মৌলভীবাজারসহ সর্বত্র বাড়ছে মাদক, কিশোর গ্যাং, ধর্ষণ ও লাশের মিছিল! নীরব সমাজ কি অপরাধীদের শক্তি দিচ্ছে?

May 13, 2026,

মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী : বাংলাদেশ আজ এক গভীর সামাজিক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। প্রতিদিন সংবাদমাধ্যম খুললেই চোখে পড়ে ধর্ষণ, হত্যা, অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং, চুরি, জুয়া, নারী নির্যাতন ও সংঘবদ্ধ অপরাধের খবর। কিন্তু এসব অপরাধের গভীরে অনুসন্ধান করলে যে বিষয়টি সবচেয়ে ভয়ংকরভাবে সামনে আসে, সেটি হলো মাদক।

আজ মাদক শুধু একটি নেশা নয়; এটি সমাজ ধ্বংসের এক ভয়াবহ অস্ত্র হয়ে উঠেছে। মাদক ধীরে ধীরে ধ্বংস করছে তরুণ সমাজ, ভেঙে দিচ্ছে পরিবার, বাড়িয়ে দিচ্ছে অপরাধ, আর সমাজকে ঠেলে দিচ্ছে ভয়ংকর অনিরাপত্তার দিকে।

বিশেষ করে সিলেট বিভাগ ও মৌলভীবাজার জেলার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত এখন মাদকের বিস্তার দৃশ্যমান। ইয়াবা, গাঁজা, ফেন্সিডিল, ট্যাপেন্টাডল ও বিভিন্ন নেশাজাতীয় ট্যাবলেট খুব সহজেই তরুণদের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে। প্রথমে বন্ধুমহল, এরপর কৌতূহল, তারপর আসক্তি—এভাবেই একজন তরুণ ধীরে ধীরে অপরাধের অন্ধকার জগতে প্রবেশ করছে।

মৌলভীবাজার জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। কমলগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল, কুলাউড়া ও সদর উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় মাদক উদ্ধার ও মাদকসেবী আটক হওয়ার খবর প্রকাশিত হচ্ছে। শহরের বিভিন্ন স্থানে অবৈধ মালামাল, জুয়া, মারামারি ও মাদকসেবনের অভিযোগও বাড়ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো মাদক এখন শুধু শহরে সীমাবদ্ধ নেই, গ্রামাঞ্চলেও ভয়ংকরভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। অনেক এলাকায় সন্ধ্যার পর প্রকাশ্যে মাদকসেবন ও বখাটেপনার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ আতঙ্কে থাকলেও অনেক সময় ভয় বা সামাজিক চাপে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না।

গত ৭ দিনের ব্যবধানে মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল, কুলাউড়া ও সদর উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত ৭টি মরদেহ উদ্ধারের খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। কোনোটি আত্মহত্যা, কোনোটি রহস্যজনক মৃত্যু, আবার কোনোটি অজ্ঞাত লাশ হিসেবে উদ্ধার হয়েছে। একের পর এক এমন ঘটনা মানুষের মনে ভয় ও প্রশ্ন তৈরি করছে। আমাদের সমাজ কি ধীরে ধীরে সহিংসতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে?

একইসঙ্গে নারী ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের ঘটনাও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। কোথাও শিশু, কোথাও কিশোরী, আবার কোথাও নারী নির্যাতনের ঘটনা সামনে আসছে। এসব অপরাধের অনেক ক্ষেত্রেই মাদকাসক্তি, বিকৃত মানসিকতা ও সামাজিক অবক্ষয়ের প্রভাব দেখা যায়।

বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তারও বড় সামাজিক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে বিভাগীয় শহর, জেলা শহর এমনকি উপজেলা পর্যায়েও ছোট ছোট গ্যাং তৈরি হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আধিপত্য দেখানো, মোটরসাইকেল শোডাউন, ভয়ভীতি সৃষ্টি ও সংঘবদ্ধ হামলা এখন ভয়ংকর বাস্তবতা। এসব গোষ্ঠীর বড় একটি অংশের সঙ্গে মাদকসেবন ও মাদক ব্যবসার সম্পর্ক রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে সিলেট নগরীতে ছিনতাইয়ের ঘটনা ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। মোটরসাইকেল চালিত ছিনতাইকারী চক্র প্রকাশ্যে মানুষের মোবাইল, ব্যাগ ও টাকা ছিনিয়ে নিচ্ছে। দিনদুপুরে অস্ত্রের মুখে ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটছে। অনেক অপরাধ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—ছিনতাইকারীদের বড় একটি অংশ মাদকাসক্ত অথবা মাদকচক্রের সঙ্গে জড়িত।

একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি যখন নেশার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে, তখন সে যেকোনো অপরাধ করতে প্রস্তুত হয়ে যায়। নেশার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে সে চুরি, ছিনতাই, মারামারি, সহিংসতা, এমনকি হত্যাকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়তে পারে। বাস্তবে দেশের অসংখ্য অপরাধের তদন্তে এই চিত্র উঠে এসেছে।

আজ সমাজের সবচেয়ে বড় সংকট হলো মাদককে ঘিরে সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র গড়ে উঠছে। কিছু অসাধু ব্যক্তি তরুণদের ব্যবহার করছে মাদক পরিবহন ও বিক্রির কাজে। ফলে একদিকে তরুণ সমাজ ধ্বংস হচ্ছে, অন্যদিকে অপরাধের বিস্তার ঘটছে।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, পরিবার থেকে দূরত্ব, বেকারত্ব, প্রযুক্তির অপব্যবহার, সামাজিক অবক্ষয় ও নৈতিক শিক্ষার অভাব অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। কিন্তু এসব কারণের কেন্দ্রে এখন সবচেয়ে ভয়ংকর উপাদান হয়ে দাঁড়িয়েছে মাদক।

একজন সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী হিসেবে মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে আমি বহু পরিবারকে দেখেছি যারা মাদকাসক্ত সন্তানের কারণে অসহায় জীবনযাপন করছে। কোনো মা সন্তানের জন্য রাত জেগে কান্না করছেন, কোনো বাবা সামাজিক লজ্জায় মাথা নিচু করে চলছেন, আবার কেউ নিজের সন্তানের ভয়েই আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো আমরা অনেকেই অপরাধ দেখি, জানি, বুঝি; কিন্তু মুখ খুলতে চাই না। কেউ ভয় পায়, কেউ ঝামেলা এড়াতে চায়, আবার কেউ প্রভাবশালীদের কারণে নীরব থাকে। এই নীরবতাই অপরাধীদের আরও শক্তিশালী করে তুলছে।

আমাদের বুঝতে হবে শুধু প্রশাসনের একার পক্ষে এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালাবে, অপরাধী গ্রেপ্তার করবে, আইনি ব্যবস্থা নেবে কিন্তু সামাজিক প্রতিরোধ ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

এখনই যদি মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা না যায়, তাহলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর রূপ নেবে। কারণ মাদকই এখন অধিকাংশ অপরাধের মূল জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে।

অপরাধ দমনে প্রথম দায়িত্ব পরিবার থেকে শুরু হওয়া উচিত। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, আচরণে পরিবর্তন হচ্ছে কি না, এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। এরপর স্থানীয় সমাজ, মহল্লা কমিটি, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা ও সচেতন নাগরিকদের সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।

বিশেষ করে জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ স্থানীয় সমস্যাগুলো সম্পর্কে তারাই সবচেয়ে বেশি অবগত থাকেন। এলাকার মাদক ব্যবসায়ী, জুয়া, বখাটে ও অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে তারা যদি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেন, তাহলে অনেক অপরাধ প্রাথমিক পর্যায়েই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

একইসঙ্গে প্রশাসনেরও আরও জোরালো পদক্ষেপ প্রয়োজন। মাদক ব্যবসায়ী, ধর্ষক, সংঘবদ্ধ অপরাধী ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান, দ্রুত বিচার ও কার্যকর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধী যেই হোক তার রাজনৈতিক, সামাজিক বা অর্থনৈতিক পরিচয় নয়; অপরাধটাই বড় বিষয় হওয়া উচিত।

আজ প্রয়োজন সামাজিক জাগরণ। শুধু ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করে দায়িত্ব শেষ হবে না। প্রতিটি পরিবার, প্রতিটি মহল্লা, প্রতিটি গ্রাম ও প্রতিটি শহরকে মাদকের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

কারণ মাদক নিয়ন্ত্রণ করা গেলে অপরাধের বড় একটি অংশ স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে। আর মাদক নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে সমাজে হত্যা, ধর্ষণ, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং ও সহিংসতার বিস্তার আরও ভয়ংকর হবে।

মনে রাখতে হবে অপরাধ হঠাৎ জন্ম নেয় না; এটি তৈরি হয় সামাজিক উদাসীনতা, নৈতিক অবক্ষয় ও মাদকের বিস্তারের ভেতর থেকে। আর সেই অন্ধকার থামাতে হলে এখনই সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

লেখক : মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী, সাংবাদিক, কলামিস্ট, গবেষক মানবাধিকার কর্মী।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com