সততার জন্য বিসর্জন দিতে হলো জীবন ॥ বিপন্ন হলো পুরো পরিবার

December 23, 2019,

বিকুল চক্রবতী॥ মহান মুক্তিযুদ্ধে জীবন দিয়ে সততার দাম দিয়েছেন শ্রীমঙ্গল লাহারপুরের গুলগাও এর আঞ্জব উল্লা মালগাড়ি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সহায়তা করেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের। যার জন্য রক্ষা পেয়েছেন অনেক মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী মানুষ। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৮ বছর অতিক্রান্ত হলেও আজ পর্যন্ত কেউ খোঁজ নেয়নি আঞ্জব উল্লার পরিবারের। মানবেতর জীবন যাপন করছেন তাঁর ছেলে মেয়ে ও নাতি নাতল। এ চিত্র শুধু আঞ্জব উল্লার পরিবারে নয় স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রাণ হারানো মৌলভীবাজারের শত শত পরিবারে তা বিরাজমান। অতচ মুক্তিযুদ্ধে আত্মত্যাগী প্রতি পরিবারেই রয়েছে এক একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস। যা সময়ের আর্বতে হারিয়ে যাচ্ছে। পরিবারটি মুল্যায়িত না হওয়ায় শহীদানের নিজের পরিবারের নতুন প্রজন্মের অনেকেই জানেনা তার আত্মজনের আত্মদানের কাহিনী। এমনই একটি পরিবার মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার সিন্দুরখান ইউনিয়নের লাহার পুরের গণহত্যায় শহীদ আঞ্জব উল্লার পরিবার।

সম্প্রতি আঞ্জব উল্লার তথ্য সংগ্রহ করতে লাহারপুর যাই।  গ্রামে প্রবেশ করে সেলিম মিয়া নামে এক যুবককে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়া আঞ্জব উল্লার বাড়ি চিনেন কিনা জানতে চালইলে তিনি না করেন। এ সময় আরো কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করলে তারাও বলেতে পারেননি।  পরে বয়স্ক একজন কৃষককের কাছে জানতে চাইলে তিনি গণহত্যায় শহীদ আঞ্জব উল্লাকে চিনেন না তবে মালগাড়ী নামে একজনকে চিনতেন যিনি মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন বলে জানান। এ থেকে অনুমেয় হয় আস্তে আস্তে  আত্ম ত্যাগের মহিমান্বিত আমাদের মুক্তিযুদ্ধের  ইতিহাস  কিভাবে হারিয়ে যাচ্ছে। তবে এখনও প্রবীণদের কাছে কিছু কিছু জীবন্ত ইতিহাস বিরাজমান আছে। দুপুরের দিকে আঞ্জব উল্লার বাড়িতে পৌছি। কথা হয় তাঁর পরিবার, পাড়া প্রতিবেশী ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে। উঠে আসে গণহত্যায় শহীদ আঞ্জব আলীর শহীদ হওয়ার  পেছনের কাহিনী এবং মারা যাওয়ার পর তাঁর ৮ সন্তান কে নিয়ে মা ও স্ত্রীর বেঁচে থাকার জন্য যে যুদ্ধ করতে হয়েছে সে ইতিহাস। আর এ  করুন কাহিনী শোনার সময় স্বজনদের নয়ন ধারা ঝড়ছিলো নিরবধি। যা মনেকরিয়ে দেয় তাদের পরিবারের কাছে আমাদের ঋণের মাত্রা।

