নাসিরপুর জঙ্গি আস্তানা অপারেশন ‘হিটব্যাক’ মামলার এজহারে যা আছে

সাইফুল ইসলাম॥ মৌলভীবাজার সদর উপজেলার নাসিরপুর ‘ অপারেশন হিটব্যাক’ দায়ের করা মামলার এজহারে মৌলভীবাজার মডেল থানার উপ-পরিদর্শক শহীদুল ইসলাম ০১.০৪.২০১৭ইং তারিখে দায়েরকৃত মামলার এজহারে উল্লেখ করেছেন, মৌলভীবাজার মডেল থানাধীন মৌলভীবাজার পৌরসভার অর্ন্তগত ৬ নং ওয়ার্ডের বড়হাট এলাকার লন্ডন প্রবাসী জনৈক সাইফুল ইসলামের মালিকানাধীন বাড়িতে কতিপয় জঙ্গির অবস্থান সম্পর্কে গোপন সংবাদ পাইয়া ২৯.০৩.২০১৭ইং তারিখে রাত আনুমানিক ৩ ঘটিকায় মৌলভীবাজার জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাহ্জালালের নেতৃত্বে মৌলভীবাজার জেলাসহ সিলেট রেঞ্জের বিভিন্ন ইউনিট ও এপিবিএন এর অফিসার ও ফোর্সসহ উল্লেখিত বাড়িটি ঘিরিয়া ফেলি। বাড়িটি ঘিরে রাখা অবস্থায় ভোর ৫টা ২৫ মিনিটের সময় বিশ্বস্ত সূত্রে জানিতে পারি যে,অত্র থানাধীন খলিলপুর ইউনিয়নের নাসিরপুর গ্রামে একই ব্যক্তির মালিকাধীন বাড়ির একতলা টিনসেড বিল্ডিংয়ে আরো জঙ্গি অবস্থান করিতেছে। উক্ত সংবাদের ভিত্তিতে তাৎক্ষনিকভাবে মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে ৩০/৩৫ জন অফিসার ও ফোর্সসহ ভোর ৬টায় উক্ত বাড়িতে উপস্থিত হইয়া বাড়িটিও ঘেরাও করি। পুলিশের উপস্থিতি টের পাইয়া বাড়ির ভেতর অবস্থানকারী জঙ্গিরা পুলিশকে লক্ষ্য করিয়া পর পর কয়েকটি গ্রেনেড নিক্ষেপ ও কয়েক রাউন্ড গুলি বর্ষণ করে। উপস্থিত পুলিশ সদস্যগণও আতœরক্ষার্থে চায়না রাইফেল,এসএমজি,পিস্তল,শটগান ও গ্যাসগান হইতে গুলি বর্ষণ করে।
ঘটনাটি পুলিশ সুপার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করিলে সেখানে আরো প্রায় একশত জন পুলিশ অফিসার ও ফোর্স প্রেরণ করা হয় এবং বাড়িটির ঘেরাও জোরদার করা হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে সীতাকুন্ড ও সিলেটের আতিয়া মহলে জঙ্গি আক্রমণের ভয়াবহতার প্রেক্ষিতে উধর্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনাক্রমে উক্ত বাড়ীতে অভিযান পরিচালনার জন্য ডিএমপি’র কাউন্টার টেরোরিজম ও ট্রান্সনেশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) এর সহযোগিতা গ্রহনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে ২৯.০৩.২০১৭ইং বিকেল ৪টায় সিটিটিসি’র প্রধান ডিআইজি মো.মনিরুল ইসলামের নেতৃত্বে ডিসি (এসএজি) প্রলয় কুমার জোয়ার্দার,ডিসি (টিসি) মোহাম্মদ মহিবুল ইসলাম খাঁন,ডিসি (টিসি) এএইচ এম আব্দুর রকিবসহ সোয়াট ও বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্যগণ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন।
