দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি,রমজানে যেভাবে কাটছে গাঁও গেরামের নিন্ম আয়ের মানুষের দিনকাল

March 26, 2024,

মু. ইমাদ উদ দীন॥ হাইছা (ওষুধীগুণ সম্পন্ন একধরনের ঘাস) শাক,কচু আর ভাত এই হলো সেহরী ও ইফতারের খাবার। ভাগ্য ভালো হলে আলু কিংবা ডাল ভাত। রমজানে এটাই ওদের স্পেশাল খাবার। ৮ সদস্যের পরিবারের রোজগার মাত্র একজন। তাও সবদিন হয়না আয় রোজগার। দৈনিক যে টাকা উর্পাজন হয় তা দিয়ে পরিবারে সদস্যদের আহারের ব্যবস্থাও কষ্ঠকর। এই রোজা রমজানের দিনে একটু ভালো খাওয়া সেটা কেবল স্বপ্ন। দ্রব্যমূল্যের যে ঊর্ধ্বগতি তাতে দু’বেলা দু’মুঠো ভাত যোগাড় করাও কষ্ঠকর। বাবারে আমাদের খবর কেউ রাখেনা। আমরাতো খেয়ে না খেয়ে মরে মরে বাঁচি। র্দীঘ শ^াস নিয়ে কান্নাজড়িত কন্ঠে এক নাগাড়ে তাদের চলমান জীবন যুদ্ধের কষ্ঠের কথাগুলো জানালেন মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মনুমুখ ইউনিয়নের সুজনগর গ্রামের মৃত আবরুস মিয়ার স্ত্রী ময়না বিবি (৭০)। তার এই জীবন যুদ্ধে মানবেতর জীবন যাপনের বাস্তবিক গল্পের মতো একই চিত্র পুরো গ্রাম জুড়ে। গ্রাম ঘুরে নানা বয়সী লোকজনের সাথে কথা বলে জানাগেল তাদের দূর্দিনের বাস্তবিকতা। তারা আয়ের সাথে কোনো ভাবেই ব্যয় কুলাতে পারেন না। তাই নুন আনলে পান্থা ফুরায়। উর্ধ্বগতির দ্রব্যমূল্য এখন সব স্বস্তিই কেড়ে নিয়েছে তাদের মতো নিন্ম আয়ের গাঁও গেরামের মানুষের। পরিবার পরিজন নিয়ে অর্ধাহারে অনাহারে তারা এখন চোখে অন্ধকার দেখছেন। পরিবারের একমাত্র আয় রোজগারের কর্মক্ষম পুরুষ ব্যক্তিটির এমন দুশ্চিন্তায় রাত দিন একাকার। সন্তানদের পড়ালেখা,খাবার,চিকিৎসা,বস্ত্রসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিসের জোগান ও বেঁচে থাকার কঠিন যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার ভয়ে দিশেহারা বাবা মা। দিন দিনই কেবল বাড়ছেই জিনিসপত্রের দাম। সাধ্যের মধ্যে থাকা স্থানীয় ভাবে উৎপাদিত খাদ্য পণ্যটিও রমজানে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে বাড়িয়ে দেওয়ায় তাও এখন নাগালের বাহিরে।
এমনটিই জানালেন মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মুনুমুখ ইউনিয়নের সুজননগর ও মনুমুখ সুমারাই গ্রামের নিন্ম আয়ের হতদরিদ্র মানুষ। মনু ও কুশিয়ারা নদীর মিলন মোহনার তীরে এই দু’টি গ্রামের অবস্থান। গ্রাম দু’টির অধিকাংশ মানুষই মৎস্যজীবী।