স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে শ্রীমঙ্গল সাঁতগাও দত্তবাড়ীর মহিলারা আঞ্জব উল্লার কাছে বেশ কিছু সোনা গহনা টাকা ও মুল্যবান মালামাল ভারতে স্মরনার্থী ক্যাম্পে তাদের স্বজনদের পৌছে দিতে বললে তিনি তা পৌছে দেন। লক্ষ লক্ষ টাকার মালামাল সঠিক ভাবে পৌছে দেয়ায় ঐ পরিবারটি মানুষের কাছে আঞ্জব উল্লার সততার প্রশংসা করেন। কিন্তু এই প্রশংসা কাল হয়ে দাড়ায়। খবর চলে যায় রাজাকারদের কাছে। এলাকার প্রখ্যাত নুর মেম্বার ও শইন্না রাজাকার পাক সেনা এনে সাঁতগাও থেকে ধরে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধাদের সহায়তার অভিযোগে সাধুবারতলী বধ্যভুমিতে গুলি করে হত্যা করে।  অশ্রু সিক্ত নয়নে কথা গুলো বলছিলেন  শহীদ আঞ্জব উল্লার  ৩য় ছেলে কাদের মিয়া ।

তাঁর ২য় ছেলে  আব্দুল মতিন জানান, তখন ছিলো ভাদ্রমাস। বাবার সাথে সাঁতগাও  বাজারে গিয়েছিলেন তিনি। বাবা মাছ কিনে ছেলেকে বলেন বাড়িতে দিয়ে আসতে। এ সময় রাজাকার নুর মেম্বার ও শইন্না রাজাকার এসে আঞ্জব  উল্লাকে ঝাঁপটে ধরে। সাথে সাথে পাকিস্তানী মেলেটারী তাকে চার দিক থেকে ঘিরে ধরে। এর পর তাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায় শ্রীমঙ্গল ১০ নম্বর শ্রমকল্যাণ অফিসে সেখানে টরসার সেলে রেখে মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য নিতে চালায় অমানবিক নির্যাতন। তিনি জানান, ক্যাপ্টেন আজিজসহ কয়েকজন গেরিলা মুক্তিযুদ্ধার সোর্স হিসেবেও কাজ করেন আঞ্জব উল্লাহ। বিষয়টি রাজাকাররা স্থানিয় ভাবে খোঁজ দিয়ে পাকিস্তানী বাহিনীকে জানায়।  তিনি মুখ না খুললে এক সাপ্তাহ পরে সাধু বাবার স্থলিতে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে পাকবাহিনী।

এর পর তাঁর ৪ ছেলে ৪ মেয়ে নিয়ে স্ত্রী ও মা খেয়ে না খেয়ে মানুষের বাড়ি কাজ করে কোন রকমে জীবন যাপন করেন। কোন সন্তানকেই লেখা পড়া করাতে পারেননি। ছেলেরা বড় হওয়ার পর বর্গা চাষ করে তাদের জীবন চলে যা আজও অভ্যাহত। অন্যদিকে রাজাকাররা আছে অর্থবিত্তে বহালতবিয়তে।

মুক্তিযোদ্ধা   আব্দুল কাদির  সানু ও  মুক্তিযুদ্ধা আমিরুল মেম্বার  জানান, আঞ্জব উল্লা সহজ সরল মানুষ ছিলেন। ভারত থেকে মালামাল আনা নেয়া করতেন। সীমান্তের রাস্তাঘাট তাঁর জানা ছিলো। বহু মুক্তিযোদ্ধাদের তাদের বাড়ির খবর, রাজাকারদেও খরবর ভারতে গিয়ে দিয়েছেন। সরনার্থীদের সহায়তা করতেন প্রতিনিয়ত। দত্ত গ্রামের এক বাড়ির মালামাল পৌছে দেয়ার পর ওই পরিবারের প্রশংসায় তার জনপ্রিয়তা আরো বেড়ে যায়। এলাকার বিপদগস্থ  মানুষের সহায়ক শক্তি হয়ে দাড়ান তিনি। কিন্তু রাজাকারের দল তাকে ধরিয়ে দেয় পাক বাহিনীর হাতে।  তারা জানান, তাদের এ এলাকায় মুক্তিযোদ্ধা জৈন উল্লা, চেরাগ আলী,  আব্দুর রহমান, মুক্তিযুদ্ধা মছব্বির মিয়ার ভাই আব্দুল বাশারসহ ৭/৮ জনের সাথে তাঁকেও  ধরে সাধুবাবার স্থলিতে নিয়ে হত্যা করে।

