১০৪০ টাকা মন দরে কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ শুরু করায় ওয়ার্কার্স পার্টি স্বাগত জানিয়েছে

শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি॥ সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ১০৪০ টাকা মন দরে ধান সংগ্রহ শুরু করায় বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা ও শ্রীমঙ্গল পৌর শাখা স্বাগত জানিয়েছে।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে ২০১৯-২০ অর্থ বছরের সরাসরি কষকের কাছ আমন ধান সংগ্রহ কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়।
উপজেলা খাদ্য গুদামে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে ধান সংগ্রহ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন অনুমিত হিসাব সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা উপাধ্যক্ষ ড. মোঃ আব্দুস শহীদ এমপি।
এসময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ নজরুল ইসলাম, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহমুদুর রহমান মামুন, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিলুফার ইয়াসমিন মুনালিসা সুইটি, ওসি-এলএসডি মনোয়ার হোসেন, উপজেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম সম্পাদক এনাম হোসেন চৌধুরী মামুন ও আকরাম খাঁন, উপজেলা আ. লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছালিক আহমেদ, আওয়ামীলীগের অন্যান্য নেতৃবৃন্দসহ সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীরগণ।
অনুষ্ঠানের শুরুতে ফিতা কেটে ও ৩ টন আমন ধান সংগ্রহের মধ্য দিয়ে এ কর্মসূচি’র উদ্বোধন করা হয়। সরকার প্রতি মন ধান ১০৪০ টাকা দরে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে সংগ্রহ করছে।
আব্দুস শহীদ এমপি বলেন, ধানের কাঙ্খিত দাম যেন কৃষকরা পায় সে জন্য ধানের বাজার মূল্যের চেয়ে সাড়ে ৪শ’ টাকা বেশি করে দেয়া হচ্ছে। যেখানে বাজারে প্রতি মন ধান বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ৫শ’ থেকে ৬শ’ টাকায়। ধানের কাঙ্খিত দাম পেয়ে এবার কৃষকরাও অনেক খুশি।
সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ১০৪০ টাকা মন দরে ধান সংগ্রহের কার্যক্রম শুরু হওয়া সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে আমাদের প্রতিনিধিকে সরকারি এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের প্রধান সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেন, “আমন ধানের ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা ২০ লাখ টন নির্ধারণ, বরাদ্দকৃত আমন ধান ক্রয়ে কৃষকের নামের তালিকা প্রণয়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, কৃষকের নামের তালিকা চূড়ান্তকরনে লটারী আয়োজন, ধান ক্রয়ের নীতিমালা প্রতিটি ইউনিয়নে মাইকিং-এর মাধ্যমে প্রচার করা, দুর্নীতি ও দলীয়করন কঠোরভাবে দমন, প্রতিটি ইউনিয়নে ধান ক্রয় কেন্দ্র খোলা, ক্রয় কেন্দ্রে মধ্যস্বত্বভোগী, ফড়িয়া, টাউট এবং মাস্তানদের দৌরাত্ম্য কঠোর হস্তে দমন, উপজেলা খাদ্যশস্য ক্রয় কমিটিতে কার্যকর কৃষক নেতৃত্বের সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত, চাল, পিয়াজ, লবনসহ নিত্য পণ্য দ্রব্যসামগ্রীর অসাধু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, নিয়মিত বাজার মনিটরিং করার দাবী যৌক্তিক।”
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য ও বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়নের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেন, “গেলো বোরো মৌসুমে কৃষক ধান নিয়ে মহাবিপাকে পড়েছিলেন। ২০১৭ সালের বন্যার অজুহাতে ঘাটতির চেয়ে আমদানী করা হয়েছিল অনেক বেশী চাল। প্রায় ৪০ লাখ টন। অপরিকল্পিত আমদানির কারণে বোরো ধানের বাজারে নেমে এসেছিল ভয়াবহ মন্দা। ফলে সরকার ঘোষিত মূল্যের অর্ধেক দামের নীচে কৃষককে ধান বিক্রি করতে হয়েছিল। হিসেব মতে, পানির দরে ধান বিক্রয় করে কৃষকের ক্ষতি হয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা। বাজার