মৌলভীবাজারের নাসিরপুরের জঙ্গি আস্তানা ওরা আমাদের গ্রামকে কলঙ্কিত করল

April 2, 2017,

ইমাদ উদ দীন॥ একটি বাড়ির ঘটনায় ওলোট পালট নাসিরপুর গ্রাম। এখন পুরো গ্রাম জুড়েই সুনশান নিরবতা। যেন মৃতুপুরী থেকে ফিরেছে গ্রামবাসী। গ্রামটিতে নানা শ্রেণী পেশার প্রায় ৪ হাজার মানুষের বসবাস। শান্ত এই গ্রামটির বাসিন্ধাদের চোখে মুখে এখন দুশ্চিন্তার চাপ। আর নানা উদ্বেগ উৎকন্ঠা।
বৃহস্পতিবার সোয়াতের অভিযানে জঙ্গি নিধন হলেও ভয় কাটছেনা তাদের। অপারেশন‘হিট ব্যাকের’ কথা স্মরণ হলে এখনো তারা আতকে উঠছেন। ওই অভিযানের গোলাগুলি আর গ্রেনেডের শব্দ এখনো যেন কানে বাজছে তাদের। মায়ের কোলের শিশুরা ওই অভিযানের পর থেকে ভয়ে জড়োসড়ো। আবাল বৃদ্ধ কেউই ভুলতে পারছেন না ওই দুই দিনের ঘটনা। অপারেশন ‘হিট ব্যাকে’ নিহত ৪ শিশু, ২মহিলা ও ১পুরুষ ছিল তাদের (৩-৪মাসের)অল্পদিনের পরিচিত প্রতিবেশি। যারা তাদের আশপাশের বাড়ির লোকজনের সাথে কম মিশত আর একা থাকতে বেশি পচন্দ করত। ওই জঙ্গি আস্তানায় অভিযানকে কেন্দ্র করে আসা এতো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য আর গণমাধ্যম কর্মী এর আগে কখনো দেখনি গ্রামবাসী। হঠাৎ জঙ্গি তান্ডবে তাদের এমন বেহাল দশা। গতকাল সরজমিন গ্রামটি ঘুরে দেখা গেল এমন দৃশ্য। কথা হলো গ্রামবাসির সাথে।

অজানা ভয়ে কেউ ঘটে যাওয়া ঘটনাটি নিয়ে মুখ খোলতে নারাজ। গ্রামের প্রবেশ পথেই দুটি দোকান একটি চা স্টল অন্যটি ভেরাইটিজ সোপ। দোকান মালিক তাজু মিয়া ও খছরু মিয়া জানালেন আগে তাদের বেছা বিক্রি ভালো ছিল। অপারেশন ‘হিট ব্যাকের’ কারনে গেল দুই দিন (বুধ ও বৃহস্পতিবার) সাংবাদিক আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভিড় ছিল তাদের দোকানে। কিন্তু অপারেশন ‘হিট ব্যাকের’ পর এখন নেই সেই আগের ক্রেতা। কারণ গ্রামের অধিকাংশ লোকজন প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। এই চা দোকান গুলোর পরই খলিলপুর ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়। ইউনিয়ন অফিসের সামনেই কথা হয় ওই ওর্য়াডের ইউপি সদস্য মো: আবু সুফিয়ান (৪২),আলিম মিয়া (৫৫),ইমাদ উদ্দিন মানিক (৫০),আফজাল হোসেন (৬৫) সহ গ্রামের কয়েকজনের সাথে। তারা জানালেন গেল তিন দিন তাদের গ্রাম জুড়ে জঙ্গিদের কারণে যে তান্ডব হয়েছে তা স্বাধীনতার যুদ্ধের সময়ই তা তারা দেখেননি বা শোনেননি। তবে তারা খুশি বড় কোন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই এই আস্তানার জঙ্গিরা যে সপরিবারে নির্মূল