আঞ্জব  উল্লার কোন ছবি পাওয়া যায়নি।  তবে তাকে যারা দেখেছেন তাদের বর্ননা অনুযায়ী আঞ্জব উল্লা দেখতে ছিলেন লম্বাটে ও সু-স্বাস্থ্যের অধিকারী। মূখে ছিলো হালকা দাড়ি। আচার- আছরণ ছিলো সরল প্রকৃতির। সততা ছিলো তার বড় ধর্ম। সীমান্ত  এলাকায় ফেরী করে মালামাল বিক্রি করে  এবং অন্যের মাল আনা নেয়া করে চলাতেন সংসার। খিলগাও এলাকার নৃপেন্দ্র চন্দ্র দেব জানান, ২৬ শে মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষনার পর এ দেশের মুক্তিকামী মানুষেরা ঝাঁপিয়ে পড়ে স্বাধীনতার আন্দোলনে। অনেকেই সাতগাও লাহারপুর দত্তগ্রামসহ আশে পাশের গ্রামে আশ্রয় নেন। রাস্তাঘাট চেনা জানা থাকার সুবাদে আঞ্জব উল্লা বাংলাদেশ থেকে মুক্তিযোদ্ধা ও স্বরনার্থীদের ভারত পৌছে দেন। তাদের বাড়িতে আশ্রয় নেয়া তাদের ৯ জন আত্মীয়কে ভারতে পৌছে দেন। বিভিন্ন স্বরনার্থীদের মালামাল নিয়েদেন ভারতে। আবার ভারত থেকে নিয়ে আসেন বাংলাদেশে। ট্রেনিং শেষে গেরিলা যুদ্ধাদের দেশে নিয়ে আসেন। তাদের অস্ত্র বহন করেন।

এলাকার জিতেন্দ্র দেব জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের পাশের গ্রামের পাকিস্তান সেনা সদস্য বারিক মিয়াকে ভারতে মুক্তিবাহিনীর ট্রেনিং ক্যাম্পে পৌছেদেন। যে দিন তাকে পৌছে দেন পরের দিনই বারিক মিয়ার বাড়িতে রাজাকাররা হানা দেয়।

এভাবে মানুষের ও যুদ্ধাদের উপকারী বন্ধু হিসেবে খ্যাত হন তিঁনি। আর মালামাল নিরাপদে আনা নেয়া করায় এক সময় সরল প্রকৃতির এর মানুষটির নামের পাশে জুড়ে দেয়া হয় মালগাড়ি। এলাকায় এক নামে (আঞ্জব উল্লা মালগাড়ি ) হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেন।

এরকম ভিন্ন ভিন্ন গল্প রয়েছে মৌলভীবাজারের রাজনগরের পাঁচগাও, ধরের বাড়ি, খার পাড়া, রাজনগর উচ্চ বিদ্যালয়ের পেছনে  পৌটিয়াস স্কুল। কুলাউড়ার জয়চন্ডির ঘোষ পট্টি, পৃথিমপাশা, জয়চন্ডি, লুহাইউনি, কমলগঞ্জের সমশেরনগর, পাত্রখলা, চৈত্রঘাট, শ্রীমঙ্গলের ভাড়াউড়া চা বাগান, উত্তর ভাড়াউড়া, বৌলাছড়া, পূর্বাশা, সবুজবাগ, সাধুবাবারস্থলি, ভুনবীর ও সিন্দুরখানসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় গণহত্যায় নিহত হওয়া সহস্রাধিক পরিবারে। সে পরিবার গুলো নি:সন্দেহে আমাদের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অংশ। যা থেকে উঠে আসবে মুক্তিযুদ্ধের অজানাসব গল্প।

এই পরিবার গুলোকে মুল্যায়নের পাশাপাশি সংরক্ষন করা প্রয়োজন জীবন উৎসর্গ করা শহীদানদের আত্মত্যাগী ইতিহাস।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com