নিম্নতম মজুরির প্রজ্ঞাপন বাতিল করে ন্যায্য মজুরি ঘোষণার দাবি চা-শ্রমিক সংঘের

August 15, 2023,

স্টাফ রিপোর্টার॥ বৃহস্পতিবার ১০ আগষ্ট সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সারদেশে চা-শিল্পে কর্মরত শ্রমিক ও কর্মচারীদের নিম্নতম মজুরি হার ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করেন।

বর্তমান দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্দ্ধগতির এই সময়ে সরকার দীর্ঘ ১৩ বছরের বেশি সময় পর চা-শ্রমিকদের জন্য ‘এ’ ক্লাস বাগানে দৈনিক ১৭০ টাকা, ‘বি’ ও ‘সি’ ক্লাস বাগানে যথাক্রমে ১৬৯ টাকা ও ১৬৮ টাকা নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করেন। এর আগে ২০১০ সালে চা-শ্রমিকদের জন্য নিম্নতম মজুরি ঘোষণা করা হয়েছিল।

চা-শ্রমিক সংঘ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির আহবায়ক রাজদেও কৈরী ও যুগ্ম-আহাবয়ক শ্যামল অলমিক একযুক্ত বিবৃতিতে সরকার ঘোষিত মজুরিকে শ্রমিকস্বার্থের পরিপন্থি আখ্যায়িত করে অবিলম্বে তা বাতিল করে বাজারদরের সাথে সংগতিপূর্ণ ন্যায্য মজুরি ঘোষণা করার দাবি জানান।

নেতৃবৃন্দ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন ২০১৯ সালের ২২ অক্টোবর চা-শিল্পের নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের দীর্ঘ প্রায় ৪ বছর (৩ বছর ১০ মাস) পর সরকার যে মজুরি ঘোষণা করেছে তা শ্রমিকরা গত বছরের আগষ্ট মাস থেকেই পেয়েই আসছেন। চা-শিল্পের ১৬৯ বছর পরেও শ্রমিকদের মজুরি মাত্র ১৬৮ টাকা।

শুধু তাই নয় চা-শিল্পে মজুরি বৃদ্ধির প্রথা অনুযায়ী মজুরি বোর্ড নির্ধারিত মজুরি ২০২১-২০২২ বছরের মেয়াদেই শেষ হয়ে গেছে। চা-শ্রমিকরা যেখানে নতুন মজুরি নির্ধারণের জন্য দাবি জানিয়ে আসছেন সেখানে মজুরি বোর্ড আগামী ৫ বছরের জন্য পূর্বেই মজুরিকে নির্ধারণ করে মালিকদের স্বার্থে নির্লজ্জ পক্ষপাতিত্ব করেছে।

সরকারের পরিসংখ্যান বুরো মূল্যস্ফীতি প্রায় ১০ শতাংশের কথা বললেও মজুরি বোড প্রতিবছর শ্রমিকদের জন্য শতকরা ৫ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধির কথা বলেছে।

মজুরি বোর্ডের কাজ হচ্ছে শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় ভূমিকা নেওয়া। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে আমাদের দেশে মজুরি বোর্ডে সরকার ও মালিকপক্ষ যেমন একাকার হয়ে ভূমিকা পালন করে তেমনি মালিকের দালাল শ্রমিকনেতাদের বোর্ডে সদস্য করে ত্রিপক্ষীয় মজুরি বোর্ড কার্যতঃ একপক্ষীয় মজুরি বোর্ডে পরিণিত করে মালিকদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে।

যার ব্যতিক্রম ঘটেনি চা-শিল্পের মজুরি বোর্ডেও। শ্রমিকরা বর্তমানে ৫২ দিনের মজুরির সমান উৎসব বোনাস পেয়ে থাকলেও মজুরি বোর্ড ৪৭ দিনের মজুরির সমান উৎসব বোনাস নির্ধারণ করেছে।

সরকার কথায় কথায় উন্নয়নের সাফাই এবং শ্রমিক বান্ধব সরকার বলে দাবি করলেও সরকারের মজুরি বোর্ড শ্রমিকদের পানীয় জলের জন্য ২০ টি পরিবারের জন্য একটি কুয়ার ব্যবস্থা করার কথা বলেছে।