ব্যবস্থাপনায় সরকারের নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি ব্যবস্থা না থাকায় বাজারে মজুতদারি এবং সিন্ডিকেটের দৌড়াত্ব ক্রমগত বেড়ে যাচ্ছে। পেঁয়াজের দামের লাগামহীন উর্ধগতি এবং চালের বাজারের অস্থিরতা এর উৎকৃষ্ট প্রমান। গেল বছর কৃষককে পানির দরে ধান বিক্রি করতে হয়েছে। এখনো ধানের বাজার নিম্নগামী। কিন্তু বাজারে চালের দাম ক্রমগত বাড়ছে। এতে উৎপাদক ও ভোক্তা দু’পক্ষই চরম দূর্ভোগের স্বীকার। গেল বছর বোরো মৌসুমে কৃষকের দূরাবস্থা নিরসনে জাতীয় কৃষক সমিতি ও খেতমজুর ইউনিয়ন দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলায় মানববন্ধন, বিক্ষোভ এবং সমাবেশের মাধ্যমে সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট দাবিনামা পেশ করে। দাবিনামার প্রেক্ষিতে সরকার দুই কিস্তিতে ৪ লাখ টন ধান সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে কেনার প্রতিশ্রুতি দিলেও ঘোষিত ৪ লাখ মিঃ টন ধান সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে কেনা যায়নি। এ কথা কৃষিমন্ত্রী অকপটে স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, “সরকারিভাবে ধান ক্রয়ে কৃষক লাভবান হয়নি। লাভবান হয়েছে মধ্যস্বত্বভোগি ও দলীয় কর্মীরা”। কৃষক যাতে লাভবান হন সেই জন্য তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ধান গুদামজাত ও সংরক্ষণে আগামীতে ২০০টি স্থানে প্যাডি সাইলো স্থাপন, প্রতিটি ইউনিয়নে আদ্রতা নির্ণায়ক যন্ত্র সরবরাহ করা হবে। ধানসহ কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রদান নিশ্চিত করা, সাইলো নির্মাণ, খেতমজুরসহ গ্রামীণ কৃষিজীবী ও নারীদের পেনশন প্রদানের দাবী করতে হবে।
সরকারী নীতিমালা অনুযায়ী সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান-চাল না কিনে সুবিধাভোগিদের (ফড়িয়া-মধ্যস্বত্বভোগী) কাছ থেকে কেনা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য সংগ্রহ নীতিমালা-২০১৭ অনুযায়ী কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান-চাল কিনতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তাও জানতে চাওয়া হয়েছে রুলে। হাইকোর্টের এই রুল কৃষক আন্দোলনে আইনি লড়াইয়ে এক নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে।”
সৈয়দ আমিরুজ্জামান আরও বলেন, “অবশেষে, সরকার চলতি বছরে আমন মৌসুমে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ছাব্বিশ টাকা কেজি দরে ছয় লাখ মেঃ টন ধান কেনার ঘোষণা দিয়েছেন। ৩ লাখ ৫০ হাজার টন চাল সংগ্রহ করবেন মিলারদের কাছ থেকে। ধান-চাল কেনা হবে খাদ্য সংগ্রহ নীতিমালা-২০১৭ অনুযায়ী।ইতোমধ্যে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা তিন স্তরে; ধনী, মাঝারী এবং ক্ষুদ্র কৃষকের তালিকা তাদের ওয়েবপোটালে প্রকাশ করার কথা। উপজেলা খাদ্য ক্রয় কমিটি প্রকাশিত তালিকার আলোকে লটারির মাধ্যমে কৃষক বাছাই করবেন। বাছাইকৃত কৃষকরা সরকারের কাছে ধান বিক্রয় করতে পারবেন। কৃষকের নিজস্ব ব্যাংক একাউন্টে বিক্রিত ধানের টাকা জমা হবে। কৃষক যাতে হয়রানির স্বীকার না হন সেই জন্য প্রতিটি ইউনিয়নে আদ্রর্তা মেশিন সরবরাহ করা হবে মর্মে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।”
তিনি আরও বলেন, “২০ নভেম্বর ২০১৯ থেকে আমান ধান ক্রয় করার ঘোষণা দিয়েছেন সরকার। উৎপাদনের বিপরীতে আমন ধান ক্রয়ের পরিমাণ খুব বেশী না হলেও এবারই প্রথম ব্যবসায়ীদের চেয়ে কৃষকের কাছ থেকে বেশি পরিমাণ ধান কেনার ঘোষণা এসেছে। সরকারের এই ঘোষণাকে আমরা স্বাগত জানাচ্ছি। সরকারের ধান ক্রয় নীতিমালা-২০১৭ বলা আছে, বড় কৃষকের ২০%, মাঝারি কৃষকের-৩০% এবং ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের কাছ থেকে ৫০% ধান ক্রয় করা হবে।”
