জিয়াউর রহমান আর পাঁচটা বছর জীবিত থাকলে আজ বাংলাদেশের চিত্র ভিন্ন হতো-নাসের রহমান

স্টাফ রিপোর্টার : “জিয়াউর রহমান আর পাঁচটা বছর যদি তিনি জীবিত থাকতেন, পাঁচ বছর, আজকে বাংলাদেশের চিত্র ডিফরেন্ট হতো”— এমন মন্তব্য করেছেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য এম নাসের রহমান।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান (বীর উত্তম)-এর ৪৫তম শাহাদাৎ বার্ষিকী উপলক্ষে মৌলভীবাজার জেলা বিএনপি আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
শনিবার ৩০ মে দুপুরে শহরের এম সাইফুর রহমান অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলে জেলা বিএনপি এবং অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মীর উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। পুরো অডিটোরিয়ামজুড়ে ছিল আবেগঘন পরিবেশ। বক্তারা বারবার স্মরণ করেন স্বাধীনতার ঘোষক ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক হিসেবে পরিচিত জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন, নেতৃত্ব এবং রাষ্ট্রগঠনে তাঁর ভূমিকা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে এম নাসের রহমান বলেন, “শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দেশের উন্নয়নের জন্য এবং দেশের ভালোর জন্য অনেক কিছু দিয়ে গেছেন। দেশের রাজনীতির জন্য। এ-ই যে রাজনৈতিক দল করেছিলেন তিনি তখন চিন্তা করছিলেন যে আওয়ামী লীগকে কাউন্টার দেয়ার মতো একটা দল থাকতে হবে, না হলে দেশ শেষ হয়ে যাবে। এজন্যই তিনি এ-ই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি গঠন করেছিলেন। নিজের জন্য না, দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির কথা চিন্তা করে তিনি এ-ই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল করেছিলেন।
এবং এ-ই জাতীয়তাবাদী দল গঠন করতে গিয়ে উনার মন্ত্রীসভার ১০ জন মন্ত্রীকে দিয়ে গঠন করেছিলেন। তখন নিয়ম ছিল দল করতে গেলে ৮-১০ জন লোক মিলে একটা দরখাস্ত দিতে হয় সরকারের কাছে। যে আমার ১০ জন মিলে, আমরা ১২ জন মিলে, ২০ জন মিলে একটা দল গঠন করতে চাই। ওই সময় নিয়ম ছিল ১৯৭৮ সালে। ওই দশজনের একজন ছিলেন মরহুম অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী এম সাইফুর রহমান।
এই দশজনে মিলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল গঠন করেন ১৯৭৮ সালের জানুয়ারিতে। আর ১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে শুধু নামটা পরিবর্তন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক শব্দটা বাদ দিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল গঠন করেন। কারণ তখন বলা হয়েছিল রাজনৈতিক দল তো গণতান্ত্রিকই, এটা আবার বলার দরকার কী গণতান্ত্রিক। এ-ই স্পিরিটটা আমাদের মরহুম নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া অত্যন্ত সুন্দরভাবে পরিচালনা করেছেন।”
তিনি বলেন, “আজকে এ-ই বারবার বিএনপি ক্ষমতায় আসে। কেন? আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানোর জন্য আওয়ামী লীগরা বিগত সতেরো বছর কম চেষ্টা করেছে। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল শেষ পর্যন্ত কী আসলো? এ-ই জিয়াউর রহমান সাহেব ছিলেন। এইগুলোও সব আল্লাহ তায়ালার বিধাতার কাজকারবার।
জিয়াউর রহমান আর পাঁচটা বছর যদি তিনি জীবিত থাকতেন, পাঁচ বছর, আজকে বাংলাদেশের চিত্র ডিফরেন্ট হতো। একটা জিনিস মনে রাখতে হবে, পার্শ্ববর্তী দেশরা কখনোই চাইবে না বাংলাদেশ যাতে উন্নত হয়ে যায়। এখনতো আমাদের জিডিপি তাদের চাইতে একশ ডলার বেশি। আজকে আমাদের জিডিপি ২৯১৩ ডলার আর তাদের জিডিপি ২৮১১ ডলার।”
নাসের রহমান বলেন, “আজকে ৪৫ বছর উনার শাহাদাৎ বার্ষিকী। আমরা গভীর শ্রদ্ধার সাথে মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তমকে স্মরণ করছি। আল্লাহ তায়ালা উনাকে বেহেশত নসীব করুক। উনি ভালো মানুষ ছিলেন।
আজকে দেখেন, জিয়া স্মৃতি পাঠাগারের আয়োজনে বইমেলা উদ্বোধন হলো। দেখেন সেখানে কত বই জিয়াউর রহমানের ওপরে। কতজন লিখেছেন। গত ১৭/১৮ বছর এসব বই পাবলিশড হতে দেয় নাই। এগুলো আটকে রেখেছিল। কত বই।
একটা মানুষ একটা লিজেন্ড। একটা দেশের নামের সাথে যদি শেখ মুজিবের নাম লেখা লাগে, তাহলে কোনো অবস্থাতেই জিয়াউর রহমানের নাম তার চেয়ে কমে নাই। আমি বলবো আরও বেশি আছে। কারণ জিয়াউর রহমান দেশকে দিয়ে গেছেন। অনেক কিছু দিয়ে গেছেন। দেশের উন্নয়নের জন্য এবং দেশের ভালোর জন্য। দেশের রাজনীতির জন্য।”
