হাইল হাওরের অধিকাংশ সরকারী বিলই এখন ব্যক্তিগত ফিসারী ॥ বিলুপ্তির মূখে দেশীয় প্রজাতির মাছ ও জলজ উদ্ভিদ

বিকুল চক্রবর্তী॥ ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে মৌলভীবাজারের দেশীয় মাছের অভয়াশ্রম হাইল হাওরের বিল গুলো। ছোট বড় মিলিয়ে ১১৪টি বিলের মধ্যে এখন অর্ধেকও নেই। প্রতিনিয়ত বিল গুলো ঘিরে গড়ে উঠছে ফিসারী আর চির দিনের জন্য বিলিন হয়ে যাচ্ছে একের পর এক বিল ও দেশীয় প্রজাতির মাছের বংশো। অন্যদিকে বেকার হচ্ছে মৎস্য জীবিরা। আর শহরের ময়লা আবর্জনায় দুষিত হচ্ছে এর যৎকিঞ্চিৎ ভাসান জলের পরিবেশ।
কাছাকাছি সময়ে হাইল হাওরের চইড়া বিল দখল করে ফিসারী করেছে ভুমি খেকোর দল এমন খবরে আমরা কয়েকজন প্রকৃতি প্রেমী ও গণমাধ্যমকর্মী হাওরে যাই। সেখানে দেখা হয় হাওর পাড়ের বাসিন্দা পশ্চিম ভাড়াউড়া এলাকার রুকাম মিয়া, জুয়েল মিয়া, আকাশ মিয়াসহ বেশ কয়েকজন জেলের সাথে। তাদের কাছে চইড়া বিলের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা বলেন চইড়া বিল এখন আর নেই। সেখানে ফিসারী (হাইব্রীড মাছের খামার) হয়েগেছে। এসময় তারা ফিসারী গুলো দেখিয়ে দেন। আমরা দুটি নৌকা নিয়ে সেই ফিসারীর দিকে রওয়ানা হই। এ সময় আরেকটি নৌকায় দেখা হয় চইড়া বিলের ইজারাদার আনার মিয়ার সাথে।
পশ্চিম ভাড়াউড়া এলাকার বাসিন্দা ৩নং শ্রীমঙ্গল ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আনার মিয়া জানান, লাভের আশায় সরকারকে রাজস্ব দিয়ে তাদের সমিতির নামে চইড়া বিল লিজ নিয়ে ছিলেন দুই বছর আগে। প্রথম দিকে বিলে আসতে পারেন নি। কিছুদিন পর বিলে এসে তার চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গেছে। চইড়া বিলের ৯০ ভাগ জমির উপর বিশাল ফিসারী। এটি করেছেন তার একই গ্রামের সফাত মিয়া। তিনি বলেন, প্রতিবাদ করতে গেলে তার উপর আসে হুমকি।
আনার মিয়ার সাথে কথা শেষ করে আমরা চইড়া বিলে সদ্যস্থাপিত ফিসারীর পাড়ে যাই। সেখানে দেখা হয় ফিসারীর এক পরিচালক সফাত মিয়ার চাচাতো ভাই পশ্চিম ভাড়াউড়া এলাকার দিলু মিয়ার সাথে। এ বিষয়ে দিলু মিয়ার কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, তারা ভুমিহীনের জমি ক্রয় করে ফিসারী করেছেন। কিছু দিন পর আনার মিয়া এসে এটি চইড়া বিলের জায়গা জানালে তারা কাগজ দেখে জানাতে পারেন এটি লিজের জায়গা (চইড়া বিলের)। তখন তারা গ্রামের জনৈক মুকিত মিয়ার মারফত আনার মিয়াকে কিছু টাকা দিয়েছেন। এ ব্যাপারে আনার মিয়া জানান, তাকে কোন টাকা দেয় নি। এরা মিথ্যা বিলাপ করছে। তিনি প্রশাসনের দ্বারস্থ হবেন।
সরজমিনে দেখা যায়, চইড়া বিলের উপর ফিসারীর পাড়ে বেশ বড় বড় বৃক্ষ চারা। বেশ কয়েকটি টংঘর। এসেছে বিদ্যুৎও। নিমিষেই পরিবর্তন হয়েগেছে চইড়া বিলের দৃশ্যপট। অতচ দু বছর আগেও বর্ষায় এই চইড়া বিলের ভাসান পানিতে মাছ মেরে জীবিকা নির্বাহন করতেন অসংখ্য জেলে।