তিনি বলেন, “কৃষিতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করছে ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও গরীব কৃষকরা। এরাই দেশের মোট কৃষি পরিবারে ৮৮.৪৮ শতাংশ। এদের মালিকানাধীন চাষযোগ্য জমির পরিমাণ মাত্র ৩৬.৩০ শতাংশ। এরা নিজেদের সামান্য জমিতে চাষবাদ করার পাশাপাশি মাঝারি ও বড় কৃষকদের জমি বর্গা বা লিজ নিয়ে চাষ করে। এরা খেতমজুর না কৃষক-এই পরিচয় সুস্পষ্ট করার ক্ষেত্রে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছে। বড় কৃষকরা এখন জমি চাষাবাদ করছেন না। মাঝারি কৃষকরা কৃষি কাজ থেকে নিজকে প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন। তাই ধান কেনার ক্ষেত্রে বড় কৃষক নয়- ক্ষুদ্র, প্রান্তিক, গরীব ও মাঝারি কৃষকের স্বার্থ সবার আগে বিবেচনায় নিতে হবে। সরকার ঘোষিত নীতিমালা বাস্তবায়নে মাঠ পর্যায়ের বাংলাদেশের সকল কৃষক-খেতমজুর সংগঠনকে এগিয়ে আসার উদাত্ত আহবান জানাচ্ছি। এই অবস্থায় কৃষি ও কৃষক রক্ষায়, খেতমজুরদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিম্নোক্ত দাবিনামা বিবেচনা করার আহবান জানাচ্ছি :-
১। আমন ধান ক্রয়ের লক্ষমাত্রা ২০ লাখ মে: টনে উন্নীত করা। কৃষকের জন্য বরাদ্ধকৃত ৬ লাখ টন আমন ধান ক্রয়ে কৃষকের নামের তালিকা প্রনয়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। ধানক্রয়ের নীতিমালা প্রতিটি ইউনিয়নে মাইকিং করে প্রচারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
২। সরকারি গুদামে ধান সবরাহকারী কৃষকদের নামের তালিকা চূড়ান্ত করার “লটারী” প্রকাশ্যেই করার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে দূর্নীতি ও দলীয়করণ কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। প্রতিটি ইউনিয়নে ধান ক্রয় কেন্দ্র খোলা, ক্রয় কেন্দ্রে মধ্যস্বত্বভোগী, ফড়িয়া, টাউট এবং মাস্তানদের দৌরাত্ম্য দমনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৩। উপজেলা খাদ্যশস্য ক্রয় কমিটিতে কার্যকর কৃষক ও খেতমজুর সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। চালকল মালিকরা তাদের মজুতকৃত নিম্নমানের চাল যাতে সরকারি মূল্যে সরকারের নিকট বিক্রয় করতে না পারে সে জন্য তদারকি ব্যবস্থা করা;
৪। খোদ কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয় ও তা গুদামজাত ও বিপনন করতে প্রতিটি উপজেলায় প্যাডি সাইলো নিমার্ণ করা এবং তার পরিচালনা সংশ্লিষ্ট এলাকা গ্রোয়ার কো-অপারেটিক্সে (উৎপাদক সমবায়) উপর ন্যস্ত করা;
৫। ‘৮৭-এর ভূমি সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী বর্গাচাষীদের বর্গাস্বত্ব প্রদান করা এবং তাদের সমিতিতে সংগঠিত করে কৃষি ঋণ প্রদান করা;
৬। উৎপাদক কৃষকদের সমবায় করে তাদের সাশ্রয়ী সুদে ঋণ দেয়া।উৎপাদনের উপকরণ যেমন- সার, বীজ, কৃষি যন্ত্রপাতিতে ভর্তুকী আরও বাড়ানো এবং এসব সমবায় বা সমিতির মাধ্যমে দেয়া;
৭। সমবায় আইনের সংশোধন করে তাকে আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা।
৮। সারাদেশে খেতমজুরদের নিবন্ধন ও কার্ড প্রদান এবং খেতমজুরদের সারা বছরের কাজের নিশ্চিয়তা প্রদানের ব্যবস্থা করা;
৯। গ্রাম ও শহরের ৬০ বছরের উর্ধে খেতমজুর, ভূমিহীন, শ্রমজীবি মানুষের জন্য সার্বজনীন এককালিন পেনশন ও মাসিক ভাতার বিশেষ ব্যবস্থা করা।”
তিনি বলেন, “গত ৮-১০ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’দেশের উপকূলীয় দক্ষিণাঞ্চলের জেলা গুলোর উপরে আঘাত হানে। ঝড়ের আঘাতে উপকূলীয় পাশ্ববর্তী ১৬ জেলার ১০৩ উপজেলায় রোপা আমান, শীতকালীন শাক-সবজি, সরিষা, খেসারী, মসুর, পানসহ অন্যান্য ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আমি ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের কৃষি পুনর্বাসনে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের দাবি জানাচ্ছি। দূর্যোগকালিন সময়ে সকল এনজিওর কিস্তি সুদ মওকুফ এবং লোন আদায় বন্ধ করার জোর দাবি জানাচ্ছি।”
আরো বলেন, “মধ্যস্বত্বভোগী, ফড়িয়া-টাউট, সিন্ডিকেট বা কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থে নয় -কৃষকের স্বার্থে বাজার ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা। উৎপাদক ও ভোক্তা পর্যায়ে বাজার ব্যবস্থাপনায় সমবায় ব্যবস্থা জোরদার করা। এটাই মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা।”



মন্তব্য করুন