জিয়াউর রহমানকে হত্যা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “অনেকেই প্রশ্ন করেন, জিয়াউর রহমানকে কেন হত্যা করা হলো, কে হত্যা করলো? এসব প্রশ্নের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট। তিনি ছিলেন এমন একজন নেতা, যিনি সবসময় প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে কাজ করতেন।”
মুক্তিযুদ্ধে জিয়ার অবদানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেক সেক্টর কমান্ডার দূরবর্তী অবস্থান থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করলেও জিয়াউর রহমান সরাসরি সম্মুখযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর সাহসিকতা ও নেতৃত্বের কারণে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছিলেন।”
তিনি বলেন, “স্বাধীনতার পরও তিনি থেমে থাকেননি। রাষ্ট্র পরিচালনায় তিনি যে দূরদর্শিতা দেখিয়েছেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল। তিনি ছিলেন অত্যন্ত দৃঢ়, সংযত ও মার্জিত ব্যক্তি। তাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল একেবারে পাহাড়সম। সততায় ছিলেন অনন্য। সেনাবাহিনীতে তাঁর মতো ব্যক্তিত্বসম্পন্ন কর্মকর্তা খুব কমই ছিলেন।”
বক্তব্যের একপর্যায়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জিয়াউর রহমানের অবস্থান নিয়ে আলোচনা করেন নাসের রহমান। তিনি বলেন, “১৯৮০ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধ শুরু হলে মুসলিম বিশ্বের নেতারা যুদ্ধ বন্ধে উদ্যোগ নেন। সে সময় ওআইসির উদ্যোগে গঠিত একটি বিশেষ কমিটির নেতৃত্ব দেওয়া হয়েছিল জিয়াউর রহমানকে। সাতজন রাষ্ট্রপ্রধান ওই কমিটির সদস্য ছিলেন। কিন্তু তাঁদের মধ্য থেকে জিয়াউর রহমানকেই প্রধান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এটি ছিল তাঁর প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থার বড় প্রমাণ।”
তিনি আরও বলেন, “যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে জিয়াউর রহমান একাধিকবার তেহরান ও বাগদাদ সফর করেন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। মুসলিম বিশ্বের একজন সম্ভাবনাময় নেতা হিসেবে তিনি আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন।”
দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়েও বক্তব্য রাখেন নাসের রহমান। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ একসময় দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা দেখেছে। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দেশ খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও সে সময় বাংলাদেশের এই পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। এটি ছিল দেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।”
আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন মৌলভীবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য নাসির উদ্দীন আহমেদ মিঠু, জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. মিজানুর রহমান মিজান, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সিনিয়র সদস্য আলহাজ্ব আব্দুল মুকিত, মৌলভী মো: আব্দুল ওয়ালী সিদ্দিকী, অ্যাডভোকেট সুনীল কুমার দাশ এবং জাসাসের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সৈয়দ আশরাফুল মজিদ খোকন।
সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো: ফয়জুল করিম ময়ূন এবং সঞ্চালনা করেন সদস্য সচিব মো. আব্দুর রহিম রিপন।
বক্তারা বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি দর্শনের নাম। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে তাঁর অবদান জাতি দীর্ঘদিন স্মরণ করবে।
অনুষ্ঠান শেষে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার রুহের মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। দোয়া মাহফিলে দেশের শান্তি, সমৃদ্ধি এবং গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা কামনা করা হয়।
জেলা বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সরব উপস্থিতিতে পুরো আয়োজনটি পরিণত হয় জিয়াউর রহমানকে স্মরণ ও তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ পুনর্ব্যক্ত করার এক বড় মঞ্চ।



মন্তব্য করুন