হযরত শাহ্ মইন উদ্দিন (রহঃ) এর উরুস উপলক্ষে ঐতিহ্যবাহী সাদা ভাতের শিরনি মেলা অনুষ্ঠিত

স্টাফ রিপোর্টার॥ প্রতি বছরের ন্যায় এবারও অনুষ্ঠিত হলো মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বাজরা কোনায় হযরত শাহ্ মইন উদ্দিন (রহঃ) এর উরুস মোবারক। এ উপলক্ষে মাজার প্রাঙ্গনে সাদা ভাত ও ক্ষীর শিরনি বিতরণের আয়োজন হয়। বিভিন্ন স্থান থেকে রান্না করে ভক্তরা ছোট বড় হাঁড়ি-পাতিল ভর্তি শিরনী হিসেবে নিয়ে আসেন। রোগ বালাই দূর করতে শিরনী খেয়ে অনেকেই বাড়ীতে নিয়ে যান পরিবারের সদস্যদের জন্য। সঙ্গে ছোট বড় হাঁড়ি-পাতিল ভর্তি ভাত আর ক্ষীর।
বাড়ী বাড়ী রান্না করা ভাত ও ক্ষীর হযরত শাহ্ মইন উদ্দিন (রহঃ) এর মাজার শরীফ প্রাঙ্গনে ভক্তরা নিয়ে আসেন বাদ যোহর। মান্নত হিসেবে নিয়ে আসা এই শিরনীর আলাদা বৈশিষ্ট হচ্ছে সাদা ভাত ও খিচুরী। এর সাথে থাকেনা কোন কোন প্রকার মাংস। যারা নিয়ে আসেন তারা মাজার প্রাঙ্গণের দু’টি বড় আকারের স্থায়ী পাকা পাত্রে ওই শিরনিগুলো আলাদা করে জমা দেন। জমাকৃত ভাত ও ক্ষীর শিরনিগুলো একদল স্বেচ্ছাসেবক তাওয়া দিয়ে নাড়াচড়া করে তা মিশ্রণ করতে থাকেন। সকাল থেকে শুরু হয়ে আসরের নামাজের আগ পর্যন্ত শিরনি আসতে থাকে। বাদ আছর শুরু হয়ে সন্ধ্যার পূর্ব পর্যন্ত চলে শিরনি বিতরণ। রোগ বালাই দূর করতে অনেকেই শিরনী নিয়ে আসেন ও অনেকেই শিরনি খেয়ে খেয়ে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের জন্য নিয়ে যান।
১৭ই জানুয়ারি সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সরজমিন দেখা গেলও তাই। বাউরভাগ গ্রামের রহমত উল্লাহ, মো. ফজলু মিয়া, ফতেহপুরের জাহাঙ্গীর আলম, বাজরাকোনা গ্রামের দুরুদ আহমদ, ইসলামপুরের জাহানারা বেগম ও শিক্ষার্থী মো. সামি ইসলামসহ অনেকেই জানান, তারা ছোটবেলা থেকে এমনটি দেখে আসছেন। মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জসহ সিলেট বিভাগের নানা প্রান্ত থেকে এখানে লোকজন আসেন। তাদের পূর্বপুরুষদের এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে তারাও এটা ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যতায় পালন করছেন।
তারা জানান, প্রতিবছর উরস উপলক্ষে এই মাজার প্রাঙ্গণে কোনো গান বাজনা, অশ্লীলতা কিংবা নানা ফন্দিফিকিরে টাকা উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই। ভক্তদের স্বইচ্ছায় দান দরগাহ, এতিমখানা ও হাফিজিয়া মাদ্রাসায় ব্যবহার করা হয়। ওইদিন সকাল থেকে কোরআন খতম, খতমে খাজেগান, মিলাদ ও দোয়ার কার্যক্রম চলে। নারী ও পুরুষ ভক্তদের জন্য আলাদা ইবাদতের স্থান নির্ধারিত থাকে। তারা জানান, এখানকার এই মহান ওলির নামে প্রতিষ্ঠিত হাফিজিয়া মাদ্রাসা জেলার মধ্যে অন্যতম দ্বীনি বিদ্যাপীঠ হিসেবে সুনাম অর্জন করেছে।
শাহ্ মইন উদ্দিন (রহঃ) মাজার শরীফ এর মোতায়াল্লী মাসুকুর রহমান মসুদ জানান, হযরত সৈয়দ শাহ্ জালাল (রহঃ) এর সফর সঙ্গী হয়ে এই ওলি এসেছিলেন ইসলাম প্রচারে এ অঞ্চলে। কথিত রয়েছে প্রায় ৬’শ বছর পুর্ব থেকে শিরনী হয়ে আসছে এ স্থানে। শিরনীতে চুরি হয়ে যাওয়া অতিদরিদ্র এক সনাতন ধর্মাবলম্বীর গৃহ পালিত পশু জবাই করে খাওয়ানো হয়। পরে ওই সনাতন ধর্মাবলম্বী ব্যক্তি লোক মারফত খবর পেয়ে পীর সাহেবের কাছে নালিশ করেন। পরে এই মহান ওলির নির্দেশে তিনি তার পালিত পশুর চামড়া শনাক্ত করলে তিনি ভক্তদের বলেন ওখানে ওই চামড়ার উপর হাড় ও মাংস রাখতে। এরপর তারা তাই করলো। মহান ওলির কেরামতিতে ওই দরিদ্র হিন্দু ধর্মাবলম্বী ব্যক্তি তার গরু ফিরে পান। এর পর থেকে তিনি স্থানীয় এলাকাবাসীকে ডেকে এই শিরনিতে সকল ধরনের পশু জবাই নিষিদ্ধ করেন। এখন পর্যন্ত এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন এলাকাবাসী ও ভক্তরা।
বাংলা বর্ষ পঞ্জিকা অনুয়ায়ী প্রতি বছর মাঘ মাসের প্রথম বুধবার মাজার এলাকায় উরুস অনুষ্ঠিত হয়। এ উপলক্ষে শিরনী হিসেবে সাদা ভাত ও ক্ষীর বিতরণ করা হয়। রোগ-বালাই দূর করতে শিরনি খেয়ে অনেকেই বাড়িতে নিয়ে যান পরিবারের সদস্যদের জন্য। এই আয়োজনকে ঘিরে মাজারের কাছাকাছি মেলা বসে। মেলায় নানা জাতের পণ্যসামগ্রী, খেলনা, ইমিটেশন, খাবারের হোটেলসহ মাছ ও সবজিও বিক্রি হয়।



মন্তব্য করুন