বিশ্ব নারী দিবসে বঞ্চিত নারী চা শ্রমিকরা যাদের কোমল হাতে তৈরী হয় চা তাদের ভাগ্যে ঝুটেনা চা

বিকুল চক্রবতী॥ সকালে ঘুম থেকে উঠে অনেকটা নি:স্তেজ শরীরের সতেজতা আনতে এবং চোখের ঘুম ঘুম ভাব দূর করতে সবার আগে প্রয়োজন এক কাপ চা। এই চা তৈরীর পেছনে কত যে কর্মযোগ্য সম্পন্ন করতে হয় তা চাপায়ী অনেকেরই অজানা। আর এই চায়ের কর্মযোগ্যে সবচেয়ে যাদের অবদান বেশি তারা হলেন চা বাগানের নারী চা শ্রমিক। দেশের গার্মেন্টেস শিল্পের পরেই সর্বাধিক নারী শ্রমিক কাজ করেন টি ইন্ডাস্ট্রিতে। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অক্লান্ত পরিশ্রম করে জীবন চলে এই শ্রমিকদের। চা শ্রমিক নারীদের নরম হাতের কোমল পরশে উঠে আসে চায়ের নরম কুড়ি। আর এই কুড়ি ফেক্টরীতে প্রকৃয়াজাতের পর তৈরী হয় চা। এই নিয়ে বুধবার বিকেলে কথা হয় শ্রীমঙ্গল ভাড়উড়া চা বাগানের ফাঁড়ি বাগান খাইছড়ার গীতা পানিধারের সাথে। গীতা জানান, একটি চা গাছ নিজের সন্তানের মতো। অনেক সময় সন্তানের চেয়েও চা গাছকে তারা বেশি যতœ করেন। চায়ের চারা বাড়ি থেকে চা গাছের ফল আসা পর্যন্ত নিজের হাতে যতœ করেন। চোখের সামনে গাছ রোপনের পর আস্তে আস্তে বড় হয় তার পর পাতা তুলে তেরী চায়ের জন্য ফেক্টরী পর্যন্ত প্রেরণ এক অসাধারণ বন্ধন। কিন্তু দু:খের বিষয় হলো এর ফল ভোগের সৌভাগ্য তাদের কপালে জুটেনা। নিজে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে চা উৎপাদন করলেও তাদেরকে দেয়া হয়না একমুষ্টি চা। গাছের নিচ অংশ থেকে কিছু পাতা নিয়ে শুকিয়ে গুরো করে তা গরম পানিতে ফুটিয়ে তারা চা পানের স্বাদ পুরণ করেন। তিনি জানান, তাদের শরীরটা কালো রংয়ের এর প্রকৃতিগত কারন হলো আদি কাল থেকেই তাদের পূর্ব পুরষ থেকে পর্যাক্রমে রোদে পুড়ে পাতা তুলেন। রোদে থাকলে যে কোন মানুষ কালো হয়ে যান। বৃষ্টির সময় বৃষ্টিতে ভিজেই তাদের পাতা তুলতে হয়। রোদবৃষ্টি ঝড়তুফান সবই তাদের উপর দিয়ে যায়। কারন এই সময়ে তারা যে পাতা তুলেন তার জন্য ৮৫ টাকা মজুরী পান। আর এই মজুরী না পেলে ছেলে-মেয়ে নিয়ে না খেয়ে থাকতে হবে। তাই যত রকমের প্রাকৃতিক দূর্যোগই আসুক না কেন তাদের কাজ বন্ধ হয়না।
অন্যদিকে এরকম পরিশ্রমের পরেও বাড়িতে এসে রাতে শান্তির ঘুম হয়না তাদের। ঘরের ফুটো ছাল দিয়ে ভোরের আধার ঢাকা সূর্যলোকের আলো চোখে পড়েই ঘুম ভাঙ্গে এদের। শুধু জীবিকার সন্ধানে বেরিয়ে পড়ার জন্য নয়, জীবন যুদ্ধে যাওয়ার আগে সংসারের আরও বেশকিছু কাজ শেষ করতে হয় তাদের। তারপর সারাদিন রোদ, বৃষ্টি,ঝড় ও জঙ্গলের পোকা-মাকড়ের কাপড় সহ্য করে চলে কর্মযোগ্য। তারপর নিজ গৃহে ফিরে আবার সংসারের কাজ। এটাই প্রায় লাখের কাছাকাছি নারীদের চা শ্রমিক জীবন। বলাচলে এ শিল্পের জন্য যারা এত অবদান সেই চা শ্রমিক নারীরাই আজ অবহেলিত ও বঞ্চিত। নেই ভালো চিকিৎসা সেবা। মাতৃত্বকালিন মৃত্যুর ঝুকি তাদের থেকেই থাকে। কাজ সেরে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে ক্লান্ত শরীর মলিন মুখ ক্ষুধার্ত হাড্ডিসার দেহখানা নিয়ে ঘরে ফেরার পর আবার শুরু হয় পারিবারিক কাজ। রাতের খাবার শেষে চট-ছালা বিছিয়ে মশারিবিহীন অন্ধকার ঘরে ঠাসাঠাসি ঘরে ছেলে সন্তান নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। এত পরিশ্রমের পর নারী শ্রমিকরা যে মজুরি পায় তা দিয়ে সংসার চালানো কষ্টসাধ্য। অভাব-অনটন নারী শ্রমিকদের এখন নিত্যদিনের সঙ্গী। চা বাগানগুলোতেও নারী শ্রমিক জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধা। নিরাপদ খাবার পানি ও পয়নিস্কাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিতকরা।