হামলাকারী ০৮/১০ জন লোককে ইউনিয়নে ডেকে আনলে তারা হামলার কথা স্বীকার করে। এসময় তাদেরকে সতর্ক করে দিয়েছি যাতে আগামীতে এধরনের কোন ঘটনা না ঘটায়। বৈঠকে আনহার মিয়া ও ইউপি সদস্য মশাহিদ মিয়াসহ অন্যান্য ইউপি সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
ইউপি সদস্য মোশাহিদ মিয়ার সাথে কথা হলে তিনি বলেন, ২ মিনিট পরে আপনার সাথে কথা বলতেছি।
মৌলভীবাজার মডেল থানার ওসি মো: সোহেল আহাম্মদ শিবলী মিয়া’র লোকেরা হামলা করেছে একথা স্বীকার করে বলেন, বিষয়টি মর্মান্তিক ও হৃদয় বিধাড়ক। আইনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
উল্লেখ্য, গত ৯ সেপ্টেম্বর সকালে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আপার কাগাবালা ইউনিয়েনে শিমুলিয়া গ্রামের সুমন মিয়ার সাথে প্রতিবেশী বকুল মিয়ার গাছ কাটা নিয়ে কথাকাটাকাটি হয়। এর সূত্র ধরে বর্তমান মেম্বার মোশাহিদ ও রাজা মিয়া গ্রুপ দেশীয় অস্ত্র তীর নিয়ে দুই পক্ষের লোকজন সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এতে বর্তমান মেম্বার মোহাহিদের পক্ষের মাসাদ নামে একজনের গলায় তীরের আঘাত লাগলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পরের দিন মৌলভীবাজার মডেল থানায় নিহত মাসাদ মিয়ার বড় ভাই শিবলী মিয়া বাদী হয়ে ৪৩ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ২০/২৫ জনকে অজ্ঞাত করে হত্যা মামলা দায়ের করেন (মামলা নং ০৯)।



মন্তব্য করুন