অথচ বাংলাদেশ শ্রমআইন-২০০৬ এর ৫৮ ধারায় পান করার জন্য বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করার আইন আছে।

কূয়ার পানি কি করে বিশুদ্ধ পানি হয়? না কি চা-শ্রমিকদের জন্য বিশুদ্ধ পানির প্রয়োজন নেই ? নেতৃবৃন্দ বলেন মজুরি বোর্ডে ২০২০ সালের ৯ ফেব্রুযারি চা-শ্রমিক সংঘের পক্ষ থেকে বাজারদর, শ্রমিকদের জীবনমান, মালিকদের সক্ষমতা ইত্যাদি বিচার বিশ্লেষণ করে বাজারদরের সাথে সংগতিপূর্ণভাবে নিম্নতম মজুরি দৈনিক ৬৭০ টাকা নির্ধারণসহ ১১ দফা দাবি জানানো হয়।

পরবর্তীতে মজুরি বোর্ড ঘোষিত খসড়া সুপারিশের প্রেক্ষিতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ২০২১ সালে ২১ জুন আপত্তি জানিয়ে ১২ টি বিষয়ে সুনির্দ্দিষ্ট প্রস্তাবণা পেশ করে। কিন্তু মজুরি বোর্ড কোন কিছুকেই আমলে না নিয়ে মালিকদের স্বার্থ রক্ষায় ভূমিকা নিয়েছে।

নেতৃবৃন্দ বলেন মজুরি বোর্ড ঘোষিত ৪২ টি শিল্প সেক্টরের নিম্নতম মজুরি মধ্যে চা-শ্রমিকদের জন্য সর্বনিম্ন মজুরি ঘোষণা করা হয়েছে।

এমন কি চলতি বছরের ৩০ জুন মজুরি বোর্ড রাবার শ্রমিকদের (টেপার) জন্য নিম্নতম মূল মজুরি ৭ হাজার ২০০ টাকা (দৈনিক ২৭৬ টাকা) ঘোষণা করে।

সরকার কথায় কথায় বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচকে প্রতিবেশিদের থেকে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে থাকার কথা বললেও প্রতিবেশি ভারত, শ্রীলঙ্কায়, নেপালসহ শীর্ষ চা উৎপাদনকারী দেশ চীন ও কেনিয়ার চেয়ে আমাদের দেশের চা-শ্রমিকদের মজুরি অনেক কম।

নেতৃবৃন্দ বলেন একটি সাধারণমানের হোটেলে দৈনিক তিন বেলা অতি সাধারণভাবে আহারের জন্য ২৫০ (১০০+১০০+৫০) টাকা দিলেও পেট ভরে না।

একজন শ্রমিকের দৈনিক পরিশ্রমের পর পরবর্তি দিন কাজে যোগদানের জন্য শক্তি সঞ্চয়ের প্রয়োজনে পারিবারিকভাবে স্ত্রী পুত্র কন্যাসহ মা-বাবাকে নিয়ে ৬ সদস্যের এক পরিবারের জন্য দৈনিক ন্যূনতম ৮০০/১০০০ টাকা দরকার।

এমতবস্থায় নিম্নতম মজুরির প্রজ্ঞাপন বাতিল করে বর্তমান বাজারদরের সাথে সংগতিপূর্ণভাবে ৬/৭ জনের পরিবারের ভরণপোষণের জন্য ন্যায্য মজুরি নির্ধারণসহ চা-শিল্পে নৈমিত্তিক ছুটি (বছরে ১০ দিন) কার্যকর ও অর্জিত ছুটি প্রদানে বৈষম্যসহ শ্রম আইনের বৈষম্য নিরসন করে গণতান্ত্রিক শ্রমআইন প্রণয়ন এবং সাপ্তাহিক ছুটির দিনে মজুরি ও উৎসব বোনাস প্রদানে সকল অনিয়ম বন্ধ করে শ্রমআইন মোতাবেক নিয়োগপত্র, পরিচয়পত্র, সার্ভিস বুক প্রদান এবং ৯০ দিন কাজ করলেই সকল শ্রমিককে স্থায়ী করার বিষয় যুক্ত করে পুণরায় প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করার দাবি জানান।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com