হয়েছে। গ্রামের পথ ধরে জঙ্গি আস্তনার ওই বাড়ি যাওয়ার পথে পাওয়া গেল বিলিন হওয়া বরাক নদীর পাড়ে ক’জন নিজেদের গরু চরাচ্ছেন। প্রথমে কথা বলতে না চাইলেও সাংবাদিক পরিচয় পেলে তারা জানালেন ভাই ওরা কোথায় থেকে এসে আমাদের এই শান্ত গ্রামটির ঐতিহ্য ডুবিয়ে দিয়েছে। এই ঘটনার পর থেকে আমরা গ্রামের বাহিরে যেতে চাচ্ছি না লোকলজ্জ্বার ভয়ে। অন্য গ্রামের লোকজন আমাদের গ্রাম নিয়ে ঠাট্টা করে অনেক কথা বলছে। তাদের মুখতো আর চেপে ধরা যাবেনা। তারা প্রশ্ন রেখে বলেন কিন্তু আমাদের কি দোষ। জঙ্গিরা আমাদের সরলতাকে কাজে লাগাতে চেয়েছিল। ওখানে ঘাঁটি বানিয়ে তারা আমাদের জঙ্গি বানাতে চেয়েছিল। কিন্তু এর আগেই তারা তাদের এমন কুকর্মের শাস্তি পেয়েছে। গ্রামের পিয়ারা,ডলি,সালমা, কান্তা বালা (ছদ্ম নাম)গৃহিণীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানালেন কোথায় থেকে এসে ওরা আমাদের গ্রাম কে কলঙ্কিত করল। আমাদের গ্রামের উপর জঙ্গি তকমা লাগালো। আমরা এদের অন্তরালে থেকে মদদ দাতাদের দৃষ্ঠান্তমূলক শাস্তি চাই। এ ক’দিন থেকে পুরো গ্রাম জুড়ে কেমন ঘুমোট পরিবেশ। গ্রামের এমন নিস্তব্দ পরিবেশই জানান দিচ্ছে তাদের মনের অবস্থার। প্রাণবন্ত গ্রামবাসী হঠাৎ যেন আধমরা। অভিযান চলাকালে নিরাপত্তা জনিত কারণে ৩দিন জিম্মি দশায় পর যেন তারা নতুন জীবন ফিরে পেয়েছে। গ্রামটিতে প্রবেশের পর থেকেই এমনটিই টের পাওয়া গেল। দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী ফাহিম চৌধুরী,সৌরভ সুত্রধর, সৈকত সুত্রধর, সাগর সুত্রধর ও ৮ম শ্রেণীর শিক্ষার্থী তানভির চৌধুরী জানালো এ ক’দিন থেকে তাদের মত এই গ্রামের অনেকেরই ক্লাসে যেতে মন চায়না। একদিকে যেমন ভয় অন্য দিকে সহপাঠী বন্ধুরা তাদের গ্রাম নিয়ে নানা মন্তব্য আর আলোচনা সমালোচনা করছে। আগে প্রতিদিন গ্রামের মাঠে খেলাধূলা হলেও ঘটনার পর থেকে মন ভালো না থাকায় তারা মাঠে খেলাধূলাও করছে না। শান্ত এই গ্রামটিতে কর্মজীবী মানুষের হৈ হুল্লুড় লেগে থাকলেও চেনা জানা সে পরিবেশে এখন আমূল পরিবর্তন। চুপচাপ নিরবতাই যেন এখন তাদের নিয়তি। ওই বাড়ির প্রতিবেশীরা জানালেন জঙ্গিরা বাড়িটি ভাড়া নেওয়ার পর কার্যত অনেকটা একঘরে হয়ে যায় ওই বাড়ি। ওই বাড়ির পূর্ব পাশে স্কুলের সামনে কথা হয় ওই গ্রামের লুৎফর রহমান চৌধুরী (৪৮), নির্মল কান্তি সুত্রধর (৩২), শাফিন আহমদ (২৭), জুনেদ আহমদ (২২) ও মৌলভীবাজার সরকারী কলেজের শিক্ষার্থী জাবেদ আহমদসহ অনেকের সাথে তারা সকলেই জানালেন এই তিনদিন তারা