২৯.০৩.২০১৭ ইং তারিখে বিকেল ৩টায় সোয়াট টিম জঙ্গি আস্তানাটির নিয়ন্ত্রণ গ্রহন করিয়া মাইকের মাধ্যমে বাড়ির ভেতরের জঙ্গিদের বাহিরে আসিয়া আতœসম্পূর্ণ আহবান জানায়। কিন্তু উক্ত আহবানে সাড়া না দিয়ে জঙ্গিরা সোয়াট টিমের অবস্থান লক্ষ করিয়া গ্রেনেড নিক্ষেপ ও গুলি করিতে থাকে। আতœরক্ষার্থে সোয়াট টিমের সদস্যগণও পাল্টা গুলিবর্ষণ করিতে থাকে। উক্ত বাড়িতে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক ও গোলাবারুদ থাকিতে পারে সন্দেহে এবং রাতের অন্ধকার নামিয়া আসায় নিরাপত্তা স্বার্থে সন্ধ্যা ৭টায় সোয়াটের অভিযানটি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয় এবং পরদিন ৩০.০.২০১৭ইং তারিখে সকাল ৮টায় পূনরায় অভিযান কার্যক্রম শুরু করা হয়।
উক্ত অভিযানের এক পর্যায়ে জঙ্গিরা বাড়ির ভেতরে আতœঘাতি বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে বাড়ির দরজা জানালাসহ পুরো বাড়িটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। বিকেলে দীর্ঘক্ষণ যাবৎ বাড়ির ভেতর হইতে কোন প্রকার সাড়া শব্দ না পাইয়া সোয়াট টিমের সহিত আমি জঙ্গি অবস্থানকারী ঘরে প্রবেশ করিয়া ঘরের ভেতরে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ,ঘরের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নারী,পুরুষ ও শিশুসহ ০৭ সাত জনের ছিন্নভিন্ন মৃতদেহ এবং বিপুল পরিমাণ IED (Improvised Explosive Device) দেখিতে পাই, যাহাতে আমার ধারণা হয়যে,আতœঘাতী বোমার আঘাতে জঙ্গি ও শিশুদের মৃত্যু হইয়াছে।
পরবর্তীতে এডিসি (ডিএমপি) মোঃ রহমত উল্লাহ চৌধুরীর নেতৃত্বে বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্যগণ ঘটনাস্থলে প্রবেশ করিয়া বেশ কয়েকটি অবিস্ফোরিত গ্রেনেড নিস্ক্রিয় করেন।
এরপর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মোঃ আব্দুস সালামের নেতৃত্বে সিআইডি’র ক্রাইম সিন ইউনিট ঘটনাস্থলে পরিদর্শন পূর্বক ঘটনাস্থল হইতে মৃতদেহের রক্তের সোয়াব,আঙ্গুলের ছাপ ও ছবি এবং অন্যান্য বস্তগত আলামত সংগ্রহ করেন।
সিআইডির ক্রাইমসিন দল ঘটনাস্থল হইতে সংগৃহীত নি¤œবর্ণিত আলামতসমূহ এসআই আব্দুল মালিকের নিকট হস্তান্তর করিলে তিনি বিধি মোতাবেক আলামতসমূহ জব্দ তালিকামূলে ৩০.০৩.২০১৭ইং তারিখে ২০.৫ ঘটিকায় সময় জব্দ করেন।
পরবর্তী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মিন্টু চৌধুরী (বর্তমান জুড়ী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ইউএনও) উপস্থিতিতে আমি ও এসআই আব্দুল মালিক নারী,পুরুষ ও শিশুসহ মোট সাত জনের ছিন্নভিন্ন মৃতদেহের সুরতহাল প্রস্তুত করিয়া ময়নাতদন্তের জন্য মৌলভীবাজার সদর হাসপাতাল মর্গে প্ররণ করি।
জব্দকৃত আলামত
১.একটি ভাঙ্গা ম্যাগজিন সংযুক্ত ভাঙ্গা পিস্তল। যাহার গাঁেয় খোদাই করে ইংরেজীতে MADE USA 9M ৯গ লেখা আছে।
২.বিস্ফোরিত বোমার ধাতব বল ও স্পিøন্টার সর্বমোট ১২৫টি।
৩.গ্যাস গানের খোসা ১০টি।
৪.বুলেটের খোসা ২৯৫টি।
৫.জানালার থাই গ্লাসের ভাঙ্গা টুকরা ছোট/বড় নুমনা ২৫টুকরা।
৬.১টি স্টিলের পিনযুক্ত গোলাকার লেদারের অংশ।
৭.কটনবাট দ্বারা সংগ্রহকৃত সাতজনের নারী/পুরুষ ও শিশুদের সোয়াব।
