পাখিদের অভিবাবক মাষ্টার গোলাম মোস্তাফা রাজা আর নেই

বিকুল চক্রবর্তী॥ শ্রীমঙ্গল পাখির অভয়াশ্রম রাজা ফিসারিজের সত্তাধিকারী পাখি প্রেমী বিট্রিশ নাগরিক মাষ্টার গোলাম মোস্তফা রাজা আর নেই।
৩১ ডিসেম্বর রবিবার ভোরে তার নিজবাসায় গুরুর অসুস্থ হলে সকাল সাড়ে ৬টার দিকে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষনা করেন। নিহত মাষ্টার গোলাম মোস্তাফার বয়স হয়েছিল প্রায় ৮৫ বছর। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, তিন ছেলে ও দুই মেয়েসহ অসংখ্য আত্মীয়সজন রেখে গেছেন।
মাষ্টার গোলাম মোস্তফা রাজা স্ত্রী সন্তান নিয়ে বসবাস করতেন লন্ডনে। ব্যবসা বানিজ্য সবই ছিলো লন্ডনে। কিন্তু দেশের উন্নয়নে তিনি ১৯৮৫ সালের দিকে দেশে এসে শ্রীমঙ্গল হাইল হাওরের পাড়ে বর্তমান রাজারবাগ এলাকায় মাছের চাহিদা পুরণে সিলেট বিভাগে সর্বপ্রথম বৃহৎ ফিসারী প্রতিষ্টা করেন তিনি। ফিসারীর পাশাপাশি তিনি তৈরী করেন হ্যাঁচারী। অল্প দিনেই তাঁর ফিসারীর পরিধি বেড়ে যায়। তাঁর প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান হয় শতাধিক লোকের। ফিসারীর পাড়ে একটি বসতঘর তৈরী করে তিনি নিজেই সেখানে শুরু করেন বসবাস। পুরোদমে বাদদেন লন্ডনে আয়েসী জীবনের সুখ। ব্রতীহন এই ফিসারীজের ব্যবসায়। কিন্তু ফিসারীজের কাজক্রম করতে গিয়ে তার ফিসারীর পাড়ে রোপতি বৃক্ষগুলো তাঁকে এনেদেয় হাজার হাজার পাখি বন্ধু।
মাস্টার গোলাম মোস্তফা রাজা। পারিবারিকভাবে সমৃদ্ধ পরিবারের সন্তান। স্ব-পরিবারে ছিলেন লন্ডনে। কিন্তু তাঁর দেশপ্রেম সেই আয়েসী জীবনের বাঁধ সাধে। স্ত্রী সন্তানদের লন্ডন রেখেই তিনি চলে আসেন দেশে। গড়ে তুলেন শ্রীমঙ্গল হাইল হাওরে এ বিশাল ফিসারী ও হ্যাঁচারী। ফিসারীর পাড়ে নিজ হাতে রোপন করেন হাজার হাজার দেশীয় প্রজাতির বৃক্ষ। বৃক্ষগুলো একটু বড় হতেই সে গাছে আসতে থাকে রাত্রীকালীন অবসরের জন্য অতিথি পাখিরা। সূর্য ডোবার একটু আগে তারা আসে এবং সূর্য উঠার আগেই তারা চলে যায়। দৃষ্টি পড়ে শিকারীদের। পাখি শিকারের রাইফেল হাতে অসংখ্য শিকারী ছুঠে যান তার ফিসারীর পাড়ে। আর এদের হাত থেকে রক্ষার জন্য তিনিও নেমে পড়েন যুদ্ধে। ফিসারীতেই গড়ে তুলেন আবাসন। আর ফিসারীর পাশাপাশি পাখিদের দেখে রাখা তার অন্যতম কাজ হয়ে দাড়ায়। শিকারীদের নিজে তাড়িয়ে দেয়ার পাশাপাশি একসময় তাকে বেশ কয়েকজন পাহারাদারও নিয়োগ করতে হয়। পাখিদের আবাসন নিরাপদ হলে ক্রমেই বাড়তে থাকে পাখির সংখ্যা। পাখির পরিমান ঠিক কতো হবে তা সঠিক করে বলতে না পারলেও তার ফিসারীর পাড়ে প্রত্যেকটি গাছের অগ্রভাগের পাতা ঢেকে যায় পাখির শরীরে এবং