জানাগেল সুজননগর গ্রামে ৮০ টি পরিবারে মানুষের সংখ্যা প্রায় ৫ শতাধিক। আর মনুমুখ সুমারাই গ্রামে ১৫০ পরিবারে মানুষের সংখ্যা প্রায় ৭ শতাধিক। প্রতিটি পরিবারেই পাশাপাশি দূরত্বের শিশুর সংখ্যা বেশি। আর আয় রোজগারের মানুষ পরিবারে এক থেকে দুইজন। গ্রাম দু’টি জেলে পল্লী হিসেবেই পরিচিত। মাছ ধরা আর বিক্রি তাদের পেশা। জানা গেল নদী ও হাওরে গেল বছর মৌসুমে বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় মাছের উৎপাদন হয় কম। এই রেশ এখনো কাটিয়ে উঠা সম্ভব হয়নি। তাছাড়া নানা কারণে এখন নদী ও হাওরে প্রাকৃতিক ভাবে বেড়ে উঠা মাছ কম থাকায় ভালো নেই তাদের আয় রোজগার। রাতদিন মাছ ধরার জাল টেনে মিলে কোনো দিন ২/৩ শ টাকা। কোনো দিন এর চেয়ে কিছু কম কিংবা বেশি। আর এখন অনেক দিনই খালি হাতেও ফিরতে হচ্ছে। সুজননগরের আব্দুল মন্নান, ফুল মিয়া,আপ্তাব উদ্দিন ও ছুরুক মিয়া আর মনুমুখ সুমারাই গ্রামের শাহ আলম ও আফজলসহ অনেকেই জানালেন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে তারা আয় রোজগার দিয়ে কুলাতে পারেন না। আগের মতো নদী ও হাওরের মাছ না থাকায় রাতদিন জাল টেনে আশানুরুপ মাছও পাওয়া যায় না। তাই আর্থিক চরম সংকটে পরিবারে সদস্যদের খাবারের ব্যবস্থা করাও কঠিন হচ্ছে দিনদিন। ধারদেনা ও নানা এনিজিও থেকে ঋণ নিয়ে কোনোরকম খেয়ে না খেয়ে দিন যাপন করছেন। সামনের দিনগুলো কিভাবে চলবেন এমন দুশ্চিন্তার তাদের রাতদিন একাকার। তারা অভিযোগ করে জানালেন জেলে কার্ড থাকলেও কোনো দিনও তারা সরকারি তরফে কোনো সহযোগিতা পাননি। গ্রাম জুড়ে স্যানিটেশন ও বিশুদ্ধ পানির সংকটের কথাও জানান তারা।
মনুমুখ সুমারাই গ্রামের বিধবা নাজমা বেগম জানান তার ৩-৭ বছরের ২ ছেলে ১ মেয়ে। পরিবারের একমাত্র রোজগার স্বামী ইনসান মিয়াকে হারিয়ে অসহায়। এখন মানুষের সাহায্য সহায়তা পেয়েই দিন চলে তার। তিন সন্তান নিয়ে ভাঙ্গা ঘরে খেয়ে না খেয়ে কোনো রকম দিনপার করছেন। গতকাল বিকেলে নিজ বসত ঘরের উঠানে বিশেষ চুলায় শুকনোপাতা ও খড়কুটো জ¦ালিয়ে রান্না করার সময় সুজননগরের রেশনা বেগম,রাশেদা বেগম, লাইলী আক্তার, সুফিয়া বেগমসহ অনেকের সাথে কথা হলে তারা জানালেন হাইছা,কচু,আলু ও ডাল এই হচ্ছে রমজানে তাদের স্পেশাল খাবার। তারা জানালেন তাদের গ্রামের অধিকাংশ পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৭-৮ জন। আর বেশিরভাগই পরিবারই একজনের আয়ের উপর নির্ভরশীল। তাই যেদিন রোজগার হয়না সেদিন ভাতও থাকেনা। রমজান মাসে তারা ধারদেনা ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে কোনো রকম নিয়ম রক্ষা করে সেহরী ইফতার সারছেন। যে হারে প্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে আর অন্যদিকে আয় রোজগারে ভাটা পড়ছে,তাতে রমজান গেলে খাবার, ছেলে মেয়েদের পড়ালেখা ও চিকিৎসা এসব কিভাবে চলবে এই চিন্তায় তারা দিশেহারা। তাদের সবারই দাবী দ্রব্যমূল্য কমানো আর নদী হাওরের মৎস্য সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরকার আন্তরিক হয়ে এগিয়ে আসার।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com