৮.প্রাপ্ত বয়স্ক নারী ও পুরুষ তিন জনের আঙ্গুলের চাপ।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে নিহত জঙ্গি ও শিশুদের পরিচয় পাওয়া যায় নাই এবং কেউ তাহাদের সনাক্ত করিতে পারে নাই। নিহত জঙ্গিদের অপরাধের ধরণ পর্যলোচনায় ধারণা করা যায়,তাহারা নিষিদ্ধ ঘোষিত বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের জেএমবি এবং নতুন নামধারী সংগঠন নিউ জেএমবি’র নেতাকর্মী ও সমর্থক। নিষিদ্ধ ঘোষিত বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা নিহত জঙ্গিদেরকে তাহাদের কর্মকান্ডে অর্থ,অস্ত্র,গোলাবারুদ,বিস্ফোরক দ্রব্যাদি ও প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে সহায়তা করিয়াছে মর্মে প্রতীয়মান হয়।
নিহত জঙ্গিরা ও তাহাদের সহযোগি অজ্ঞানামা জঙ্গিরা পরস্পর যোগসাজশ ও সহায়তার মাধ্যমে দেশের অখন্ডতা,সংহতি,সার্বভৌমত্ব ও জননিরাপত্তা বিপন্ন ও জনসাধারণের মধ্যে আতংক সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে বিস্ফোরকদ্রব্য ও আগ্নেয়াস্ত্র মজুদ এবং ব্যবহার করিয়া ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ঘটনাস্থলে বিস্ফোরণ ঘটাইয়া এক অপরকে এবং ঘটনাস্থলের শিশুদেরকে হত্যা করিয়া সন্ত্রাস বিরোধী আইন/২০০৯(সংশোধনী-২০১৩) এর ৬(২)৭/৮/৯/১০/১২/১৩ ধারার অপরাধ করিয়াছে বিধায় অজ্ঞাতনামা জঙ্গি ও তাহাদের অজ্ঞাতনামা সহযোগিদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস বিরোধী আইন/২০০৯ (সংশোধনী-২০১৩) এর ৬(২)৭/৮/৯/১০/১২/১৩ ধারায় নিয়মিত মামলা রুজু করত:তদন্তের জন্য ব্যবস্থা করিতে মর্জি হয়।
ঘটনাস্থলে আলামত ও তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ এবং নিহত জঙ্গি ও শিশুদের পরিচয় সনাক্তের চেষ্টায় এজহার দায়ের করিতে কিছুটা বিলম্ব হইল।
মৌলভীবাজার মডেল থানার মামলা নং-০১, তারিখ ০১.০৪.২০১৭ইং তারিখে মডেল থানার ওসি অকিল উদ্দিন মামলা রুজু করেন।
এব্যাপারে মৌলভীবাজার সিআইডি’র ওসি মোঃ আব্দুছ ছালেকের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন,‘মৌলভীবাজার দুইটি জঙ্গি আস্তানার বাড়ির মালিক একই। মামলার অধিকতর তদন্তের স্বার্থে আদালতে রিপোর্ট দাখিল করতে দেরি হচ্ছে। এ ঘটনার সঙ্গে আর কারো জঙ্গি কানেকশন আছে কি না অথবা সিলেটের আতিয়া মহলে জঙ্গিদের সাথে তাদের কোন মিল আছে না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন,‘ তদন্তে স্বার্থে অনেক কিছু বলা যাচ্ছে না।’
প্রসঙ্গত, ২৯ মার্চ বুধবার রাত থেকে বড়হাট ও নাসিরপুর দুইটি জঙ্গি আস্তানা ঘিরে রেখেছিলো পুলিশ ও র্যাব। পৃথক দুটি বাড়িতে জঙ্গি আস্তানায় আশপাশের দুই কিলোমিটার জুড়ে ১৪৪ ধারা জারি করে প্রশাসন। নাসিরপুরে সোয়াত টিমের প্রধান মনিরুল ইসলামের নেতৃত্বে “অপারেশন হিটব্যাক” পরিচালনা করা হয়। অপারেশন হিটব্যাক চলা কালে আত্মঘাতী বোম্ব বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ওই আস্তানায় শিশুসহ ৭জন নিহত হয়। নাসিরপুর অপারেশন হিটব্যাক চলাকালে মৌলভীবাজার পৌরসভার বড়হাট জঙ্গি আস্তানা ঘিরে রাখে পুলিশ ও র্যাব। পরে বড়হাটের জঙ্গি আস্তানায় অভিযানে নামে সোয়াট টিম। অভিযানের নাম দেওয়া হয় “অপারেশন ম্যাক্সিমাস”। এতে নিহত হয় নারীসহ তিন জঙ্গি।



মন্তব্য করুন