এ সময় পশ্চিম ভাড়াউড়া এলাকার সুন্নত মিয়া নামে অপর এক মৎস্যজীবি জানান, এরা অন্যাায় ভাবে সরকারী জমির শ্রেণী পরিবর্তন করেছে। এদের ফিসারী করার কারনে হাওর সংকুচিত হয়েছে। এর ফলে এই বিলে থাকা দেশীয় মাছের বংশতো শেষ হয়েছেই সাথে সাথে এই বিলে পাওয়া যেত বিভিন্ন প্রজাতীর জলজ উদ্ভিদ যা এই এলাকার কৃষকরা গবাধি পশুর খাবার হিসেবে সংগ্রহ করতেন। তিনি জানান, এই চিত্র শুধু চইড়া বিলে নয় হাওরের অধিকাংশ বিলই এখন ফিসারী। এই খাস জমির সরকার বেশ কিছু অংশ ভুমিহীন দের দিয়েছেন। কিন্তু ভুমি হীন সেখানে যেতে পারেনা। সু-বিধাবাদীর দল ভুমিহীনের কাগজ সংগ্রহ করে তাদের সাথে দেখা করে কৌশলে তাদের কাছ থেকে জমিগুলো নিয়েনেয়। পরে এর সাথে খাস জমিগুলো তাদের আয়ত্বে নিয়ে ফিসারী করে। একই কথা জানান, নৌকার মাঝি সুইলপুরের সুলেমান মিয়া, পশ্চিম ভাড়াউড়া মুমিন মিয়া
শ্রীমঙ্গল উপজেলা আওয়ামীলীগের সহ দপ্তর সম্পাদক মামুন আহমদ জানান, এই হাওরের হাজার হাজার একর বিলের জমি দখল করে ফিসারী করেছেন রাগব বোয়ালেরা। এরা এখন সমাজের মাথা।
এ ব্যাপারে কথা হয় শ্রীমঙ্গল উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সহিদুর রহমান সিদ্দিকির সাথে তিনি জানান, হাইল হাওরের আয়তন ১৪ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে শ্রীমঙ্গল উপজেলায় পড়েছে ১০ হাজার হেক্টর। এর ভিতরে বিল রয়েছে ৫৯টি যার মধ্যে ২০ একরে নিচে ৩৯টি এবং ২০টি ২০ একরের উপরে। যা থেকে উপজেলার মাছের চাহিদা পুরণ হয়ে থাকে। তিনি জানান, এই বিলগুলো হাওরের চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। অনেকের ব্যক্তিগত জমির সাথে খাস ভুমিও পড়েছে। ভুমি দখলদারের গহব্বরে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি বিল সম্পুন্ন রুপে বিলিন হয়েছে। অনেক গুলো বিলের জমি অল্প অল্প দখল আছে। তিনি জানান, এই হাওরের বিলে প্রায় শত প্রজাতির দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। বর্তামানে প্রায় ৩০ প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তিনি জানান, এই হওরে এসে মিসেছে অর্ধশত ছড়া যা গোফলা নদীতে পড়েছে। অনেকে সেই ছড়া গুলোও দখল করে নিচ্ছে। এতে পানি প্রবাহ পরিবর্তন হচ্ছে। ক্ষতির মুখে পড়ছেন হাওরের বুরো চাষীরাও।
এ ব্যপারে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মৎস্য কর্মকর্তা সুলতান মাহমুদ জানান, হাইল হাওরের মৌলভীবাজার সদর উপজেলায় পড়েছে ৪ হাজার হেক্টর জলাভুমি। যার মধ্যে বিল রয়েছে ৫৫টি। এর মধ্যে ১০/১২টি নি:শেষ হয়ে গেছে।
এ ব্যাপারে পরিবেশ নিয়ে কাজ করা সংগঠন বালিশিরা পাহাড় রক্ষা সোসাইটির চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন আহমদ জানান, ‘দেশীয় মাছ রক্ষা করি সমৃদ্ধ দেশ গড়ি’ প্রধানমন্ত্রীর এই শ্লোগানকে বাস্তবায়ন করতে হলে আমাদের হাওর ও উন্মুক্ত জলাশয়কে রক্ষা করতে হবে। জলাভুমি তৈরী করে ফিসারী তৈরী করা রাঘব বোয়ালদের কঠোর হাতে দমন করতে হবে। একই সাথে হাইল হাওরে জমির শ্রেণী পরিবর্তন করা শতভাগ বন্ধ করতে হবে। তা না হলে সামনে বড় রকমের বিপর্যয় আসবে।
প্রায় ১৪ হাজার হেক্টর এলাকা জুড়ে অবস্থিত হাইল হাওর। যার অধিকাংশ পড়েছে শ্রীমঙ্গল উপজেলায় এবং এর কিছু অংশ পড়েছে মৌলভীবাজার সদর উপজেলায়। এখানে রয়েছে মাছর অভয়াশ্রম বাইক্কা বিলসহ প্রায় ১১৪টির মতো বিল। কিন্তু আজ অধিকাংশ বিলের অস্তৃত নেই। এতে শংকায় পরিবেশ প্রেমীরা।
পরিবেশবিদ সিতেশ রঞ্জন দেব জানান, পরিবেশ বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পেতে এখনই হাইল হাওরের বিল গুলো খনন করা প্রয়োজন। প্রত্যেকটি পাহাড়ী ছড়ার নিচের অংশ খনন করে গোফলা পর্যন্ত পানি চলাচলের পথ পরিস্কার করতে হবে।