অনেকটা অর্ধহারে অনাহারে রাত দিন কাটিয়েছেন। পুলিশের নিরাপত্তা বেষ্টনি থাকায় তারা কেউ বাড়ি ঘর থেকে বের হতে পারেনি। গোলাগুলি আর বোমার শব্দে মৃত্যুভয়ে যার যার ধর্মানুযায়ী সৃষ্টি কর্তার নাম স্মরণ করেছেন। তারা সকলেই যেন মৃত্যুর দোয়ার থেকে ফিরে এসেছেন। জানালেন অভিযান শেষ হওয়ায় তারা শুক্রবার রাত থেকে কিছুটা স্বস্তিতে আছেন। তবে এখনো পুরো পুরি ভয় কাটেনি তাদের। তারা ক্ষোভের সাথে বলেন ওরা হঠাৎ করে এসে আস্তানা ঘেড়ে আমাদের গ্রামকে কলঙ্কিত করল। আমাদের শান্তি প্রিয় গ্রামটিতে আতঙ্ক ছড়ালো। আমাদের ঐতিহ্যবাহী গ্রামের সুনাম ও সু খ্যাতি নষ্ট করল। আমরা এই

জঙ্গিদের মদদ দাতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেখতে চাই। আমাদের মত দেশের আর কোন গ্রাম যেন এভাবে জঙ্গিরা ঘাঁটি বানিয়ে কলঙ্কের কালিমা লেপন করতে না পারে সে জন্য সকলের সচেতন দৃষ্টি চাই। প্রশাসনের সতর্কদৃষ্টি চাই। তারা বলেন আমাদের কষ্ঠ আর দূর্ভোগের পর ঘটনার সমাপ্তি হলেও এ ঘটনায় আমাদের ও দেশবাসির চোখ কান খোলে দিয়েছে। আমরা ঘটে যাওয়া ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে যাব। আমাদের সকলের সচেতনতায় ঘুচাবে এ কলঙ্ক অতীত ঐতিহ্য ধরে রেখে এগিয়ে যাবে আমাদের শান্তি প্রিয় নাসিরপুর গ্রাম। উল্লেখ্য, জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে গত মঙ্গলবার দিবাগত রাত ২টা থেকে মৌলভীবাজার পৌরসভার বড়হাট এলাকায় একটি বাড়ি এবং শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে খলিলপুর ইউনিয়নের নাসিরপুর গ্রামে আরও একটি বাড়ি ঘিরে রাখে পুলিশ। পরে সোয়াত আস্তানা দুটিতে পৌঁছে অভিযান চালায়। দু’টি জঙ্গি আস্তানায় রুদ্ধশাস অভিযান চলে ৮২ ঘন্টা। বৈরী আবহাওয়া আর রাতে আলোস্বল্পতায় কৌশলগত কারনেই থেমে থেমে চলে এই অভিযান। বৃহস্পতিবার বিকেলে শেষ হয় অপারেশন “হিট ব্যাক”। আর শনিবার দুপুরে সমাপ্ত হয়‘অপারেশন ম্যাক্সিমাস’। নাসিরপুরে অপারেশন হিটব্যাক এর পর জঙ্গি আস্তানার ওই বাড়িতে মিলে সাত জনের ছিন্ন ভিন্ন দেহ। তন্মেধ্যে রয়েছে ১ থেকে ১২ বছর বয়সের ৪টি শিশু, ২ জন মহিলা যাদের বয়স (২৫, ৩৮) ও ১জন পুরুষ (৩৮) বছর বয়স বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর মৌলভীবাজার শহরের বড়হাটের অপারেশন ম্যাক্সিমাস’এ নিহতের সংখ্যা ৩ জন। এরমধ্যে একজন মহিলা ও দুজন পুরুষ রয়েছে। এখনো বাড়ি দুটি ঘিরে রেখেছে পুলিশ।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com