দূর থেকে দেখলে মনে হয় ফিসারীর পাড়ের পত্রবিহিন গাছে গাছে সাদা কালো ফুল ফুটে আছে। এভাবে কয়েক বছর অতিবাহিত হওয়ার পর পাখিরা তার এই জায়গাকে তাদের ব্লিডিংএর স্থান হিসিবে বেছেনেয়। খরকুট দিয়ে তারা তৈরী করতে থাকে বাসা। আর সে বাসায় ডিম পেড়ে বাচ্চা ফুটানো। প্রত্যেক বছরেই পাখির ব্লিডিং মৌসুমে তা বাড়তে থাকে আর বতমানে তার ফিসারীতে হাজার হাজার পাখির বাসা। যেখানে নিরাপদে জন্ম নিচ্ছে পাখির নবাগত বাচ্চারা। তার এই পাখির আবাসন শহর থেকে ৭/৮ কিলোমিটার দুরে হাওর অভিমুখে। সেখানে গাড়ি বা কলখারখানার শব্দ নেই। তবে শহরের ঐ শব্দের চেয়ে সেখানে অনেক বেশি শব্দশাষন হয়। সে শব্দ হলো পাখির কলকাকলী বা চিউচিউ। যা মাস্টার গোলাম মোস্তফা রাজার মননে সম্পৃক্ত এক মধুর সুর। পাখি প্রেমী মাস্টার গোলাম মোস্তফা রাজা বলতেন, তার কাছে তার প্রাণই হচ্ছে এই পাখি। এই পাখিদের ছেড়ে কোথাও যেতে মন চায় না। নানান জাতের পাখির আবাসন নান্দনিক করে তুলে তার ফিসারীকে। প্রতিদিন বহু পর্যটক আসেন তার এ পাখি দেখতে ছুঠেযান।
পাখিরা তার ফিসারীতেই বাসা বুনে, ডিম পাড়ে আর সে ডিম থেকে এখানেই জন্ম নেয় লক্ষ লক্ষ পাখি। আর কি চাই? আজকাল সংরক্ষিত বনেওতো পাখিরা নিরাপদ নয়। যে গাছে বাসা বুনবে সে গাছতো গাছ চুরেরা কেটে নিবে। তার এখানে গাছ কেটে নেয়ার সম্ভাবনা নেই। গাছ গুলো আরো কয়েক বছর আগেই প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছে। বিক্রি করলে হয়তো লক্ষ লক্ষ টাকা পাবেন কিন্তু তিনি তা করননি। সরজমিনে দেখা যায় তার বাসার আঙ্গিনা বিভিন্ন ফল ও সবজী সবই পাখির বৃষ্টাতে ভরে আছে। এমকি পাখির ডিসটাব হবে বলে তার দু একটি ফিসারীতে মাছ চাষই বন্ধ করে দিয়েছেন। পাখির জন্য তিনি পত্যেক পুকুরে অতিরিক্ত মাছের পোনা ছাড়তেন।
আজ পাখি আছে নেই তিনি। রবিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত দেখা যায় পাখিরা যেন আজ নিয়ম পাল্টেছে। প্রতিদিন সকাল বেলা পাখিরা হাওরে খাবার খেতে চলে যায় কিন্তু অনেক গুলো পাখি আজ খাবার খেতে যায়নি। মাষ্টার গোলাম মোস্তফার লাশকে ঘিরে বাড়ি ভর্তি হাজার হাজার নারী পুরুষ আর পাখি গুলোর দৃষ্টি সেদিখে। অন্যদিন যেভাবে পাখির কলকাকলীতে ফিসারীর পাড় মুখর থাকতো আজ সে কলকালীও নেই। পাখি গুলো নিরবে বসে আছে। কে জানে হয়তো তাদের মালিকে তাদের শেষ বিদায় জানাতে উপবাস থেকে বসে থাকা।
বর্তমানে তাঁর লাশ হিমায়িত লাশবাহী গাড়িতে রাখা হয়েছে। পারিবারিক সুত্রে জানান যায়, আজ সোমবার তাঁর ছেলেরা লন্ডন থেকে আসার পর শ্রীমঙ্গল শাহী ঈদগাহে জানাজা শেষে ফিসারীতেই তাঁকে দাফন করা হবে।



মন্তব্য করুন