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের বালিশিরা ভ্যালির সভাপতি চা শ্রমিক নেতা বিজয় হাজরা বলেন, চা বাগান যার উপর ভিত্তি করে চলে তা হচ্ছে চায়ের সবুজ পাতা। একে কেন্দ্র করেই চা বাগানের সবকিছু। আর এই কাজের জন্য যাদের অবদান সবচেয়ে বেশী তারা হচ্ছেন নারী চা শ্রমিক। মুলত তাদের উপরই চা বাগান নির্ভরশীল। তিনি জানান, শুধু চা পাতা চয়ন নয়, তারা গাছের কলম কাঁটা, প্রোনিং বা চারা গাছ রোপণ থেকে শুরু করে গাছের আগাছা পরিষ্কার ও করার কাজেও নিয়োজিত থাকেন। এরপর মজুরি। সেটি নামমাত্র। মাত্র ৮৫ টাকা। পৃথিবীর অন্য কোনো প্রান্তে এত সস্তা শ্রম পাওয়া যাবে না বলে জানান।
একই বাগানে বাসন্তী ভুইয়া বলেন, চা বাগানে এখনো নারীরা অবহেলিত। চিকিৎসা ও শিক্ষা থেকে তারা বঞ্চিত। তাছাড়া খাবারে কি পরিমাণ খাদ্যপ্রাণ অথবা পুষ্টিগুণ রয়েছে এ স¤পর্কে তাদের আদৌ কোনো ধারণা নেই। ক্ষুধা মেটাতে হবে এই প্রয়োজনে খাবার। খাবার তালিকা থাকে মুড়ি, চানাচুর, কাচামরিচ, কাচা চা পাতা, পেয়াজ, আলু ভর্তা বানিয়ে, রুটি। সঙ্গে থাকে বোতল ভর্তি গরম লাল চা। হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে ২৪ কেজি পাতি উত্তোলনের বিপরীতে মাত্র ৮৫ টাকা পেয়ে থাকেন।
তাছাড়া চা বাগানের প্রায় নারীরাই আয়রণের অভাব, রক্তশূন্যতা, স্বাস্থ্যহীনতা, জন্ডিস, ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হতে দেখা যায়। সাধারণ রোগশোকে পর্যাপ্ত চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর ঘটনা এখানে নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। শিক্ষা, বাসস্থান, বিশুদ্ধ পানীয় জল, স্যানিটারি ল্যাট্রিন, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা, বসবাসের জন্য উপযোগী বাসস্থানসহ স্বাস্থ্যসেবার দায়িত্ব বাগান কর্তৃপক্ষের। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে শ্রম আইনে উল্লেখ করা এসবের কোনো কার্যকারিতার প্রয়োগ নেই বলেই চলে।
বাংলাদেশীয় চা সংসদের সিলেট অঞ্চলের চেয়ারম্যান জিএম শিবলী বলেন, চা বাগানে কর্মরত ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ হচ্ছে নারী। পুরুষের চেয়ে নারীদের কাজের গতি বেশি। চা বাগানের মুল কাজ হচ্ছে পাতি তুলা। যা নারীরাই করে থাকে। তারা এই কাজে পারদর্শী এবং তাদের কাজে ফাকি দেওয়ার প্রবনতা নেই বললেই চলে। তারা অতন্ত যতœসহকারীই তাদের দ্বায়িত্ব পালন করে। তবে তাদের বেতন বৈষম্যের বিষয়ে তারা বলেন, ৮৫ টাকার সাথে তারা লাকরী, রেশন, বাসস্থান, চিকিৎসাসহ অনান্য সুবিধাও পেয়ে থাকেন। আর যে বেতন দেয়া হয় তা বাংলাদেশীয় চা সংসদ ও বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের চুক্তিতেই সম্পন্ন হয়। আগামীতে চুক্তি হলে তা বাড়তে পারে।
এদিকে চা শ্রমিকের বর্তমান প্রজন্মের তরুনীরা প্রায় সবাই লেখা পড়া করছে। তবে লেখা পড়া শিখেও তারা চা পাতা তুলার কাজ করতে আগ্রহী বলে জানায় ভাড়াউড়া চা বাগানে ৯ম শ্রেণীর ছাত্রী লক্ষি হাজরা।
তবে কোন প্রকার ছলছাতুরতায় মত্ত না হয়ে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের দ্বি বার্ষিক চুক্তিতে শ্রমিকদের স্বার্থের বিষয়টিই উঠে আসবে এমনটাই চাওয়া এসব নিরিহ চা শ্রমিকদের।



মন্তব্য করুন