পরিবেশবাদী সংগঠন পাহার রক্ষা সোসাইটির সাথে সম্পৃক্ত সাংবাদিক মোনায়েম খান বলেন, দখলদারদের উচ্ছেদ করে বিলকে বিলে রুপান্তরিত করতে হবে। এরা যতবড় ক্ষমতাধরই হোক না কেন জমির শ্রেণী পরিবর্তন করলে তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
এ ব্যাপারে মৎস্যজীবি পশ্চিম ভাড়াউড়া এলাকার মুমিন মিয়া জানান, হাইল হাওরের চার পাশে প্রায় ১০ হাজারেরও অধিক জেলে পরিবারের বসবাস। যেখানে জনসংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। ইতিমধ্যে অর্ধেকের জীবিকা পরিবর্তন হয়েছে। আর পেশা ছাড়ার অপেক্ষায় আছেন বর্তমানে আরো কয়েক হাজার।
এদিকে ফিসারীজের কারনে বন্ধ হচ্ছে বিভিন্ন ছড়ার পানি প্রবাহের পথ। পর্যটকরা বঞ্চিত হচ্ছেন উন্মুক্ত জলাশয়ে ঘুড়ে বেড়ানো থেকে। ফিসারীর কারনে হাওরের যে অল্প জায়গা ভাসান থাকে সেখানে শহরের ময়লা আবর্জনায় ভর পুর থাকে ।
এ ব্যপারে হাইল হাওরে নিয়ে কাজ করা সিএনআর এস এর সাইট অফিসার মনিরুজ্জামান বলেন, তাদের অনুসন্ধানে হাইল হাওরে ১৩১টি বিলের অস্তৃত্ব খোঁজে পান তারা। এর মধ্যে ১০১টি বিল ইজারার রেকর্ড রয়েছে। ৩০টি বিলের কোন হদিস নেই। যে গুলো আছে সেগুলোরও অধিকাংশ দখলে। তিনি জানান, দখল দৌড়াত্বে হাওরের এমন অবস্থা যে, এখন বিশাল হাওরে গরু চরানোর একটু খালী জমি নেই। নেই গরু রাখার ভাতান। সবই দখলে। এক সময় খাস জায়গায় কৃষকরা দলবদ্ধ ভাবে ধান মারাই করতেন এখন সে সুযোগটিও নেই। সবই দখলে।
শ্রীমঙ্গলের পরিবেশ চিন্তাবিদ শ্রীমঙ্গল ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক দ্বিপেন্দ্র ভট্টাচার্য্য জানান, এই হাইল হাওর একসময় এতো গভীর ছিলো এর উপর দিয়ে স্টিমার চলতো। এতদঅঞ্চলের চলাচলের মাধ্যমই ছিলো এই হাওর। শ্রীমঙ্গল শহরতলীর উত্তর ভাড়াউড়ার হাওর অভিমুখে জেটি ছিলো। এখনো সেই জেটির নামে জেটি রোড বিদ্যমান আছে। তিনি জানান, এখন হাওর ছোট হতে হতে দ্বারে এসে লেগেছে। যে হাওরের সীমানা কয়েক বছর আগেও ছিলো প্রায় ১৪ হাজার হেক্টর এখন এর পরিমান ৭ হাজার হেক্টরেরও কম হবে বলে তাঁর ধারণা।
তবে শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম জানান, দখলদারদের উচ্ছেদ করে তা আবার বিলে রুপান্তরিত করা হবে এবং যারা সরকারী জমি দখল করবেন তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই তারা আইনানুগ ব্যবস্থা নিবেন।
এব্যাপারে মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক মীর নাহিদ আহসান জানান, তিনি এ জেলায় নতুন এসেছেন। তবে ইতিমধ্যেই তিনি অবগত হয়েছেন এটি একটি বৈচিত্রময় জেলা। যেখারে রয়েছে হাওর, পাহাড়, সমতল ভুমি, নদী ও প্রাকৃতিক জীব বৈচিত্র। এ জেলার বৈশিষ্টই হলো এর প্রাকৃতিক জীব বৈচিত্র। আর এটি যদি নষ্ট হয়ে যায় তবে এ জেলা তার ঐতিহ্য হারাবে। তাই এ জেলা রক্ষায় জেলাবাসীকে সচেতন হওয়ার আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, হাইল হাওরের ভরাট হওয়া বিল গুলো খননের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট বিভাগের নজরে আনবেন।
হাইল হাওরের পুরোনো ঐতিহ্য ধরে রাখতে সরকারী জমি দখল মুক্ত ও এর শ্রেণী পরিবর্তনকারীদের কঠোর আইনের আওতায় আনার দাবী প্রকৃতি প্রেমীদের।



মন্তব্য করুন